ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। দ্বাদশ (নববর্ষ) সংখ্যা।। জানুয়ারি/২০১৩ ঈসাব্দ


Word Converter-1

timthumb (4)

ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত।

লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ
krondosee@yahoo.com

Word Converter-1

শুভ নববর্ষ। সবাই ভাল থাকুন, সুখে-শান্তিতে থাকুন। খ্রিস্টীয় নববর্ষে এটাই প্রত্যাশা আমাদের।

new-year-2013

Vindeshee lekha vinvashee lekha-1

c056bd7ec6c1be0802413d42b7255906

হুইটম্যানের ‘ঘাস’

অনুবাদ: মাঈনউদ্দিন মইনুল

একটি শিশু জিজ্ঞেস করলো, “ঘাস কী?”

একমুঠো ঘাস তার হাতে।

কী উত্তর দেবো আমি শিশুটিকে?

ঘাস যে কী, আমি তো তার চেয়ে বেশি জানি না।

আমার ধারণা এটি আমার মনোভাবের প্রতিবিম্ব,

আমার আশাবাদি চেতনার সবুজ বুনন।

অথবা, হতে পারে ঈশ্বরের হাতের রুমাল,

একটি সুগন্ধী উপহার এবং স্মৃতিজাগানিয়া

যা পরিকল্পিভাবে দেওয়া,

যার কোন এক কোণায় হয়তো লেখা আছে মালিকের নাম,

যা দেখে আমরা মন্তব্য করতে পারি,

আর জিজ্ঞেস করতে পারি, “এটি কার?”

অথবা, হতে পারে ঘাসটি নিজেও একটি শিশু,

উদ্ভিদজগৎ থেকে জন্মলাভ করা এক নাবালক।

অথবা, হতে পারে এটি একটি অভিন্ন চিত্রলিপি,

যার অর্থ হলো: প্রশস্থ এবং সংকীর্ণ জায়গায় একইভাবে গজিয়ে ওঠা,

বেড়ে ওঠা কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গদের প্রাঙ্গণে সমভাবে,

কানুক, টুকাহি, কংগ্রেসম্যান বা কাফ*;

সবাইকে আমি এক রকম দেই,

সবার থেকে আমি একই রকম করি গ্রহণ।

এবং এখন আমার মনে হয় এটি হচ্ছে

কবরে গজিয়ে ওঠা একগুচ্ছ অখণ্ড চুল।

কোমলভাবে তোমায় স্পর্শ করবো হে কোঁকড়ানো ঘাস,

হয়তো তুমি যুবকদের বুক থেকে ওঠেছো গজিয়ে,

হয়তো আমি জানলে বুঝতাম যে তাদেরকে আমি ভালোবেসেছিলাম,

হয়তো বৃদ্ধদের থেকে এসেছো, অথবা এমন সন্তানদের থেকে

যাদেরকে আগেই কেড়ে নেয়া হয়েছিলো মা’য়ের কোল থেকে,

আর এখন আছো তোমরা মায়ের কোলে,

এই ঘাস এত গাঢ় যে তা বৃদ্ধ মা’দের

ধূসর (চুলের) মাথা থেকে আসতে পারে না,

বৃদ্ধ পুরুষদের বিবর্ণ দাড়ি থেকেও তা গাঢ়,

এমন গাঢ় বর্ণ যা মুখের ভেতরের ধূসর লাল তালু থেকে আসে।

হ্যাঁ উললব্ধি করেছি আমি, এতগুলো সরব জিহ্বার মধ্যেও,

এখন উপলব্ধি করেছি (গাঢ় বর্ণটুকু)

মুখভ্যন্তরের ধূসর লাল তালু থেকে এমনিতেই আসে নি।

পারতাম যদি সেসব মৃত যুবক ও মৃত নারীদের

ইঙ্গিতটুকু ব্যাখ্যা করতে,

যদি পারতাম, ব্যাখ্যা করতে সেই বৃদ্ধ পুরুষ আর মা’দেরকে যাদের

সন্তানদেরকে কোল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিলো।

(ঘাসকে সুধাই) কী হয়েছিল সেই মৃত যুবক আর বৃদ্ধদের?

আর, কী হয়েছিল সেই নারী আর তাদের সন্তানদের?

তারা জীবিতই এবং ভালোই আছে অন্য কোথাও,

ছোট্ট এ ঘাস দেখিয়ে দিলো মরণ বলতে আসলে কিছু নেই,

আর মরণ যদি থাকেই তা জীবনকে সামনের দিকে নিয়ে যায়,

এবং তা ধরা পড়ার অপেক্ষায় থাকে না,

এবং জীবন ফিরে আসার জন্য মুহূর্তও থেমে থাকে না।

(ঘাসের মতো) সব জীবনই ওপরে বাইরের দিকে বের হয়ে যায়,

কিছুই পড়ে যায় না,

আর মরণ সকলের ধারণা থেকে আলাদা, তা সৌভাগ্যেরই বিষয়।

[টীকা: কানুক, টুকাহি ইত্যাদি হলো অধিকার-বঞ্চিত রেড ইনডিয়ান ও নিগ্রোদের বিভিন্ন গোত্রের নাম। কংগ্রেসম্যান বা কাফ দ্বারা অভিজাত ও শ্বেতাঙ্গদের বুঝানো হয়েছে।


কবিতা সম্পর্কে: কবিতাটি হুইটম্যানের ‘সং অভ্ মাইসেল্ফ’ এর ষষ্ঠ পদ থেকে অনূদিত, যাকে কবি শিরোনাম দিয়েছেন ‘গ্রাস/ঘাস’।
কবিতাটি হুইটম্যানের সাড়াজাগানো কাব্যগ্রন্থ ‘লিভ্স অভ্ গ্রাস’ থেকে নেয়া। সবুজ ঘাস একদিকে কবির আশাবাদী চেতনার প্রতীক, অন্যদিকে পায়ের তলার এ ঘাস সমাজের বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি। কবি ছিলেন নিগৃহীত কৃষ্ণাঙ্গ আর ক্রীতদাস প্রথার বিপক্ষে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এই বারবার গজিয়ে ওঠা ঘাস হলো অমরত্ব আর পুনর্জনমের প্রতীক। কবিতার মর্মার্থ আশা-জাগানিয়া।
কবি সম্পর্কে: আমাদের সাম্যের কবি কাজী নজরুলকে বিভিন্ন জায়গায় ‘বাংলার হুইটম্যান’ বলে যে উল্লেখ করা হয়, তা যথার্থই। ওয়াল্ট হুইটম্যান(১৮১৯-১৮৯২) সাম্য, গণতন্ত্র আর অধিকারের গান গেয়েছেন তার সমস্ত কবিতায়। তার ‘সং অভ্ মাইসেল্ফ’ মলূত সং অভ্ হিউম্যানিটি, মানবতার গান। ওটি হুইটম্যানের ব্যক্তিগত জীবনগাঁথা নয়। তিনি গেয়েছেন আদর্শবাদ আর সার্বজনীনতার গান। হুইটম্যান মানবতার কবি (Poet of Humanity), যেমন আমাদের নজরুল। ‘ঘাস’ হুইটম্যানের একটি প্রিয় রূপক। বস্তুত তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘লিভস অভ্ গ্রাস’ (১৮৫৫)।
মজার ব্যাপার হলো, এ কাব্যগ্রন্থটি হুইটম্যান দশবার সংশোধন করে দশবারই প্রকাশ করেছেন। জীবনের দুর্দশার কারণেও হুইটম্যান আর নজরুল এক ঘরানার কবি।]

Word Converter-1

চক্রপ্রান্ত

গোলাম কিবরিয়া পিনু

Penguins

আমি কি আমার! নাকি শুধুই জামার?

কোন্ ফ্যাশনের মোহে হই পরিপ্লুত!

স্ফুরিত হবার জন্য শিখা বিস্তারিত মূলভূমি

ছোঁয়ার পরও,

এক এক করে কত হারাচ্ছি খামার?

তীব্রবেদনার মধ্যে সহ্য করি কত শূলরোগ

ভুলে যাই যোগ ও বিয়োগ!

আমাকে পেয়েছে কোন মোহ

নিত্যদুখে হই শোকাবহ

পরিনাম জ্ঞান হয় লুপ্ত!

সুপ্ত ছিল কতকিছু সম্ভবনাময়

শেষ হয়ে যায় কোন দর্জির নায়!

নিজের গাইয়ের দুধ আজ

দই বানানোর আগে হয়ে যায় নষ্ট!

শিশুর জনাও আজ থাকি উদাসীন

মূলধন খোয়া যায়¾শুধু থাকে ঋণ!

জামার বৈচিত্র্য নিয়ে থাকি

পীড়ন ও দুখের বৈচিত্র্য ভুলে যাই

শুধু শুধু মানি শাস্ত্রবিধি

এরপরও খুঁজে পাই নিধি!

লালন করি কী? পালন করি কী?

নষ্ট হয় পরিপাকতন্ত্র,

আমরা দাসও নই, দাসও বিদ্রোহ করে জানি¾

আমরা হয়েছি জীবের নিছক যন্ত্র!

আমার ভেতরে শরীরের জরাবস্থা

চক্রপ্রান্ত থেকে কষ্ট জাগে বস্তা বস্তা।

cropped-cropped-cropped-timthumb-3.jpg

ঝরাফুলের মতো 

শাহ আলম বাদশা

photo-spotlight1

 বারান্দাতে শুয়েছিলো ছোট্টশিশু মায়ের সাথে

উদোম গায়ে উপোসপেটে জমকালো এই নিঝুমরাতে!

হাড়-কঙ্কাল মায়ের পেটে একটুওতো ভাত ছিলোনা

দ্বারেদ্বারে  ঘুরলো এবং চাইলো কতো, কেউ দিলোনা?

 

তাই শিশুটির ছটপটানি, জ্বলছিলো পেট ক্ষুধার চোটে

আধমরা মা’র পায়নিকো দুধ হাজার চুষেও একটু মোটে।

মায়ের চোখে জল ছলছল ঝরছিলো তাই বানের বেগে–

ঠিক তখুনি দরজা খোলে ডান্ডাহাতে মনিব রেগে?

নিশুতরাতে তার যে সুখের ঘুমভাঙ্গালো হতচ্ছারী

আচমকা তাই লাঠির ঘায়ে শোধ নিলো সে সত্যি তারি।

 

অবুঝ শিশুর দোষ কী ছিলো, ফিনকি দিয়ে ফাটলো মাথা-

হায়রে কপাল ’’ভাগ’’ তবুও কটমটিয়ে বললো যা-তা;

দুঃখিনী মা’র গায়েও সেকী লাগলো বিষম, পার ছিলোনা

জ্ঞান হারালো সাথে সাথেই হুঁশ যে মোটে আর ছিলোনা।  

মরলো কিনা দেখলো না সে, বীরের বেশেই ঢুকলো ঘরে

ভয় পেয়োনা, খুব সহজেই গরীব কি আর যায়গো মরে?

 

বাপ মরেছে নেই বাড়িঘর, তাই দুঃখী ওই শিশুর মায়ে

বারান্দাতে রাত কাটিয়ে কাজ করে খায় পেটের দায়ে।

শিক্ষা এবং চিকিৎসা নেই ঠিক যে ঝরাফুলের মতো–

এমনি করেই ধুকে ধুকে মা ও শিশু মরছে কতো।

 

এই শিশুটা তুমিই হলে, কেমন হতো চিন্তা করো

দুঃখিনীটা তোমার যদি মাতাই হতো কিংবা ধরো–

এমন ছবি তোমার মনে উথাল-পাথাল দেয়কি হানা

‘আমরা মানুষ সৃষ্টিসেরা’ এই কথা কি যায়রে মানা!! 

j

কথা ছিলো

ফরহাদ মাহমুদ

81804

কথা ছিল তোমায় নিয়ে আকাশ দেখবো,
তোমার হৃদয়ের মতো সুবিশাল,
আকাশ; শরতের আকাশ।
পেজা তুলোর মতো সাদা মেঘগুলো দেখে,
তোমারও উড়তে ইচ্ছে হবে,
আমার হাত ধরে বলবে-
চলোনা উড়ে যাই ওই দূর দিগন্তে;
 
কথা ছিল তোমায় নিয়ে উঠবো ওই পর্বতের চূড়ায়,
যেখানে শব্দহীন-
কোলাহল আন্দোলিত করবে মন-প্রান!
ঠিক আকাশের কাছাকাছি-
সেখানকার নিষ্ঠুর নিস্তব্ধতা তোমার ভাঙতে ইচ্ছে হবে,
কারনে অকারনে চিৎকার করে উঠবে,
মৃত্যুর মতো ভয়ংকর সৌন্দর্য দেখে-
ফিসফিস করে বলবে- “চলো মরে যাই।”
 
কথা ছিল দুজনে হাত ধরে সমুদ্র দেখবো
যে সমুদ্রের গভীরতা,
লজ্জা পেয়ে ফিরে যায় তোমার চোখের গভীরতা মেপে,
সেই সুনীল সমুদ্র-
দেখে তোমার ছুতে যেতে ইচ্ছে হবে।
শত সহস্র ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেবে তোমায়,
জলে ভিজে লেপটে যাবে তোমার শাড়ি-
লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠবে তুমি;
বলবে- “ছাই! থাকবো না এই ছন্নছাড়া সমুদ্রে।”
 ************
অনেকদিন হয়ে গেল
সমুদ্রের কাছে যাই না,
ঢেউয়ের আনাগোনা আমার ভাল লাগে না,
আকাশ দেখতে ইচ্ছে করে না-
পর্বতশৃঙ্গের নিস্তব্ধতা,
অসহ্য ঠেকে-
এখন শুধু বৃষ্টিতে ভিজি,
সেই ভাল!
অম্বরবৃষ্টির সাথে ধুয়ে যায় আমার অশ্রু-বৃষ্টি।
রিমঝিম শব্দে ঢেকে যায় আমার মর্ম-চিৎকার।
এতো স্বার্থপর কেন তুমি?
একা একাই চলে গেলে আকাশ দেখতে?
কথা না ছিলো আমাদের?
 
দুজনে একসাথে আকাশ দেখবো…
cropped-cropped-cropped-timthumb-1.jpg

সকাল রয়ের কবিতা 

buttercup-fairy

                        ছোপছোপ আধারের ভোর। কান্নার ভোর। রক্তে মেশানো রাজপথের ভোর। পড়ে থাকা
লাশের স্তুপের ভোর।
এই ভোরেই রঞ্জু চোখফাটা কান্না নিয়ে গেট পেরুল।
নুপুর ছুটে এলো রঞ্জু জয়ন্তর খবর কি ? কেমন আছে ও ?
রঞ্জুর মুখ যেন ভাস্কর্য হয়ে গেছে। কথা আটকে গেছে। কি বলবে ….
নুপুর হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলল ; বল না
রঞ্জু মাথা নিচু করে বললো জয়ন্ত দা আর নেই : রাতেই গুলি লেগে মারা গেছে।
-জয়ন্ত মরতে পারে না; তুই ভুল দেখেছিস; ওর লাশ কোথায় আমি দেখবো।
ছুটে পালালো নুপুর।
রাজু পথ আটকালো এখন বাইরে বের যাস নে ওরা তোকেও মেরে ফেলবে; তোকে ও গুলি করবে।
-করুক : জয়ন্ত নেই ; আমিও থাকবোনা। জোরা-জুরিতে আচমকা মাটিতে গড়িয়ে
পড়ে নুপুর। সবাই ভেতর বাড়িতে নিয়ে যায়। গুলি এখনো থামেনি; কান্নার
যেন হাট বসেছে আজ।
ভোর থেকে সকাল হয়ে আসছে। মরিচা পড়া গেটের পাশে দাড়িয়ে আছে; উপোসী
ঘরওয়ালীর লালপরি।
ওর অসহায়ত্বটা আজ হাজার হাহাকারের মাঝে মিশে গেছে।
২৫ মার্চের কালরাত কেড়ে নিয়েছে জয়ন্ত কে; দিয়ে গেছে একাকীত্ব। গেটের
বাইরে দাড়ানো পিতৃমাতৃ সহায় সম্বলহীন লালপড়িকে কি দিয়ে গেল এই
কালরাত্রী ?
রক্তের দাগ মুছবে কি ? স্বাধীনতা মিলবে কি হাজার লাশের স্তুপের বিনিময়ে।
নাকি ফুটপাতের ঘুটে কুড়ানি হয়ে যাবে লালপরি।

download

শিশু মন

মোসাদ্দেক

k6133829

শিশুর মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন রঙের দেশ,
ভাঙ্গা গড়ার মাঝে এগিয়ে চলা বাস্তবতায় অবশেষ।
কাঁচের মত মশৃণ শিশুর আবেগের মন,
স্নেহ আদর সবচেয় প্রিয় নেই আর কোন ধন।
কাঁচের মতই অচেনতায় ভাঙ্গে মনের আশা,
কাঁদা-জলের ন্যায় একহয় অপূর্ণ ভালবাসা।
স্নেহ মাঝে উঠে গড়ে সম্মানের ছোট নীড়,
অপেক্ষায় ক্ষণে প্রিয়জনের তরে হয়ে উঠে অধীর।
ঝরে পড়া অশ্রু ঝরায় স্বপ্ন আপন ভূবন দেশে,
আপন আলোতে আলোকিত হতে জীবন পথীক বেশে।

download (4)

মন ভালো করো হে প্রিয়

সাইফুল করীম

timthumb-5.jpg

জানি তোমার মন ভালো নেই আজ।

ধূলো মাখা মুখে কী বিবর্ণ, শীর্ণ-ই

না লাগছে তোমাকে……

সেই বাসন্তী পেড়ে শাড়ি, সাদা পাজামা

ইলিশ-পান্তা, রঙ্গিন মেলা সব ঠিক আছে

আছে আবেগের জড় অনুষ্ঠান অতি সখেদে

সেই অনার্য –চাষা ভূষার দল, দীপ্র শ্রমিকের

হাত, তপ্ত লাঙ্গলের ফলা কোথায় তুমি হে

প্রিয় বাংলা? কর্পোরেট কার্পেটের নিচে বুনেছ

কি উন্নতির গর্ভপাত? কালে অকালে নিয়ত

আনন্দ খোঁজ অবৈধ সম্ভোগ?

জানোনা মাটিও রক্তের মত সব মনে রাখে?

রাখতে হয় কেননা আজো কোকিল ডাকে

আজো দিগন্ত থেকে ছুটে আসা লাল আভারা

দেখায় পরাজিতের মর্মন্তুদ সেই ইতিহাস, আজো

কালবৈশাখী নামে দেখায় বাংলা মাত্রই জ্বালাময়ী

উদ্ভাস, আজো বাংলা দূরন্ত এই তথাকথিত হৃষ্ট-পুষ্ট

আধুনিক যুগেও সবুজ পাতার মাঝে কী পরাক্রমী তারুন্য

এত কিছু দিয়েও কেন তুমি রইবে কষ্টে- নীল অবসন্ন?

মন ভালো করো হে দয়িতা বাংলা-

তোমার দ্বৈরথে যারা ছিলনা দিয়েছি অভিশাপ যেন

দ্রুত মরে যায়। তোমাকে করেছে রিক্ত যারা দিয়েছি

থুথু  যেন ক্রোধান্ধ শাপ এখুনি তীব্র ছোবল দেবে।

তোমাকে ভালোবাসেনি যারা টন কে টন দিয়েছি

উগড়িয়ে বমি যেন সমূলেই তারা যায় ডুবে।

মন ভালো করো হে প্রিয় বাংলা আমার

তোমাতেই জীবন গড়া- তোমাতেই সারংসার।

Chhotogolpo-1

কামিনী

রীনা তালুকদার

সারাদিন বাস জার্নি শেষে কিছুটা ক্লান্ত রতন। শখের বশে মধ্য জীবনে ঘুরতে এসেছে প্রাচ্যের সাহারাখ্যাত রাজস্থানের প্রাণকেন্দ্র খুরিতে। পথে আসতে আসতে ধুলোবালির ভেতর দিয়ে ধুলিঝড়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত বিকালে এসে পৌঁছাল পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন গ্রাম খুরিতে। যেখানে ধুলাবালিই মুখ্য বিষয়। বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে সাদা বালির মরুভূমি। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকা হলেও এখানে বারুদের কোন গন্ধ নেই। একেবারেই নিরিবিলি। এখান থেকে অনতি দূরে রয়েছে ডেজাট ন্যাশনাল পার্ক। যেখানে রয়েছে চিঙ্কারা, ময়ূর, ডেজাট ফক্ম, ডেজার্ট ক্যাট, গ্রেড ইন্ডিয়ান ব্যাষ্টার্ড। পর্যটক গাইডসহ ওরা একদল ঘুরতে এসেছে এখানে। জয়সলম থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ মরুগ্রামটি। এ গ্রামটি দীর্ঘ পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে মরুভূমির চারপাশ ঘিরে। ক্লান্ত দেহে রতন হালকা স্নান সেরে উদোম শরীরে গোলাকার টিনের চালার ঘরে শুয়ে আছে মাটির বিছানায়। মাটির হিমে আর শীতল বাতাসে চোখ বুজে আসছে। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখছে বিভিন্ন নকশা করা মাটির দেয়াল।

কত বিচিত্র রকমের নকশা। ঠিক ওর জীবনের মত বিচিত্র রকমের। দেয়ালে অঙ্কিত ঘর সংসারের চিত্র দেখে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে রতন। মাঝে মাঝে জীবনটা ওর কাছে খুবই ভারী মনে হয়। গত ক’বছর ধরে কেমন এলোমেলো লাগে সবকিছু। বাবা মা থাকতে এতটা একাকিত্ব অনুভব করেনি। যখনই মন খারাপ হয় ভেতরে অস্থিরতা বেড়ে যায়। এ অস্থিরতা সামাল দিতে ছুটে যায় নতুন কোন স্থান দেখতে। তাহলে মনটা একটু স্থির হয়। একা একা সংসার আর ভাল লাগে না। সারা দিন ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যসত্ম থেকে রাতে ঘরে গিয়ে নিজেকে অসহ্য লাগে নিজের কাছে।

মা বাবা চলে যাবার পর ভাই বোনরা খুব একটা খোঁজ খবর নেয় না বা যত্ম ও সে রকম পায় না। অবশ্য এ নিয়ে মনে কোন খেদ নেই রতনের। আরও দুই ভাই পাশেন ঘরে তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে আমোদে আহ্লাদে মশগুল। অবশ্য মাঝে মাঝে ভাইদের ছেলে মেয়েরা খোঁজ খবর নেয়। ভাল রান্না হলে মাঝে মধ্যে দিয়ে যায়। সে জন্য রতনও ওদের যথেষ্ট আদর করে। মা বাবা বেঁচে থাকতে অনেক চেষ্টা করেও রতনকে সংসারী করতে পারে নি। যতবারই মেয়ে ঠিক করেছে। রতন প্রত্যেক বারই প্রত্যাখান করেছে। সে জন্য মা মারা যাবার সময়ও অনেক আক্ষেপ করেছে। তবুও রতন কোন মেয়েকে আপন মনে করতে পারেনি। রতনের এক বোন বিন্দু। বিয়ে দিয়েছে সে অনেক দূরে। বাসে যেতেই দুটো জেলা পাড়ি দিতে হয়। বিন্দুর জামাইটা খুবই ভাল। মাঝে মাঝে বিন্দুকে নিয়ে ছেলে মেয়ে সহ বেড়াতে আসে।  বিন্দু এ বাড়ীতে আসলে রতনের ঘরেই থাকে। আর বিন্দু যে কয়দিন থাকে ভাল ভাল রান্না বান্না করে বড় ভাইকে খাওয়ায়। এ জন্য রতন এই ছোট বোনটার কাছে ঋণী। বিন্দুর স্বামী বিকাশ ফোনে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখে। বিন্দুও অনেক বুঝায় রতনকে সংসারী হতে। রতন বোনের কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলে কামিনী তো নেই। কিভাবে সংসার বাধবো বল। একা একা তো সংসার করা যায় না। ঘর ভর্তি বিন্দুর ছেলে মেয়ে সহ অন্য দু’ভাইর ছেলে মেয়েরা মুখরিত করে রাখে ঘর। এ জন্য বিন্দু থাকলে সে কয়দিন ঘরের প্রতি রতন বেশ টান অনুভব করে। ওরা চলে গেলে প্রায়ই মনে মনে ভাবে কামিনী থাকলে নিশ্চয়ই এমন ছেলে মেয়েতে ঘর মুখর হয়ে থাকতো। কী যে ভাল লাগত ভেবে নিজে নিজেই হেসে ওঠে রতন। হঠাৎ খুরিতে এসে কামিনীকে বার বার কেন যে মনে পড়ছে। কে জানে কামিনী এখনো বেঁচে আছে কি-না। সেই বিশ বছর আগে কামিনীর বয়স কেবল সতের আঠারো বছর পেরিয়েছে। সে সময় কামিনী কলেজ যাবার পথে কে বা কারা কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। সরকারী কলেজে বি.এ ক্লাসে পড়ত রতন। কামিনী সদ্য ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে। পাশের গ্রামের সেই মেয়েটি ; কলেজ যাবার পথে কথা বলতে বলতেই এক সময় ভালবেসে ফেলে দুজন দুজনকে। তারপর মাত্র চার পাশ সময় অতিক্রম করেছে। এরই মধ্যে কামিনীকে রাসত্মায় পথরোধ করত অনেক বখাটে ছেলে। সে সময় রতন বাস ষ্টেশনে নেমে কলেজ পর্যন্ত হাঁটার রাসত্মাটুকু সঙ্গে সঙ্গে থাকত কামিনীর। যেদিন হারিয়ে যায় সে সময় দুই তিন ধরে জ্বরে ভুগছিল রতন। কলেজে যেতে পারেনি। পরে শুনে অনেক খোঁজা খুঁজি করলেও আর পাওয়া যায়নি। থানায় প্রচুর অর্থ ঢেলেও কোন কাজ হয়নি। তখন কামিনীদের বাড়ী গিয়ে ওর বাবা মার কষ্ট দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে বেশ কদিন রতন অস্বাভাবিক ছিল। তখনই বাড়ীর সবাই জানে রতন কামিনীকে ভালবাসত। হারিয়ে যাবার পর আর কোনদিন ফিরেনি কামিনী। সে থেকে ঘরের সামনে একটা কামিনী গাছ বহু যত্ম করে লাগিয়েছে। প্রথম দিকে বেশ কবার চারা মরে যায়। পরে অনেক যত্মে  টিকে থাকে একটি চারা গাছ। দীর্ঘ দিন ওই কামিনী গাছই ঘরের পাশে সঙ্গী হয়ে আছে। এখন ফুল ধরে বেশ খোশবু ছড়ায়। খুব সকালে উঠেই গিয়ে তাকিয়ে থাকে ছোট ছোট পয়সা পয়সা সবুজ পাতার ফাঁকে সাদা পবিত্র ফুল গুলোর দিকে। বুক ভরে যায়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে বুকের ভেতর। কামিনী জীবনে একটা চিঠিই দিয়েছিল। সে চিঠিটা রতন সারা জীবন পকেটে নিয়েই ঘুরে। যখনই কামিনীকে মনে পড়ে। চিঠিটা খুলে পড়ে। সে কী ভালোবাসায় ভরা হাতের লেখা। যেনো সে উত্তাল প্রেমের জোয়ারে হারিয়ে যায়। এমন চিঠি রতন যতবার পড়ে দিশেহারা হয়ে যায়। আর কাউকে মনে স্থান দিতে পারেনা। মনে কাউকে স্থান দিতে না পারলে সংসারে তার স্থান কোথায়! মন আর সংসার এক না হলে মানুষ জীবনের দূরত্ব ঘুচাবে কী ভাবে। কী ভাবে মিটবে জীবনের ছোট ছোট স্মৃতিময় স্বপ্নময় চাওয়া-পাওয়া। তাই রতন এখানেই পরাজিত হয় বার বার।

এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে যায় রতন। ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় যায়। অনেক লোক সমাগম হয়েছে। অদূরে গেষ্ট হাউজ থেকে অতিথি এসেছে। এখানে পানি খরচ করতে হয় মেপে মেপে। কিন্তু বিদ্যুৎ সারাক্ষণই আছে। সে জন্য ভাল একটা ঘুম দিয়েছে। দুই তিন ঘন্টা ধরে। সন্ধ্যার পর হতেই ভিড় লেগেছে লেকের চারদিকে আলো ঝলমলিয়ে ওঠেছে। অদূরে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে সন্ধ্যা রাতের মরুভূমি একেবারে আবছায়া আলোতে ধূ-ধূ প্রামত্মর দেখে বেশ ভাল লাগছে রতনের। হিম শীতল বাতাসে শার্টের বোতাম খুলে হাত দুটো পাখির মত মেলে ধরে চোখ বন্ধ আর হা করে মুখ খুলে হাওয়া খাচ্ছে। উন্মুক্ত আকাশের নীচে রতনের হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। আবারও মনে হয় কামিনীকে। কামিনীকে পাশে পেলে এ মরুভূমিতে হারিয়ে যেতো রতন। হঠাৎ হঠাৎ মনটা কেমন আনমনা হয়ে যাচ্ছে রতনের নিজের অলক্ষেই। আজ যেনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্ট হচ্ছে তার। বার বার স্মৃতির নষ্টালজিয়া তাকে আনমনা করে তোলে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীচে নামে। সবাই মদ পানে ব্যসত্ম। একটু দূরে বসছে গানের আসর। রাজস্থানী লোক সংগীত। যন্ত্রীরা বসে পড়েছে। ঠুং ঠাং শব্দে সামনে এগুচ্ছে রতন। সে ভারী পানীয় পান করে না। তাই সফট ড্রিংক আর কিছু চিপস নিয়ে খাচ্ছে। কিছুটা ক্ষুধাও পেয়েছে। দুদিন জার্নিতে ভাত খাওয়া হয়নি। রুটি সবজি এসবই বেশী খেয়েছে। অবশ্য রতন ভাত খুবই কম খায়। অভ্যাস হয়ে গেছে। দোকান বন্ধ করে হোটেলে ঢুকে রুটির সঙ্গে সবজি বা মাঝে মধ্যে মাংস দিয়ে খেয়ে নেয়। তারপর বাড়ী এসে ঘুমিয়ে থাকে চুপ চাপ। আজ এখানে বুফে খাবার দিয়েছে। এখানে খাবার সিস্টেমই বুফে। তাই এখন হালকা খেয়ে পরে বুফে গিয়ে যা খাবার খাবে। চিপস খেতে খেতে গানের আসর দেখতে বসে। বসেছিল আসর হতে একটু দূরে একটা মাদুর পেতে। অনেকেই নিজেদের বউদের সঙ্গে এনেছে। অবশ্য সবাই বউ এনেছে কিনা সেটা রতন জানে না। জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। রতন একা মানুষ একা এসেছে। এইটুকুই জানে সে। অনেক মেয়ে এখানে। রতনের মত দু’চারজন আছে যাদের সাথে কোন মেয়ে নেই। এছাড়া রতন মেয়েদের একটু এড়িয়েই চলে। কখন কোন্ ঝামেলায় পড়ে অপরিচিত  জায়গা তাই আরো সাবধান।

রাজস্থানী লোকগীতির সুরে সুরে সবাই বসে থেকে হেলে দুলে বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গিতে ব্যস্ত আর সে সাথে গ্লাসের পর গ্লাস সাবাড় হচ্ছে তরল কঠিন পানীয়। হঠাৎ রতনের চোখ আটকে যায় মুখোমুখি বারান্দার শেষ মাথায়। মাটির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক রমণী। একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছে শিল্পীদের;  চোখে তার রাজ্যের জিজ্ঞাসা মনে হয়। রতন আবারও তার দিকে তাকিয়ে দ্যাখে খুব চেনা চেনা মুখোচ্ছবি। কোথায় দেখেছে। মুহূর্তে স্মৃতির পাতা উল্টাতে থাকে। এক ঝটকায় ঘুরে আসে নিজের পিছনের জীবনের আলপথ। যেখানে মাটিতে পা ফেলে মমতার উষ্ণতায় হেঁটেছে। যেখানে কিশোর বেলা মনের অজামেত্ম গেয়ে ওঠে কোন সুমধুর ভাললাগা গান। যে বাতাসে সদ্য যৌবন টগবগিয়ে নাচে দুপাশের হোগলার ভেতর দিয়ে নতুন মাটির রাস্তায়। সেখানে খুঁজতে খুঁজতেই ভেসে ওঠে যে মুখ। তাতে রতন চমকে ওঠে! না না বলে নিজেকে সামাল দেয়। ভাবে এখানে কোথা থেকে আসবে কামিনী। তাছাড়া কামিনীর চেহারার সাথে একটু মিল থাকলেও একেবারে হুবহু মিল নেই। একটু রোগা ঋজু দেহ, কালচে রঙ। কামিনীর তো সুঠাম দেহ ছোট ছোট চুল আর সুন্দর মুখ। তারপরও কিছুক্ষণ পর পর নিজের অজামেত্মই ওই মহিলার দিকে চোখ যায় রতনের। এক সময় বারান্দার মাঝখানে থেকে ষাটোর্দ্ধ লোক তাকে ইশারা করলে কাছে আসে। কাছে এসে দাঁড়াতেই লোকটি হাত ধরে হ্যাঁছকা টানে পাশে আধ শোয়া করে জড়িয়ে ধরে রাখে। অন্য হাতে গ্লাসে মদ ঢালছে। তাকিয়ে দেখছে রতন। আর ভাবছে না কামিনী তো নয়ই। নিশ্চয়ই লোকটার বউ হবে। তবুও চোখ চলে যায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে। লোকটি গ্লাসের মুখ ধরে রাখে মহিলার মুখে। কিন্তু মহিলা হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। লোকটি ততক্ষণে ঢুলুঢুলু সে মহিলার মাথায় ঢেলে দিল পুরো গ্লাস পানীয়। মহিলার চেহারায় কেমন নিরুদ্বিগ্ন ছাপ। কোন হাসি খুশি নেই। রতনের কেমন যেনো মায়া হচ্ছে। আবার নিজেকে সতর্ক করে নেয়। না না অন্যের স্ত্রীর দিকে এভাবে তাকানো ঠিক না। কিন্তু কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারে না। কেনো যেনো বার বার ওই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক সময় আসেত্ম আসেত্ম সব লোক ওঠে গিয়ে বুফে দেয়া খাবার নিয়ে খাচ্ছে। রতনের খুব একটা খেতে ইচ্ছে করছে না। পুরো বারান্দাটা একটু খালি। এতক্ষণে মহিলাটাও বুঝে ফেলেছে। সেও তাকিয়ে আছে রতনের দিকে। রতন লজ্জায় অন্য দিকে তাকায়। এভাবে যতবারই রতন চুপি চুপি তাকায় দেখে মহিলাও তাকিয়ে আছে। এক সময় বয়স্ক লোকটি ওঠে চলে গেলে মহিলাটি এদিক ওদিক চেয়ে রতনের দিকে এগিয়ে আসে। রতন ততক্ষণে ভয়ে হিম হয়ে যাচ্ছে। ওই মোটকা লোকটা দেখলে কে জানে কপালে কী আছে। মহিলা এসেই পাশে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকল। কিছু বলল না। রতন ভাল করে দেখে কামিনীর সাথে চেহারা মিল আছে। মন বলছে কেনো জানি তাকে চেনে রতন। তবুও মনে সাহস নিয়ে এদিক ওদিক চেয়ে নিজের নাম বলে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মহিলা বসে পড়ে পাশে। তাকিয়ে থাকে রতনের দিকে। রতন থতমত খেয়ে একটু সরে বসে বলেঃ স্বামীর সঙ্গে এসেছেন বুঝি ? মহিলাটি মাথা নাড়ে এবং ততক্ষণে ঝর ঝর করে জল পড়তে থাকে চোখের কোণ বেয়ে। রতন বুঝে ওঠতে পারে না কি বলবে। মহিলা হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় সে যে রুমে ওঠেছে। মহিলা সামনে তাকিয়ে দেখে লোকটি আসছে। সাথে সাথেই দ্রুত ওঠে দাঁড়িয়ে একটা থামের আড়ালে চলে যায়। রতনও দ্রুত ওঠে তার থাকার রুম থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। লোকটি নেশায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় কী বলে যেনো আবার টলতে টলতে সামনের দিকে চলে যায়। মহিলাটি আবারও রতনের কাছে এসে দাঁড়ায়। রতন এক পা এক পা করে সামনে আসে। কাছাকাছি যেতেই মহিলাটি রতনকে প্রশ্ন করে -আপনি কোন রুমে ওঠেছেন ?

রতনঃ এই রুমে বলে হাত ইশারায় দেখিয়ে দেয়।

সঙ্গে সঙ্গে মহিলাটি বললঃ চলেন।

রতন অবাক হয়ে বলে ওঠেঃ আমার রুমে ?

মহিলাঃ হ্যাঁ।

রতনঃ না না তা হয় না। হঠাৎ রতন মনে মনে ভাবে কোনো খারাপ মেয়ে মানুষ না তো !

মহিলাঃ দেখুন সময় একদম কম, চলেন।

রতনঃ এবার আর না করতে পারলনা। দুজনে এক রকম তড়িঘড়ি রুমে গিয়ে ঢুকতেই মহিলাটি দরজার খিল লাগিয়ে দিল।

রতন আরো অবাক হয়ে বললঃ আরে! আপনি দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন কেন ? এদিকে ভয়ে রতনের হাত পা হিম।

মহিলাঃ রতন,  আমি কামিনী!

রতনঃ হঠাৎ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দেখে রতন। অস্পুট স্বরে বলে কামিনী! কামিনী !!

কামিনীঃ হ্যাঁ রতন। আমি কামিনী! বিশ্বাস করো। এই দ্যাখো আমার বাম হাতে কাটা দাগ।

রতনঃ রতন জানতো কামিনীর বাম হাতে ছোট বেলার একটা কাটা দাগ আছে। সত্যিই তাই। প্রথমে দেখেও কিছুটা চেনা চেনা ঠেকছিলো তার কাছে।

কামিনীঃ রতনের দুহাত জাপটে ধরে বলে রতন ! আমি তোমার কামিনী। আমি তোমাকে দেখেই চিনতে পেরেছি।

রতনঃ কিন্তু তুমি এখানে কিভাবে ?

কামিনীঃ সে অনেক কথা রতন। বলেই দরজা একটু ফাঁক করে নিজের রুমের দরজাটা দেখে নেয়। অস্থির চাহনি। আবার দরজা লাগিয়ে দেয়। রতনকে বলেঃ রতন এইখানে এর আগেও আমি কয়েকবার এসেছি। এ জায়গাটা মোটামুটি চেনা। তুমি কেমন আছো বলো। বাড়ীতে চাচা চাচি কেমন আছে। আমাদের কারো সাথে তোমার যোগাযোগ আছে কি-না ইত্যাদি প্রশ্ন গুলো এক নিঃশ্বাসে করেই কামিনী চোখ তুলে উত্তর জানতে তাকিয়ে থাকে রতনের মুখে।

রতনঃ ঘামতে থাকে, শার্ট ভিজে চুপসে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে যায়। সত্যিই এবার বিশ্বাস হয় রতনের কামিনী! রতন হাত বাড়িয়ে কামিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে কামিনী তুমি এত দিন কোথায় ছিলে। আমি তোমাকে পাগলের মত খুঁজেছি। কোথাও খুঁজে পাইনি। বলেই দুচোখ জলে ভরে যায় রতনের। সঙ্গে কামিনীর দুচোখেও জলধারা বয়ে যায়। একটু পর সম্বিত ফিরে পায় রতন। কামিনী তাহলে অন্যের স্ত্রী। এ কথা মনে করতেই কামিনীকে বাহুপাশ থেকে আলগা করে দেয়। না না তুমি অন্যের স্ত্রী। সরি! কামিনী।

কামিনীঃ না না রতন ; আমি কারো স্ত্রী নই।

রতনঃ তাহলে ঐ লোকটা।

কামিনীঃ ঐ লোকটা আমার কেউ না।

রতনঃ এ কথা শুনেই রতনের মাথা ঘুরতে থাকে। তাহলে তুমি যার সঙ্গে এসেছ সে কেউ না ! আরো ঘোরের ভেতর ডুবে যায় রতন।

কামিনীঃ গম্ভীর কণ্ঠে কামিনী বলে হ্যাঁ রতন। লোকটা আমার কেউ না । তবুও লোকটার সঙ্গে আছি অনেক বছর।

রতনঃ কি বলছো। লোকটা কেউ না আবার তার সঙ্গে আছো অনেক বছর। খুলে বলো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

কামিনীঃ লোকটার সাথে অনেক গুলো বছর এক সাথে আছি। বাংলাদেশ থেকে পাচার হবার পর এই লোকটার হাতে পড়েই তার সাথে আছি। এই দীর্ঘ সময়ে পালাবার কোন পথ পাইনি ; বলেই কামিনী ঝর ঝর করে কাঁদতে থাকে।

রতনঃ জড়িয়ে ধরে বলে কোঁদোনা। তারপর কিভাবে এই লোকটার হাতে এসে পড়েছো ?

কামিনীঃ সে অনেক কথা রতন যদি সময় পাই তবে আবার শুনো। এখন এক কাজ করো রাত বেড়ে যাচ্ছে হাত ইশারা করে বলে ঐ দিকটায় বুফে খাবার দিয়েছে। খেয়ে এসো রাত অনেক। বলেই বেরিয়ে যায় কামিনী নিজের রুমের দিকে।

রতন দরজার ফাঁক দিয়ে অবাক বিস্ময়ে চলে যাবার দৃশ্য দেখে। রতন ইচ্ছে করেই দরজার বাইরে যায়নি কামিনীর পিছে পিছে। রুম থেকেই দেখতে পায় কামিনী দরজার কাছে যেতেই সেই লোকটা কামিনীকে গালে এক চড় কষে কি যে বলছে হিন্দী ভাষায়। দূর থেকে অস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না। এ দৃশ্য দেখে রতনের প্রচন্ড রাগ হয় লোকটির উপর। মনে হয় এখুনি গিয়ে ঘুষি মেরে লোকটির নাক ফাটিয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু না কামিনীকে তার উদ্ধার করতে হবে এখান থেকে। কিন্তু কিভাবে। চিমত্মা করতে থাকে। রাত অনেক হয়েছে। দরোজার ফাঁক দিয়ে কামিনীর দরোজার দিকে তাকিয়ে থাকে। কখন আবার কামিনী ঘর থেকে বের হবে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণ পর দেখে লোকটি বগল দাবা করে কামিনীকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে রাসত্মার দিকে। রতন আর থাকতে পারে না। তক্ষুনি ঘর থেকে বের হয়। পিছু নিতে থাকে। লোকটি টলতে টলতে কামিনীর বাম হাতে বগলদাবায় অতিথি শালার দিকে ঢোকে। রতনও এমন ভাবে পিছন পিছন যেতে থাকে যেনো লোকটি কিছু বুঝতে না পারে। দ্যাখে বুফে দেয়া খাবারের দিকে যাচ্ছে। দুটি প্লেট নিয়ে কামিনী একটি লোকটিকে দিলো। অন্যটি নিজের হাতে ধরে লোকটির পিছন পিছন হাঁটছে। দুজনে খাবার নিচ্ছে। মাঝে মধ্যে কি যেনো অস্পষ্ট ভাষায় কামিনীকে কি একটা বলেই মুখে ঘুষি মেরে আবার হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতেই খাচ্ছে। কামিনী খাবার নেয়ার চেয়ে এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজছে। লোকটি যখন পিছনে কামিনীকে খেয়াল করে তখন কামিনী খাবার নেয়। হাঁটতে হাঁটতে রতনকে দেখতে পায়। আবার হাঁটে। রতনও প্লেট নিয়ে খাবার নিতে নিতে দ্রুত কামিনীর কাছাকাছি পৌঁছে। কামিনী হঠাৎ রতনকে নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ হতে বলে। যেনো লোকটি কিছু বুঝতে না পারে। রতন নিজেকে সামলে নেয়। কিন্তু খাবারের চেয়ে কামিনীর কাছে যাওয়ার জন্যই বেশী উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। খাবার হাতে লোকটির সাথে কামিনী একটি টেবিলে গিয়ে বসে। খাচ্ছে না তেমন কিছুই। বরং ভয়ে জড়ো সড়ো হয়ে আছে। একটু দূরে রতনও অন্য একটি টেবিলে গিয়ে বসে। এক পর্যায়ে লোকটি কামিনীকে নিয়ে যেভাবে বগলদাবা করে এসেছে সেভাবেই ওঠে বেরিয়ে যায়। রতনও দূত পদে ওদের পিছু নেয়। তারপর দেখে কামিনী যে ঘরে ওঠেছে লোকটি সে ঘরে ঠেলে দিয়ে আবার ফিরতি পথে হাঁটছে। রতন এবার একটু আড়াল হলো। লোকটি টলতে টলতে নিজস্ব ভঙ্গিতে তাঁবু গুলোর পাশ দিয়ে গিয়ে ঢোকে ক্যাম্প ফায়ারের দিকে। তাঁবু গুলোও পর্যটকদের বাসস্থান। ক্যাম্প ফায়ার এখানে একটি সুন্দর অনুষ্ঠান যা ডিনারের আগেই শুরু হয়। কিন্তু রতন কোন কিছুতেই অংশ নিতে পারছেনা। তার এখন একটিই চিমত্মা। যে করেই হোক কামিনীকে এখান থেকে উদ্ধার করতে হবে। দ্রুত পদে কামিনীর ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে কামিনী লোকটা ভেবে দরজা খুলে দিতেই রতন ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।

কামিনীঃ রতন তুমি তোমার ঘরে চলে যাও এখন অনেক রাত। লোকটা যে কোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে।

রতনঃ কামিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে কামিনী তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো আমি। যে করে হোক।

কামিনীঃ দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে নাহ্ রতন। তোমার বউ বাচ্ছা আছে। আমাকে নিয়ে তুমি কি করবে। আমি তো নষ্ট হয়ে গেছি ; বলেই কেঁদে ওঠে।

রতনঃ বউ তো তুমি হওনি কখনো। বউ কোথা থেকে আসবে ?

কামিনীঃ কেনো, তুমি বিয়ে করোনি ?

রতনঃ তুমি তো নেই। বিয়ে কাকে করবো ?

কামিনী এ কথা শুনেই কামিনী আরো বিস্মিত হলো ! রতন!! বলেই রতনকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার পর কি মনে করে এক পর্যায়ে ছেড়ে দেয়।  বলে,  আমিতো তোমার সঙ্গে যেতে পারবনা।

রতনঃ কেনো ?

কামিনীঃ আমার কাছে কিছুই নেই। গত বিশ বছরে আমি এ লোকটার অত্যাচারে সব হারিয়ে ফেলেছি।

রতনঃ কিছুই হারাওনি। চলো আমরা এখান থেকে চলে যাই। চলো।

কামিনীঃ তুমি কী পাগল, তুমি জানো ঐ লোকটা; মানে ইন্দ্র নাথ কত খারাপ লোক। তোমাকে আমাকে আসত্ম রাখবে না। লোকটার অনেক টাকা। সে প্রায়ই এখানে আসে ফূর্তি করতে। সঙ্গে নিয়ে আসে আমাকেও। লোকটা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে পারে।

রতনঃ তবুও তুমি চলো। আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবোই।

কামিনীঃ লোকটি মাতাল যে কোনো সময় এখানে আসতে পারে রতন। তুমি তোমার ঘরে যাও।

রতনঃ লোকটি রাতে কী এ ঘরে ঘুমাবে ?

কামিনী ঃ নাহ্ লোকটি গেষ্ট হাউজে ওঠেছে। কিন্তু আমার এ ঘরে তো যখন তখন আসতে পারে।

রতনঃ তুমি তাহলে আমার ঘরে এসো। বেশী রাত বাকী নেই। চলো দুজনে এখান থেকে সরে পড়ি।

কামিনীঃ শুস্ক হাসি দিয়ে বলে রতন! তুমি এ বয়সে আর আমাকে নিতে চেয়ো না। আমার কাছে কিছু নেই।

রতনঃ তুমি কি বলছো কামিনী! তোমার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করেছি। তোমাকে অনেক খুঁজেছি। আজ আমি তোমাকে নিয়েই যাবো। যতই দুঃসাধ্য হোক!

কামিনীঃ কিন্তু তোমার গ্রামের লোক ! তোমার বাবা মা, তাদের কি বলবে ? তাদের মুখ তো বন্ধ করতে পারবে না। তারা তো জানে আমাকে বখাটে ছেলেরা ধরে নিয়ে গেছে। আর এত বছর পর একটা মেয়ে মানুষ ফিরে এসেছে গ্রামে। সে যে ভাল ভাবে আসেনি এ কথা সবাই ধারণা করবে।

রতনঃ সে তোমার ভাবতে হবে না। আর বাবা মা ? সেতো কবেই আমাকে ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন।

কামিনীঃ তোমার বাবা মা; মানে চাচা চাচী নেই ?

রতনঃ নাহ্

কামিনীঃ কি বলছো ? বলেই অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে রতনকে। ভাবে রতন তাহলে কত একা! কামিনীর ভীষণ মায়া হয় রতনের জন্য।

রতনঃ হ্যাঁ কামিনী, মা মরে যাবার আগেও বিয়ে দিয়ে আমাকে সংসারী করতে চেয়েছেন। আমি রাজী হইনি বলে মা মনে অনেক দুঃ খ নিয়ে চলে গেছেন।

কামিনীঃ (শুনে খুব ব্যথিত হলো কামিনী) তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে বললঃ সমাজ বলে তো একটা কথা আছে। তুমি সমাজের কাছে হেয় হয়ে যাবে। আমি অস্পশ্যা। ঐ বখাটেরা আমাকে এনে কোন একটা ঘরে রেখেছে যেখান থেকে কেবল ধূ ধূ প্রামত্মর ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। কয়দিন ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা। ঘুম ভাঙলে মাঝে মাঝে দেখেছি বরফ আর বরফ চারিদিকে। আবার মাঝে মাঝে শুধুই বালি আর বালি। ঠিক এ জায়গাটার মত। তবে বাংলাদেশ থেকে সীমামেত্মর কাছাকাছি কোনও একটি জায়গা মনে হলো। কেবল সারাক্ষণ আমার চোখে ঘুম লেগেছিলো। তারপর সীমামত্ম পাড়ি দিল বোটে করে নদী পথে। তারপর একটা আসত্মানায় এসে পড়ি। আমার মত অনেক মেয়ে সেখানে এভাবেই এসে পড়ে। অনেক মেয়েরাই সেই আসত্মানায় রয়েছে। আসত্মানায় এসে বুঝতে পারি আমি বিক্রি হয়ে গেছি। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরেই টের পাই আমার শরীরটা মানুষ রূপী কুকুর ছিঁড়ে ফেলছে যেনো।  তিন চার দিন পর যখন ঘুমের নেশা কাটল। দেখি ছোট্ট একটি খুপড়ি ঘরে আছি। কিছু পর বেশ বয়েসি এক মহিলা এসে খুব বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করল। বললঃ ঠিক মত যেনো কথা শুনি। কিছুই বললাম না। সন্ধ্যার পর যে লোকটা আমার ঘরে এসে ঢুকলো সে লোকটা এই লোকটা। তার পিছনে সেই বয়েসি মহিলাটি ছিলো। আমাকে দেখেই মহিলাকে বললঃ ঐ খালা মালডা দিয়া দে। যত্ত রুপি লাগে লেহ্। তারপর … আমি এই লোকটার সাথেই আছি দীর্ঘ সময়। বলেই কামিনী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে! আবার বলতে শুরু করে।  আমাকে ছোট্ট একটি বাসায় সারাদিন তালাবদ্ধ করে রাখে। মাঝে মাঝে আসে না। বাইরে থেকে সব খাবার দাবার কিনে দিয়ে যায় লোকটি। যখন খুশি থাকে। যখন খুশি চলে যায়। কখনোই আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করে না। যখন মন চায় কেবল শরীরটাই ওর প্রয়োজনীয় বস্ত্ত। আচরণ বেজায় খারাপ। কখনো কোন কথা বলা যায় না। বাইরের আলো বাতাস দেখি, এই রকম কোথাও ঘুরতে বেরুলে; আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসে। লোকটির ঘর সংসার আছে। আমার কাছে আসলে মাঝে মধ্যে ফোনের কথা শুনে বুঝতে পারি। তারা কোন দিন জানতে পারেনি আমার কথা। লোকটি বড় ব্যবসায়ী। সারা কলকাতা শহরকে গিলে ফেলতে পারে।

রতনঃ কামিনীর সব কথা শুনে বললঃ  চলো কামিনী তোমাকে আমি নিয়ে যেতে চাই। এবং কোন সময় নষ্ট করা যাবে না।

কামিনীঃ নাহ্ রতন। তুমি চলে যাও। আমি এ মুখ আর এত বছর পর গ্রামের মানুষকে দেখাতে চাই না।

রতনঃ কামিনীকে জড়িয়ে ধরে বলেঃ কামিনী এতে তো তোমার কোনো দোষ নেই। এ তোমার নিয়তি। আমাদের অসভ্য সমাজ ব্যবস্থার ঘৃন্য ও জঘন্য রূপ। এতে তোমার কোন অপরাধ তো নেই। তুমি চলো। সে সব আমি দেখব। আমি শুধু তোমাকে নিয়ে যেতে চাই। এটাই আমি বুঝি। চলো। বলতেই দরোজায় টোকা। সঙ্গে সঙ্গে দুজনে দুজনের মুখোমুখি চেয়ে আছে। কীভাবে কী করবে ; ভেবে পায় না। এদিকে দরোজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। রতন কামিনীর বাম হাত শক্ত করে ধরে ইশারা করল। কামিনী দরোজা খুলতেই রতন দেখল লোকটি টলতে টলতে ঘরে ঢুকছে। রতনকে দেখেই বললঃ এই শ্যালা …… বলে রতনের হাত ধরতে যাবে অমনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কামিনীর হাত ধরে দরোজা দিয়ে বের হয়ে দুজনেই ভোঁ দৌড়। রাত শেষের দিকে। তাঁবু গুলোর রো দিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে এক জায়গায় খানিকটা দাঁড়াল। সোড়িয়ামের সামান্য আলোতে পিছন ফিরে দেখল লোকটি চেঁচাতে চেঁচাতে আসছে। ওরা দ্রুত পদে আবারো অন্ধকার দেখে দেখে দৌঁড়াচ্ছে।

হাঁপাতে হাঁপাতে রতন বললঃ এখান থেকে ফিরব কিভাবে বলো…।

কামিনীঃ এখান থেকে কিছু পরে ভোরের দিকে ফিরতি বাস যাবে জয়সলমের দিকে। এছাড়া উট এখানে আরেকটি বাহন।

রতনঃ না বাস ধরতে হবে। উটে যাওয়া যাবে না। লোকটি আমাদের ধরে ফেলবে। চলো যতটা পারো দৌঁড়াই। ওরা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বালিয়াড়ির উপর দিয়ে অনেক পথ পার হয়ে আসে। খানিকটা উঁচু বালির ঢিবির আড়ালে এসে ক্লামিত্মতে বসে পড়ল। আবার ওঠে দৌঁড়াতে লাগল। পিছন ফিরে দেখলো; না লোকটিকে দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না কিছুই। দিনের আলো কিছুটা ফর্সা হতে লাগল। কিন্তু তবুও থামা যাবে না বলল রতন। লোকটা আমাদের ধরে ফেলবে।

কামিনীঃ খুব পানির পিপাসা পেয়েছে রতন। আর দৌঁড়াতে পারছিনা। একটু জিরিয়ে নেই।

রতনঃ কামিনীকে জড়িয়ে ধরে বলে কামিনী, আর একটু কষ্ট করো; কোনো ঘর বাড়ি দেখলেই একটু বিশ্রাম নিবো। তা না হলে লোকটি যদি আমাদের পিছু নিয়ে থাকে তবে তো আমাদের ধরে ফেলবে।

কামিনীঃ মাথা নাড়ে হুঁ ; বলেঃ লোকটি ভয়ংকর ও ক্ষমতাবান। চলো – বলেই দুজন আবার দৌঁড়াতে থাকে। দিনের আলো একেবারেই ফর্সা হয়ে ওঠেছে। দূরে গাছ-গাছালি দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ঘর বাড়ি থাকবে আশে পাশে। কামিনী রতনকে হাঁপাতে হাঁপাতে হাত ইশারা করে বললঃ  রতন ঐ যে দূরে জন বসতি দেখা যাচ্ছে না ?

রতনঃ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে হ্যাঁ। আর একটু কষ্ট করে দৌঁড় দাও। জনবসতির কাছে পৌঁছাতে পারলেই বিশ্রাম নিবো।

কামিনীঃ হ্যাঁ। দুজনে দৌঁড়ে কোনও রকমে জনবসতির কাছে পৌঁছাল। রাসত্মার একপাশে কামিনীকে রেখে রতন পাশে দোকানে গিয়ে পানি আর পাউরুটি নিয়ে এলো। কামিনী ততক্ষণে ক্লামিত্মতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল।

রতনঃ মুখে পানি ছিটা দিয়ে ডাকল। দেখল অজ্ঞান হয়ে গেছে কামিনী। হাতে থাকা পানি আর পাউরুটি রেখে দিল পাশে। হঠাৎ কান্না জড়িত কণ্ঠে রতন বললঃ কামিনী তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি ; বলেই কামিনীর মাথাটা কোলে নিয়ে আবার পানি ছিটা দিলে কামিনী নড়ে চড়ে ওঠল। রতন আশ্বসত্ম হলো।

রতনঃ কান্না ভেজা গলায় বললঃ পানি খাও। বলেই হাতের গ্লাসটা এগিয়ে দিলে মুখ খুলে পানি খেয়ে নিল কামিনী। একটু বিশ্রাম নিয়ে দুজনে ওঠে হাঁটতে হাঁটতে একটা ট্যাক্সি পেলো,  ট্যাক্সিকে জয়সলম যেতে বললঃ ট্যাক্সি যাবে না।

রতন বললঃ বেশী ভাড়া দিবে। তাতে রাজী হলো ড্রাইভার। এসেই জয়সলম নেমে পড়ল। কলকাতার সীমামত্ম এলাকার বাস খুঁজছে।

কামিনী বললঃ …. ঐ … যে … ওই বাসটি বেনাপোল সীমামত্ম পর্যমত্ম যাবে। দুজনে দৌঁড়ে বাসের দিকে যাচ্ছে। হঠাৎ কামিনী দেখতে পেলো লোকটাকে। রতনকে হাত ধরে টান দিয়ে পিছনের দিকে নিয়ে একটা বাসের আড়ালে বসে পড়ে। দুজনে দূর থেকে দ্যাখে লোকটার গতিবিধি। লোকটা চলমত্ম বাস গুলোর কাছাকাছি ঘুর ঘুর করছে। দুজনে কিভাবে বাসে ওঠবে। ঠিক পাচ্ছে না। লোকটা সরে গেলেই ওরা যে কোনো বাসে ওঠবে। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে চলমত্ম বাস গুলোর লাইন পর্যমত্ম পৌঁছাল। কিন্তু সাহস করে ওঠতে পারছে না।

রতনঃ কিছুটা পথ ঘুরে গিয়ে বাস ধরবো।

কামিনীঃ ঠিক আছে। বলেই দুজন পিছন পথে এসে একটি ট্যাক্সি ঠিক করল পরের ষ্টেশন পর্যমত্ম।

ট্যাক্সি থেকে নেমে বেনাপোল বাসে ওঠতে যাচ্ছে অমনি পেছন থেকে লোকটি চেঁছাতে লাগল। কামিনী বাসে ওঠে গেলো;  কিন্তু রতন ওঠতে পারলনা। গাড়ি ছেড়ে দিল। রতন বাসের সাথে সাথে জানালা ধরে দৌঁড়াচ্ছে। কিছু দূর এভাবে যেতে যেতে কামিনী বাসের দরজা শক্ত করে ধরে রতনকে হাত ধরে টেনে বাসে ওঠালো। বাসে দুজন ক্লামিত্মতে বসে থাকল। কিছুক্ষণ মুখে কোনো কথা নেই।

রতনঃ মনে মনে ভাবলো লোকটা পিছু নিবে। কামিনীকে বললঃ পরের ষ্টেশনে নেমে যাবো।

কামিনীঃ আচ্ছা।

দুজনে পরের ষ্টেশনে নেমেই আরেকটি বাস বদল করল। সারাটা দিন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। খুবই ক্লামত্ম দুজন। কিন্তু সমস্যার পর সমস্যা। রতনের পাসপোর্ট আছে। মনে মনে ভাবল, ভাগ্যিস প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগটা রাখা ছিল। তাই পাসপোর্ট আর টাকা পয়সা সাথে আছে। না হলে বিপদ আর কাকে বলে। কিন্তু কামিনীকে কিভাবে নিবে। ভাবতে ভাবতে কামিনীকে বলে ঐ লোকটা বর্ডারে তোমার নাম বলে রাখলে তো ঝামেলা হবে …। আবার নাম জিজ্ঞেস করলে তুমি যদি মিথ্যা নাম বলতে গিয়ে থমথ খাও অথবা সত্যিকার নামটা বলো তাহলে তো বিপদ আছে।

কামিনীঃ লোকটা আমার নাম জানেনা।

রতনঃ তাই নাকি ? কী বলো। এতদিন একসাথে থাক। বলছো তোমার নাম জানে না ?

কামিনীঃ হ্যাঁ।

রতনঃ কেনো জানেনা ?

কামিনীঃ কখনো জিজ্ঞেস করেনি।

রতনঃ না জানে তো ভালো। কিন্তু তোমাকে কি নামে ডাকে ?

কামিনীঃ সুন্দরী।

রতনঃ বেশ তোমার নাম না জানলে ভাল। শুনো সীমামেত্ম তোমাকে সাবধানে পার হতে হবে। আমি বলব আমার স্ত্রী। তুমি খুব দ্রুত পার হয়ে যাবে। আমি পুলিশের সাথে কথা বলতে বলতে পার হবে কেমন। পুলিশের সামনে গেলেই তুমি আমাকে পাস করে যাবে দ্রুত। ওখানে তোমার এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর দরকার নেই। বুঝেছো ? চলো …।

কামিনীঃ মাথ নেড়ে বলল ঠিক আছে।

বাস সীমামত্ম স্টেশনে এসে পৌঁছাল। কিছু দূর হাঁটতে হবে। ঐদিকে লোকটার ভয়। না জানি পুলিশকে খবর দিয়ে দিয়েছে কি-না। কে জানে। ভাবতে ভাবতে রতন কামিনীর হাত ধরে হাঁটছে। আর ভাবছে পুলিশকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হবে। সীমামেত্মর গেটে পৌঁছে সবাই লাইন ধরে পার হচ্ছে। চেকপোস্টে চেক হচ্ছে কাগজ পত্র, মালামাল। ওদের সাথে অবশ্য কিছুই নেই। ভালই হলো। রতনের সামনে কামিনী। কামিনীকে রতন হাত দিয়ে ঠেলে ইশারা করলেই কামিনী দ্রুত সামনে চলে যায়। পুলিশ কামিনীকে থামাতে থামাতে রতন পুলিশের হাত ধরে কিছু একটা বলতে যাবে অমনি লোকটি পিছন থেকে এসে খপ্ করে রতনের হাত ধরতে গেলে রতন এক দৌঁড়ে বাংলাদেশ সীমামেত্ম ঢুকে পড়ে। অদূরে কামিনী দাঁড়ানো ছিলো। সে দূর থেকে দেখছে পুলিশকে কী যেনো বলছে। পুলিশ এদিকে আসছে। ওদিকে রতন কামিনীর হাত ধরতেই দুজনে মিলে আবারো ভোঁ দৌঁড় সীমামত্ম এলাকার গ্রামের ভেতরে। এসেই ওল্টো পাল্টো পথে অনেক দূর চলে আসে। রাত বাড়তে থাকে। জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কোন মতে এসে একটা আধা পাকা বাড়ির আঙ্গিনায় এসে এক পাশে বসে থাকে। লোক পেলে তবেই অনুনয় বিনয় করে বলবে ঘরে যেনো রাত কাটানোর সুযোগ দেয়। কিন্তু রাত বেড়ে যায় কোনো লোক আর ঘরের বাইরে আসে না। ঐ দিকে পুলিশের ভয়। সীমামত্ম এলাকাতেই আছে ওরা। যে কোনো মুহুূর্তে পুলিশ এসে খুঁজতে পারে। তাছাড়া যে দেশের পুলিশই হোক,  পুলিশ মানেই তো হয়রানি। আর বাংলাদেশের পুলিশ তো আরো খাচ্ছর। রতন চিমত্মা করে কি করবে। এদিকে ক্ষুধায় হাত পাও অবশ হয়ে আসছে। এত রাতে বের হবারও কোনো জোঁ নেই। সাবধানে এদিক ওদিক ঘুরে দেখে। কুকুর থাকলে তো এই জায়গাটাও বদল করতে হবে। ঐদিকে ধরা পড়ার ভয় তো আছেই। পাশে লাকড়ি রাখার একটি খুপড়ি ঘর দেখতে পায়। দুজনে খুবই ক্লামত্ম। কোনরকম শব্দ না করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। দেখে খড়ের গাদা। উপরে কেবল হোগলা পাতার চাল দেয়া। খুব সাবধানে দুজনে উঠে খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ে। ক্ষুধায় কারোর চোখে ঘুম নেই। অনেকক্ষণ চুপ থেকে রতন দুহাত দিয়ে কামিনীকে জড়িয়ে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কামিনী বলে রতন তুমি আমাকে এত দূর নিয়ে এলে। কিন্তু আমি তোমার যোগ্য নই। আমি তো সর্বহারা। তোমার কামিনী কবেই হারিয়ে গেছে। রতন কামিনীর মুখে হাত দিয়ে কামিনীকে থামিয়ে দেয়। বলেঃ এসব কথা এখন থাক। আমার কাছে তুমি এখনো আগের মতই আছো; বলেই অন্ধকারে কামিনীর অশ্রু সজল চোখ মুছে দেয়। কামিনী আর বাধা দেয় না। দুজনে ক্লামিত্মর নোনা শরীরেও ভীষণ আদিম উষ্ণতায় ডুবে যায়। রতন কামিনীকে বলেঃ এতদিন আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছো;  আজ তোমাকে একটুও ছাড়বোনা। হিসেব করে সবই আদায় করে নিবো। বলেই দুজন দুজনকে মধুর বাধনে বেধে ফেলে অতি আনন্দে। গলা জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে সারারাত। তারপর সকাল হলেই বাসে ওঠে ঢাকা যাবে। ঢাকা হয়ে বাস বদল করে যাবে রামগঞ্জে।

Chhora-kobita

মাতৃভূমি ভালো থেকো

খোশনূর

download

হে মাতৃভূমি

তুমি কেমন আছো ?

যে হতাশা হাহাকার তোমার বুকে

দেখি যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ হৃদপিন্ডে

কতোটা ভালো আছো তুমি বুঝি না!

হে জননী মাতৃভূমি ছোট বড় স্বপ্ন ভাঙলেও

কেঁদোনা আর ; কতো আর জ্বলবে তুমি

কত আর কাঁদবে বলো

তোমার আকাশ মেঘে ঢাকবে না আর

তোমার সুর্য হাসবে চিরকাল

তুমি ভোল দুঃখ

তোমার নদী বইছে

প্রকৃতি কতো সজীব তোমার

কী মধুর রাখালী সুর; কলরব পাখিদের

শিশুর হাসি আর হাওয়ার গান

ফসলের মাঠে উদ্দীপনার প্রতিশ্রুতি

ফুলের সমারোহে শ্রদ্ধায় বিভোর শহীদ মিনার

স্মৃতিসৌধ ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে

মাতৃভূমি তুমি বায়ান্ন হতে

বিপ­বের পথে রাজপথে চলছো দুঃসাহসী

তুমি সর্বংসহা জননী

ঝড় বন্যা খরা দুর্যোগে

অটল তুমি সহনশীল কেঁদোনা আর

আমরা তোমার কোটি কোটি সমত্মান

তোমার হাসিতে পুলকিত হই

হই কর্মতৎপর-সমৃদ্ধশালী-সুখী

ভালো থেকো তুমি প্রিয় জননী।

j

 গোলাপের বুকে রঙ্গীণ প্রজাপতি

আলমগীর সরকার লিটন

 ও যমুনার ঢেউ বয় কল কল

ভুবন জুড়ে সূর্য দেয় অহা কি আলো,

ও দয়াল সকাল সন্ধ্যার কি রূপ দিলে

করলে না করলে না একটু উনুভূতি

গোলাপের বুকে মধু সংগ্রহে ভয়

না করে একটুও রঙ্গীণ প্রজাপতি।।

তবে কেনো সত্য পথে চলতে কেউ

হয়না রে রাজি ধোকার কাজে পাজি

ও ও সত্য কথা বলতে বুক কাঁপেনা

কে দিবে গলায় ফাঁসি- দয়াল গুরু

কেমনে হবে হাসি খুশি- ভয় করেনা

ভয় করে না রঙ্গীণ প্রজাপতি।।

আর কত জীবন সংসারে রঙের

মন দেহ রঙ্গীন করে পঁচাবি

বট ব্রক্ষের মত ছায়া অবিরত

উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে কোনদিন জ্বলবি,

রঙ্গীণ প্রজাপতির ডানা মেলে কখন

জানি আকাশ বাতাস কে ফাঁকি দিয়ে

শূণ্য চলে যাবি ও রঙ্গীণ প্রজাপতি 

kk   আরাধনা

মেহেদী হাসান

imagess

 চুম্বনে চুম্বনে রক্ত-লাল বেল রং শরীর, আর নয়-

এবার ঘন-নীল মেঘের মত জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়।

মৃদু জলে ভরা সমুদ্র চোখ দুটো বিছিয়ে রেখো,

 সেখানেই ঘুমোবো দুজন জড়াজড়ি করে।

কাশ ফুলের মত নরম চুলে আঙ্গুল চালাতে চালাতে-জিজ্ঞেস করবোঃ

তুমি আমার ঈশ্বর হবে?

ছি ছি ছি—-

না না না না—

তুমিই আমার শরীরী ঈশ্বর,

তোমাকে গড়েছি আমার একান্ত  ঈশ্বর।

মানুষ কি পারে তৈরী করা ঈশ্বর ছাড়া বাঁচতে?

কাঁচা আলোর নদী ছেড়ে, কে ডুবে মরে সাতস্তর অন্ধকারের ওপারে!

তোমার অভ্যন্তরে কয়েক মূহুর্তের উষ্ণ প্রাসাদ,

আর তাহার মাঝে জমাট শীতলতা করি অনুভব।

তুমি নিথর থাকবে শুয়েঃ

তোমার প্রতি অঙ্গে শিহরন হয়ে ফুটবে আমার আরাধনা;

তোমার নাভীমূল থেকে আপনি গজিয়ে উঠবে পূজোর ফুল।

শীৎকারে-চিৎকারে তোমার নরম ছোট হাত

মাথায় বুলিয়ে ছড়িয়ে দেবে মুঠো মুঠো চূর্ণ আশীর্বাদ।

ভক্তিতে উপচে উঠলে নগ্ন পেয়ালা দেহ,

কিছুটা ঝাঁকুনি ছিলকে ফেলে আবার নিথর হয়ো।

অবয়বহীন কি ভালোবাসা যায়-কিভাবে বাসা যায় ভালো!

ভয়ই বা কি আর সমীহই বা কেন?

পূর্ণিমার রাতের আঁধারে পাশের জানালাটি যাবে খুলে,

জ্যোৎস্নার সাথে মিশে পরবো ছড়িয়ে তোমার শরীরের সমস্ত আনাচে কানাচে-

আলোর ধর্ম অমান্য করে এগিয়ে যাবো বাহারি গলি পথ ধরে।

  চাঁদটাও ক্লান্ত এতক্ষনে,

আমিই শুধু অবিরাম স্পষ্ট আরাধনায়।

aaaa

 টোকাই

সামসুন্নাহার ফারুক

 

টোকাই টোকাই টোকাই

দিচ্ছি শুধু ধোকাই

ফিচার লিখে কার্টুন এঁকে

বানাচিছ তাই বোকাই

আসলে তো আগের মতোই

রয়ে গেছি টোকাই।

r

 আন্না মাসির রান্না

আন্না মাসি রান্না করেন

রাবড়ি মালাই দই

টক-ঝাল আর মিষ্টি মাখা

সর্ষে ইলিশ কই

পোসত্ম বাটা ঝিঙ্গে বড়ি

রাঁধেন তিনি খাসা

কৈ’র তেলে কৈ ভাজার

রেসিপিটা তার ঠাসা

মোরগ পোলাও কাচ্চিতে তার

জুড়ি মেলা ভার

ধন্যি আমার আন্না মাসির

রান্না সমাচার।

FLOWERS

Dharabahik Uponnas-1

সমাধি ‘পরে 

লুতফুন নাহার 

k4281572

(গত সংখ্যার পর)

আগামীকাল নভেম্বরের ১তারিখ ।সুরমা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে যাচ্ছে ।তার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নিল । একটা লেকচার শিটও তৈরী করে নেয় । সায়েমকেও বিষয়টি অবগত করে । যদিও সায়েমের নিকট থেকে কোন ভাল প্রতিক্রিয়া আসে নি, যা এসেছে তা তাচ্ছিল্য আর ব্যঙ্গাত্বের । তাতে সুরমার কিছুই যায়-আসে না । সুরমা স্ত্রী হিসেবে সায়েমের নিকট অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তাই নামে মাত্র সে অনুমতি নিয়ে নিল । সেদিন রাতে সুরমা ঘুমাতে পারছিল না । অন্য রকম এক জীবনের আনন্দ আর অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে যাচ্ছে পরবর্তী দিন থেকে সে আবেগে তার সারা রাত কাটে । পরদিন সকালে খুব ভোরেই বিছানা ছেড়ে সুরমা নিজেদের ফ্ল্যাটে যায় । বাবা-মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের আর্শিবাদ নেয় । কিছুটা আবেগপ্রবণও হয়ে পড়ে । তারপর একটু আগে আগেই গেট-আপ হয়ে শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর আর্শিবাদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে ।

এভাবে কয়েক মাস কেটে যায় ।সায়েম সুরমার সাথে গৃহ পরিচারিকার মতই ব্যবহার করতে থাকে ।এক রাতে সায়েম সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে । তার মানে সায়েম অফিস থেকে সোজা বাসায় । বিয়ের পর আজই ব্যতিক্রম কিছু ঘটতে দেখল যে, সায়েম ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরে এসেছে, আজ সে ড্রিঙ্কও করেনি। রাতে সবার সাথে খাবার খেল ।খাবার খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকল ।সুরমা পিছন পিছন এক গ্লাস দুধ হাতে ঘরে ঢুকল ।সুরমা ভিতরে ভিতরে খুব খুশি হল । ও ভাবতে শুরু করল, ওর স্বামী হয়ত: ধীরে ধীরে ঐ মন্দ পথ থেকে ফিরে আসতে শুরু করেছে ।সুরমা মনে মনে ঠিক করল, আজ সে যে ভাবেই হোক তার ভালবাসার মানুষের প্রেমের দরজা খুলবেই ।তার বিশ্বাস, প্রেম, ভালবাসা দিয়ে সব কিছু জয় করা সম্ভব ।সুরমা দুধের গ্লাসটা সায়েমের দিকে বাড়িয়ে দেয় । সায়েম গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক চমুকেই তা পান করে নিল ।তার পর বেঙ্গাত্বের এক হাসি হেসে বলল-

চাচাতো বোন হিসেবে তো ভালই ছিলে । মাঝে মাঝে দু, একটা বকাঝকা দিলেও ঝি চাকরাণীর মত তো কখনও ব্যবহার করিনি । আমাকে নিয়ে ভালবাসার স্বপ্ন দেখার মজাটা এবার টের পেয়েছ তো । আচ্ছা, ইংরেজিতে মার্ষ্টাস করার পর একটা মেয়ে ক্লাব, র্পাটিতে না যেয়ে ঘরকুনো ব্যাঙ হয়ে বসে থাকে তোমার মত?

ঃ আমি জানি না । তবে, এটা জানি ঐ সবে কৃতিত্ব কিংবা সামাজিক মযার্দাকোনটাই নেই এবং থাকতে পারে না । ঐসব লাগামহীন আর অশালীন ব্যক্তিত্বের       বহি:প্রকাশ মাত্র । তোমার মত so-called ultra-modern ছেলের কাছে  আমার চাল-চলন uncultured, সেকি মনে হলেও ভদ্র সমাজে একে ‘ভদ্রতা’ নামে       অভিহিত করা হয় । আর যা-ই হোক মদে গোবর হয়ে যাওয়া ঐ মস্তিষ্কে আমার কথাগুলোর মানে পরিষ্কার না হওয়াটাই স্বাভাবিক ।

ঃ Shut up and get lost. ভূতের মুখে রাম নাম! ভদ্রতা! ইস্ ভদ্রতা!এই র্মূখ, ভদ্রতার মানে বুঝিস্? আমাকে জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে? আমারঘরে থেকে আমাকে তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে, তাই না? কোন অধিকারে আমার ঘরে ঢুকিস্?

ঃ স্ত্রীর অধিকারে । যে প্রেমের জন্য ক্লাবে গিয়ে ফূর্তি করে আস তা ক্ষণিকের ।রাতের ঘুম ভেঙ্গে গেলে স্বপ্নের ঘোর যেমন কেটে যায়, তোমার প্রেমের ঘোর তার চেয়েও ক্ষণিকের ।এখনও সময় আছে ফিরে আস । একবার আমার দিকে চেয়ে দেখ, যে মেয়েদের নিকট যাও তাদের চেয়ে আমি কোন অংশে কম কিনা । ঐ সব মেয়ে তোমাকে ভালবাসে না ।তোমার টাকাকে ভালবেসে তোমার কাছে শুধু দেহটা বিলিয়ে দেয় ।খোঁজ নিয়ে দেখ, মনের তল খোঁজে পাবে কিনা । যখন থেকে প্রেম ভালবাসা শিখেছি, তখন থেকে তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, তোমাকে ভালবেসেছি, লজ্জায় কোন দিন তোমায় প্রকাশ করিনি।তোমার বাবা-মা যখন তোমার –আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় তখন আমি একবারের জন্যও নিষেধ করিনি। কারণ, এ চাওযা যে আমার অনেক দিনের চাওয়া এবং যখন আমার সে চাওয়াই পূরণ হতে যাচ্ছিল সে আনন্দটুকুও কারও নিকট প্রকাশ করিনি । আজ তোমাকে জানালাম । আমার ভালবাসার মানুষকে জানালাম –এই বলে সুরমা সায়েমকে জড়িয়ে ধরে ।

সায়েম সুরমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। সুরমা নাছোড়বান্দার মত ওর নিকট ভালবাসা আদায় করার জন্য কতইনা কাকুতি মিনতি করে। বলে-একবার আমাকে ভালবেসে দেখ এই ভালবাসা কত পবিত্র, কত বিশ্বস্ত, কত স্বর্গীয়! এতে কত সুখ! কিন্তু তুমি যে ভালবাসার পিছনে ঘুরছ তা শুধু মরিচিকা হয়ে তোমার চোখে ধাধা লাগিয়ে বেড়াচ্ছে । তুমি তা থেকে সুখের পরিবর্তে জ্বালাই পাচ্ছ ।

ঃ বাজে কথা রাখ । আমি ঐ সব প্রেমকেই স্বাগত জানাই এবং আজীবনতা-ই করে যাব ।আমাদের ক্লাশের লোকেরা ঠুনকো বিয়েতে বিশ্বাসী নয় । আমার করুণা হয় তোমায় দেখে- আমাদের সোসাইটির একজন হয়েও তুমি এত সেকেলে কেন?

ঃ আমার বাবার এবং তোমার বাবার এবং তোমার social status যদি এক হয় তবেওনারা তো কখনও ক্লাব, পার্টি করে বেড়ায়নি ।তাদের সামাজিক মযার্দা তো        কোন অংশে কমেনি! বরং তুমি তাঁদের মযার্দা হানি করছ।

ঃ O’ you bloody hell!(সায়েম সুরমাকে চড় মারে) আরএকটা কথা বলছ তো খুব খারাপ হয়ে যাবে-এই বলে সায়েম একটা মদের বোতল নিয়ে ঢক্ ঢক্ করে খেতে লাগল । সুরমা সায়েমের পা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল-তোমাকে আমি আর বিরক্ত করব না ।তুমি আর খেয়ো না ।তুমি আমাকে পছন্দ কর না, ঠিক আছে করো না । জোর করে তোমার কাছ থেকে আর ভালবাসা আদায় করতে যাব না ।

এভাবে স্বামীর র্দুব্যবহার আর অবহেলায় সুরমার রাতগুলো কাটে আর মনে যে বিরহ অনল প্রতি নিয়ত জ্বলছে তা দিনের বেলায় শ্বশুর, শাশুড়ীর স্নেহ আর আদরের আবঢালে চাপা পড়ে থাকলেও তুষের আগুনের ন্যায় ধিকি ধিকি জ্বলে ।তার মনে কত কষ্ট সে কথা কারও নিকট প্রকাশ করার কেউ নেই, যাদের নিকট প্রকাশ করবে তাদের দুই জনই হাই-ব্লাড প্রেসারের রোগী । তাই তাদের সামনে মিথ্যে হাঁসি-খুশী থাকার অভিনয় করে চলে ওর দিন । একসময় স্বামীর অবহেলায় জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে যায় ।এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে বাবা মায়ের নিকট চলে যাওয়ার জন্য রাত দিন আল্লাহ্র নিকট র্প্রাথানা করে ।আল্লাহ্ তার প্রাথানায় সাড়া দিয়ে নাকী তার কষ্ট সইতে না পেরে এমন এক রোগ শশীরে দিয়ে দেয় যা থেকে পরিত্রাণ নেই ।মৃত্যুই তার পরিণাম ।প্রতি রাতে জ্বরে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপে । খাওয়া দাওয়ায় কোন রুচি নেই, কোন কিছু যেন তার মনে এতটুকু আনন্দ দিতে পারে না । চারপাশের পৃথিবীটা তার কাছে কেমন যেন নীরস হয়ে উঠে ।কিন্তু কারও নিকট কোন লক্ষণই প্রকাশ করেনি ।

একদিন সাবিহা চৌধুরী পুত্রবধূর শারীরিক অবস্হা খারাপ মনে করে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যান।ডাক্তার ব্লাড, ইউরিনসহ বেশ কিছু টেস্ট দেন । তিন দিন পর রির্পোট দেখানোর কথা । সাবিহা চৌধুরী কোন একটা কারণে সুরমার সাথে যেতে পারেন নি ।তাই ডাক্তারের নিকট সুরমাকে একাই যেতে হলো । ডাক্তার রিপোর্ট দেখে কোন ঔষধ দিলেন না এবং রির্পোট গুলো নিজের কাছেই রেখে দিয়ে বললেন- আপনার সাথে যিনি এসেছেন তাঁকে ডাকুন ।

ঃ তিনি তো আসেন নি ।

ঃতিনি আপনার কে হন?

ঃ আমার শ্বাশুড়ী ।কেন ডাক্তার? তাঁকে ডাকার কথা বলছেন কেন? রির্পোট সর্ম্পকেকিছুই তো বললেন না ।

ঃ  না, রির্পোটে কোন সমস্যা নেই ।ঠিক আছে, আগামী কাল আপনার শ্বাশুড়ীকে পাঠিয়েদিবেন অথবা অন্য কাউকে ।তাঁর সাথে আমার কিছু কথা আছে ।

ঃ কী কথা, ডাক্তার সাহেব? আমাকে বলেন । যদি কোন খারাপ রির্পোট এসেথাকে তাহলে আমার শ্বশুর কিংবা শ্বাশড়ী-কাউকে বলা যাবে না । কারণ, তাঁরাদু’জনেই হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী।এমনিতেই আমার শ্বশুরের দুই দুইবার স্ট্রোক হয়ে গেছে ।

ঃ  ঠিক আছে, তাহলে আপনার স্বামীকে পাঠিয়ে দিবেন ।আমি বললাম তো তেমনকিছু নয় । আমি শুধু অন্য বিষয়ে তাঁর সাথে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি ।

(ক্রমশঃ)

llChhoriye dilem chhora

ভালোবাসা নেই 

পরান তালুকদার

 qqqqq

আমি আছি তুমি নেই

প্রেম আছে ভাষা নেই

দেখা নেই কথা নেই

পকেটের টাকা নেই।

চাল চুলো জামা জুতো

কিছুতেই কিছু নেই

একা একা মন কাঁদে

ভালোবাসা তুমি নেই ।

qqqqq

বসন্ত এখানে বেমানান

এম.এ.রউফ নবাব

হরেক রঙ্গে রঙ্গীন বিলাসী বসন্ত

এ বাংলায় যেন হসন হসন্ত

বহে দুঃখ গ্লানির ভার

মানুষ যেখানে থাকে জীর্ণ বসনে

অর্ধ উলঙ্গ হাড্ডিসার!

ক্ষুধার আগুনে যেখানে ঝলসে

যৌবন করে হাহাকার

বসন্ত! এখানে ঝলসে যাওয়া রুটি

অমানবিক পরিবেশে জীবন যেখানে ক্ষতবিক্ষত

জীবন বাঁচার তাগিদে দেয় হুংকার।

বসন্ত! প্রকৃতির ফাল্গুন

হরেক রঙ্গের মেলা রঙ্গের বিস্ফোরণ

বসন্তের সুগন্ধি রঙ্গীন পশরা আনন্দ মেলা

বঞ্চিতের কাছে আনন্দের প্রবঞ্চনা, নিদারুণ জ্বালাময় খেলা।

বসন্ত! সে তো প্রেমের সারথি

এ বাংলায় এখন উপভোগ করে মীরজাফর ঘসেটি

বসন্ত ! জীবন প্রেমের আমোদ আহ্লাদে পরিপূর্ণ

সে আমোদে এখানে সুযোগ সন্ধ্যানীর জন্য।

যারা আত্মমর্যাদাকে বুঝে না

মানে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

বিভেদ সংঘাতের রাজনীতির ফলে

মানুষ জীবনে বাঁচার জন্য সংগ্রাম যেখানে অফুরান

এমনি ক্ষনে বসন্তের রঙ্গীন পুষ্পাঞ্জলি সেখানে বেমানান।

Probondho-nibondho-1

মানবদেহের অদ্ভুত কিছু তথ্য

রিয়াজ আহমেদ

 

*বৃদ্ধি ও পরিস্ফুরনের সময় মানবদেহে প্রতি মিনিটে ৩০০মিলিয়ন নতুন কোশ উৎপন্ন হয়।

*একজন মানুষের রক্তের পরিমাণ তার মোট ওজনের ১৩ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ ৬৫ কেজি ওজন মানুষের রক্তের পরিমাণ হল ৫ কেজি।

*মানুষের ডি.এন.এ.(DNA)এর মোট দৈর্ঘ্য পৃথিবী থেকে সূর্যে ৭০বার যাতায়াতের সমান।

*মানুষের আঙ্গুলের ছাপ মস্তিস্কের থেকেও বেশী তথ্য বহন করে।

*পেশি কোশ ও স্নায়ু কোশ বিভাজিত হয় না।

*সদ্য জন্ম নেয়া শিশু কাঁদলে চোখে পানি দেখা যায়না। এর কারণ জন্মের পর শিশুর ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ বয়স হলেই কেবল চোখের পানি সৃষ্টি হয়।

*মানুষের শরীরে যে পরিমাণ ফসফরাস আছে তা দিয়ে ২২০০ দিয়াশলাই জ্বালানো যাবে ।

*দেহের সব শিরাকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর জমির প্রয়োজন হবে।

*একজন মানুষের স্নায়ুতন্ত্র এত লম্বা যে তা দিয়ে পৃথিবীকে ৭ বার পেঁচানো যাবে।

*কোন অনুভূতি স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে ঘন্টায় ২০০ মাইল বেগে প্রবাহিত হয়।

* মানবদেহের সবচাইতে শক্তিশালী মাংসপেশি হলো জিহবা |

*একজন মানুষ অক্সিজেন ছাড়া সর্বোচ্চ ৩ মিনিট বাঁচতে পারে, খাবার পানি ছাড়া বাঁচতে পারে ৭ দিন।

*চোখ খোলা রেখে কখনো হাঁচি দেওয়া যায় না।হাঁচির গতি ঘণ্টায় ১০০ মাইল।

*মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ৩ পাউন্ড৷

*সাধারনত পুরুষের তুলনায় নারীর মস্তিষ্ক প্রায় ১৫০ ঘন সেঃ মিঃ কম বা ছোট হয়।

*মানুষের নখ বৃদ্ধির মধ্যে মধ্যমার নখ সবথেকে দ্রুত বাড়ে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ সবথেকে কম বাড়ে।

*একজন পরিণত মানুষের দেহে কোশের সংখ্যা প্রায় ৭৫ ট্রিলিয়ন।

Minigolpo-1

একটি মৃত্যু ও মধ্যরাতের আতঙ্ক

রবিন মিলফোর্ড

জানালাটা আবার ভয়ানক শব্দ করে লেগে গেল । কেঁপে উঠল ফারিন । বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি , ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এমন অবস্থা । বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে তার শরীরে । উদ্বিগ্নমুখে তার দাদীর বিছানায় বসে আছে সে । যন্ত্রনায় ছটফট করছেন তার দাদী । বারবার রুক্ষ কন্ঠে বলছেন আমার সময় শেষ আমি মারা যাব এখনি ।
এসব কি বলছ দাদী ? ভয়ে আর আতঙ্কে কেঁপে উঠল ফারিন ।
হুম, গত জৈষ্ঠ্য মাসে এরকম বাদলা দিনে তোর দাদুও মারা গেছিলেন , তোর দাদুকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে । আমার ছোট মেয়ে লায়লা ও আসছে রে ঐ দেখ , আহা মেয়েটা আমার কত্ত ছোট থাকতে সাপের কামড়ে মারা গেছিল , কতদিন পর তাকে দেখলাম । কেমন যেন অপার্থিব শোনাল তার দাদীর কন্ঠ ।
দাদীর উন্মাদ কথাবার্তায় ফ্যাকাসে হয়ে গেল ওর মুখ । ভয়ে আত্মরাত্মা কেঁপে উঠছে তার । বাড়িতে এইমুহূর্তে সে আর তার দাদী ছাড়া আর কেউ নেই । তার মা , বাবা আর ছোট ভাই গেছেন তাদের এক আত্মীয়ের বিয়েতে ।কাল সকালে আসবেন তারা । সেও যেত কিন্তু এস.এস.সি এর টেস্ট পরীক্ষা থাকার কারনে যেতে পারেনি , দাদীর সাথে বাসায় থেকে যায় । বাসায় কোন টেলিফোন ও নেই যে কাউকে ফোন করবে । তার উপর রাত বাজে এখন দুইটা । আশেপাশের কাউকে যে ডাকবে সে উপায়ও নেই । ছোট্ট একটা মফস্বল শহরে বাউন্ডারি দেওয়া দুতলা বাড়ি তাদের । একেবারে আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই । একেবারে কাছের বাড়িও পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব । এতরাতে এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ওখানে যাওয়া অসম্ভব । এরকম কোন পরিস্থিতে পড়তে পারে কল্পনাও করেনি ফারিন । মনে প্রানে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে সে ।

কাছে কোথাও তীক্ষ্ন শব্দে বাজ পড়ল । আবারও কেঁপে উঠল ফারিন । একটা মানুষ চোখের সামনে মারা যাচ্ছে এতরাতে আর ঘরে সে একা , এটা ভাবতেই অদ্ভূত ভয়ের শীহরন বয়ে গেল তার সারা শরীরে ।
হঠাৎ করেই আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিক , সেই সাথে আবার কাছে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ । ধ্যাৎ , বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আর সময় পেল না । আতংকে জমে গেল ফারিন ।
ফারিন আমি মরে গেলে ভয় পাসনে , কাঁপা গলার আওয়াজ কানে আসল তার । তুই বাচ্চা একটা মেয়ে একা একা এই পরিস্থিতে ফেলে যাচ্ছি তোকে , আমার মৃত্যুর পর ভুলেও বাইরে বের হোসনে সকাল হওয়ার আগে । আমার মৃতদেহের পাশে বসে থাকিস সারারাত , খবরদার বাইরে বের হোসনে ।
দাদী এসব কি বলছ তুমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ফারিন । ভয় আর আতংক তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে । অন্ধকারের মধ্যে অস্ফূষ্ট একটা গোঙ্গানী শুনতে পেল ফারিন । তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন যেন নিথর-নিস্তব্দ হয়ে গেল । আশ্চর্যরকম সুনসান নীরবতা । তার দাদীর আর কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না , তাহলে কি মারা গেছেন উনি ?
হঠাৎ করেই পরিবেশটা কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করল , বাইরে থেকে চাঁপা কান্নার আওয়াজ আসছে । দরজায় কে যেন আলতোভাবে ধাক্কাচ্ছে । চারদিকে চাপাকান্না আর অদ্ভূত ফিসফিসানির মন খারাপ করা শব্দ । কি করবে বুঝতে পারছে না ফারিন । একটা মৃত মানুষের পাশে খালি বাড়িতে একা বসে আছে এটা ভাবতেই ওর হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জোগাড় হল , হাত পা কাঁপছে ওর , ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না ।বাড়িতে কেমন যেন অদ্ভূত সাড়াশব্দ শুরু হয়েছে অনুভব করতে পারল সে । কোনমতে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে রান্নাঘরে চলে গেল সে । গ্যাসে নিভু নিভু আগুন জলছে ঐখান থেকে একটা মোম জালিয়ে আবার ফিরে এল দাদীর ঘরে । না এলেই বোধহয় ভাল করত ও , এরকম ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে হত না । নিথর হয়ে পড়ে আছে তার দাদী, নিস্প্রান চোখদুটি , হা করা মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে । অসম্ভব ভয়ংকর লাগছে তাকে । আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসল ফারিন এর বুক চিড়ে , ছুটে বেড়িয়ে আসল ঘর থেকে । কিছু না ভেবেই ছুটে চলল সদরদরজার দিকে । বাইরে বৃষ্টির বেগ কমলেও পুরোপুরি থেমে যায়নি , কেমন যেন গুমোট ভারী পরিবেশ । সদরদরজা খুলতেই চাপাকান্নার আওয়াজ স্পষ্ট হল ফারিন এর কানে । বামদিকে চেয়ে দেখল জামতলার নিচে দাঁড়িয়ে একটা ছোট মেয়ে কাঁদছে , বিদ্যুৎচমকের আলোয় চেহারা দেখে পুরো জমে গেল সে , স্পষ্ট চিনতে পারল মেয়েটা আর কেউ নয় ছোটবেলায় সাপেড় কামড়ে মারা যাওয়া তার দাদীর ছোট মেয়ে , ছবিতে সে দেখেছে ।
হঠাৎ তার সামনে একটা আবছা ছায়া স্পষ্ট হতে লাগল – ঠকঠক পায়ের শব্দ শুনে সামনে তাকাল সে ,গতবছর মারা যাওয়া তার দাদু তার দিকেই এগিয়ে আসছেন । আতংকে হিতাহিত গেয়ান লোপ পেতে শুরু করল ফারিন এর । দৌড়ে আবার ঘরে ঢুকে গেল সে , দরজা লাগানোর কথাও ভুলে গেল ।

কি করবে বুঝতে পারছে না সে , শরীর পুরোপুরি অবশ হয়ে যাচ্ছে তার । বাড়িময় ছড়িয়ে পড়েছে মৃত্যুর গন্ধ । চাপা কান্নার আওয়াজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে । কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে ফারিন , মা-বাবার স্নেহময় মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে । কোনমতে টলমল পায়ে তার ঘরে ছুটে আসল সে । দাদীর ঘর থেকে কিরকম অদ্ভূত সুর শোনা যাচ্ছে । ভয়ানক মন খারাপ করা সেইসুর মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয় । তার সমস্ত সত্বা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে ,দূরে বহুদূর থেকে কে যেন ডাকছে তাকে – সেই ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ফারিন এর নেই । টলমল পায়ে সেই ডাকের উৎসের সন্ধানে এগিয়ে যাচ্ছে ফারিন , নিজেকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করছে, থেমে যেতে চাইছে সে কিন্তু পারছে না । কোন ভয়ংকর শক্তি টেনে নিয়ে যাচ্ছে থাকে । ঘর থেকে বের হয়ে গেল ফারিন , থেমে যেতে চাইছে সে জানে বেরুলেই আর বাঁচবে না সে – কিন্তু থামতে পারছে না সে , হেঁটে চলেছে ঘোরের মধ্যে হয়ত নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে । জামতলার কাছে আসতেই আবার কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে , একজন দুজন না শতশত মেয়ে করুন সুরে কাঁদছে , তীক্ষন আর্তনাদ করে উঠছে ক্ষনে ক্ষনেই । বিচিত্র সুরে কি যেন বলছে তারা । ভয় পাবার অনুভূতিও হারিয়েছে ফারিন । সে শুধু হেঁটে চলছে ঘোরের মধ্যে ।
ছোট ডোবার পাশে আসতেই তার দাদীকে দেখতে পেল সে , মুখ নিচু করে বসে আছে ।
কিছুক্ষন পর সে আবিষ্কার করল যে একটা দলের সাথে সে হাঁটছে । তারা কি যেন বহন করছে , সবাই নীরব কেউ কোন কথা বলছে না । দলের কয়েকজনকে চিনতে পারল সে তার মৃত কিছু আত্মীয় । ফারিন বুঝতে পারল যে একটা শবয়াত্রার সাথে যাচ্ছে সে , শান্তপায়ে ধীরলয়ে । শবযাত্রার সামনে তার দাদীকে দেখতে পেল সে । শবযাত্রার পেছনে ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে অদ্ভূত সুরে চেঁচিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে , ফারিন তাদেরকে চিনতে পারছে না । বৃষ্টির টপটপ ফোঁটা পড়ছে তার শরীরে কিন্তু সে এসব গ্রাহ্য করছে না , কোন কিছুই গ্রাহ্য করছে না সে । সে শুধু হাঁটছে , ধীর মন্থর গতির এ হাঁটার যেন কোন শেষ নেই । তার মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে হাঁটছে সে । অবশেষে তাদের বাড়ির গেট দৃশ্যমান হল তার সামনে । শবয়াত্রা থেমে গেছে এখানে , বহুদূর থেকে কে যেন ডাকছে তাকে , চলে আয় ফারিন , চলে আয় , চলে আয় । ফারিনের মনে হচ্ছে এই চলে যাওয়াতেই সব শান্তি , সবসুখ – কিন্তু কে যেন তার ভিতর থেকে বারবার বলছে না ফারিন সামলে নে নিজেকে শুনিস না ওর কথা । কিন্তু বহুদূরের অন্ধকার জগত থেকে আসা শীতল গলার আওয়াজ অগ্রাহ্য করতে পারছে না ফারিন , শীতল ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে ক্রমেই এগিয়ে চলল সে , যেতে লাগল ভয়ংকর কিছুর দিকে । দূরে কোথাও আযানের শব্দ অস্পষ্টভাবে বেজে উঠল ফারিনের কানে , ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল সে , গেয়ান হারাল ।

ভয়ানক হুলস্থুল আর ফোঁপানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল ফারিনের কানে । সে কি মারা গেছে ? মাথাটা কেমন যেন টনটনে ব্যাথা করছে । ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে , দেখল তার মা তার উপর ঝুঁকে ফোঁপাচ্ছেন , তাকে ঘিরে অনেক ভীড় । তাদের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে সে । মাথার পাশে ডাক্তার বসা । তাকে চোখ খুলতে দেখেই কেঁদে উঠলেন তার মা , কি হয়েছিল ফারিন সোনা , তুমি ঠিক আছ তো । সকালে এসে দেখি তুমি গেটের সামনে পড়ে আছ । ধীরে ধীরে উঠে বসল ফারিন । স্বস্তি ফিরে এল তার মনে ,যাক তাহলে বেঁচে গেছে সে ।
দাদী কোথায় ? কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ফারিন ?
উনাকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে , কেঁদে উঠলেন ফারিন এর মা ।এরকম জানলে কখনো যেতাম না বিয়েতে ।কি সর্বনাশ হয়ে গেল ।
রাতে খুব ভয় পেয়িছিলি মা , মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি – এখনো কাঁপছেন স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ।
রাতের কথা মনে করতেই কেমন যেন লাগতে শুরু করল ফারিন এর , ফ্যাকাসে হয়ে গেল ওর মুখ । ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শরীরে ।
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ফারিনের মা ।

ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম-একাদশ সংখ্যা।। নভেম্বর-ডিসেম্বর/২০১২ ঈসাব্দ


Word Converter-1download

ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত।

লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ
krondosee@yahoo.com

Word Converter-1

বিজয়ের মাস এবং হিংস্রতা!

বিজয়দিবস ১৬ ডিসেম্বর আমাদের অহঙ্কার!

কিন্তু এই অহঙ্কারের আনন্দে আমরা কি পেরেছি

আমাদের দেশকে উন্নত, সভ্য ও শান্তির দেশে পরিনত করতে?

আমরা বিনাদোষে অন্যকে নির্মমভাবে হত্যা করি রাজনীতির নামে।

অন্যের দোষে নিরাপরাধ গাড়িও ভাংচূর করে  দিই বইয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডব ,

হেসেখেলে নিরীহ লোকদেরও মারি পুড়িয়ে !!

বিজয়ের মাসেও বিতাড়িত পশ্চিমাদের মতো ‘৭১ এর হিংস্রতায়

জ্বালাও-পোড়াও করে দেশকে শুধু পেছনেই নিয়ে যাচ্ছি।

কিন্তু কেনো, কারো কি জানা আছে এর উত্তর!!

বেগম রোকেয়া

আমাদের গর্ব নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মমৃত্যু দিবস হচ্ছে ০৯ ডিসেম্বর। তিনি কি তথাকথিত নারীবাদী ছিলেন যে, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে বেপর্দা হয়ে তসলিমা নাসরীনদের মতো পুরুষবিদ্বেষী নারী আন্দোলন করেছিলেন?  নাহ, তৎকালীন সমাজের লোকজন যে কারণেই হোক, ইসলামধর্মের দোহাই দিয়ে ইসলামের দেয়া অধিকার বিশেষত শিক্ষাসহ  বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন নারীদের, তিনি কেবল তাদেরই বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নারীদের প্রকৃত উন্নয়নের ধারা বইয়ে দিয়েছিলেন মাত্র। তিনি ইসলামের বিধানানুযায়ীই সহশিক্ষার বদলে মাত্র ০৫ জন ছাত্রী নিয়ে আলাদা  বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিজেও কখনও পর্দা বর্জন করেননি! এ বিষয়টা অনেকেই বেমালুম ভুলে এমন প্রচারণা চালান যে, তিনিও যেন  পুরুষবিদ্বেষী নারী ছিলেন। যাহোক, তার উদ্দেশ্যে একটি প্রবন্ধ থাকলো এ বিশেষ সংখ্যায়।

Vindeshee lekha vinvashee lekha-1

নোবেলজয়ী মো ইয়ানের সাক্ষাৎকার

অনুবাদ: বিদ্যুত খোশনবীশ

‘সীমাবদ্ধতা সাহিত্যের জন্য সহায়ক’–মো ইয়ান
২০১২ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী চীনা লেখক মো ইয়ান এর জন্ম শানডং প্রদেশের গাওমি শহরে, ১৯৫৫ সালে। গুয়ান মোয়ে কেন মো ইয়ান (কথা বলো না) হলেন তা ইতোমধ্যেই বিশ্বসাহিত্যের পাঠক মাত্রেই জেনে গেছেন। কিন্তু ‘কথা বলো না’ নাম নিয়েও মো ইয়ান তার গল্প-উপন্যাসে নির্দ্বিধায় বলে গেছেন চীনের রাজনৈতিক ও যৌনজীবনের অজানা কথা, তবে কখনো কল্পনা আবার কখনো রূপকথা’র আশ্রয়ে। তাই নোবেল কমিটি তাকে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছে: তার অলীক বাস্তবতা একিভূত করেছে রূপকথা, লোকগাঁথা, ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাকে।
এ বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে লন্ডন বই মেলায় চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল অনূদিত লেখক মো ইয়ান এর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বিখ্যাত ম্যাগাজিন গ্রানটা’র সম্পাদক জন ফ্রিম্যান। এই সাক্ষাৎকারে মো ইয়ান কথা বলেছেন তার উপন্যাসের নারী চরিত্র, আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার এবং তার সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে। এখানে মো ইয়ানের সেই অডিও সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ তুলে ধরা হলো।জন ফ্রিম্যান: আপনার বেশ কয়েকটি উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ আপনার জন্ম-শহর গাওমীর দৃশ্যপটে আবর্তিত হয়েছে। অবশ্য উপন্যাসে আপনি কল্পনারও মিশেল ঘটিয়েছেন, যেমনটা ফকনার দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষেত্রে করেছিলেন। ঠিক কী কারণে আপনাকে এই অর্ধ-কল্পিত সমাজে ফিরে যেতে হয়েছিল আর সারা বিশ্বব্যাপী পাঠক সৃষ্টি হবার ফলে আপনার লেখায় দৃশ্যপটের কোন পরিবর্তন হবে কি?
মো ইয়ান: প্রথম যখন আমি লিখতে শুরু করি তখন আমি ঐ পরিবেশেই বেড়ে উঠছিলাম আর তাই সে সময়ের গল্পগুলো পুরোপুরি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। কিন্তু আমার লেখার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি কল্পনার আশ্রয় নেই। কখনো কখনো সে কল্পনা ছিল বেশ উদ্ভট, যাকে আপনি ফ্যান্টাসী বলতে পারেন।
জন ফ্রিম্যান: আপনার অনেক লেখাই গুন্টার গ্রাস, উইলিয়াম ফকনার আর মার্কেজের কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনি যখন পাঠক ছিলেন কিংবা যখন লিখতে শুরু করেন তখন চীনে কি তাদের বই পাওয়া যেত? মানে, লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনি কাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন?
মো ইয়ান: আমার লেখালেখির শুরু ১৯৮১ সাল থেকে। সুতরাং তখন মার্কেজ কিংবা ফকনারের বই আমি পড়িনি। আমি তাদের বই পড়ি ১৯৮৪ সালের দিকে এবং বলতে দ্বিধা নেই আমার সৃষ্টিশীলতায় তাদের দুজনেরই দারুণ প্রভাব রয়েছে। আমি লক্ষ্য করেছি, আমার ও তাদের জীবন অভিজ্ঞতার মধ্যে একটা মিল রয়েছে, তবে এই আমার উপলব্ধিটা অনেক পরে হয়েছে। তাদের লেখার সাথে আরো আগে যদি আমার পরিচয় ঘটতো তাহলে আমিও তাদের মতই বড় একটা কিছু সৃষ্টি করতে পারতাম।
জন ফ্রিম্যান: ‘রেড সরগাম’ এর মত আপনার শুরুর দিককার উপন্যাসগুলো ইতিহাস নির্ভর কিংবা অনেকের মতে রোমান্টিক। কিন্তু আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাসগুলো সমসাময়িক বিষয় ও ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে। আপনি কি সচেতনভাবেই এই পরিবর্তনটা করেছেন?
মো ইয়ান: আমি যখন ‘রেড সরগাম’ লিখি তখন আমার বয়স ত্রিশ এরও কম, অর্থাৎ আমি তখন বেশ তরুণ। সে সময় আমার জীবন ছিল রোমান্টিকতায় পরিপূর্ণ আর আমি আমার পূর্বপুরুষদের নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করতাম। আমি তাদের জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করি যদিও পূর্বপুরষদের সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা ছিল না। এই অভাববোধ থেকেই আমি আমার চরিত্রগুলোর মধ্যে কল্পনার মিশেল ঘটাই। কিন্তু যখন ‘লাইফ অ্যান্ড ডেথ আর ওয়ারিং মি আউট’ উপন্যাসটি লিখি তখন আমার বয়স চল্লিশ অতিক্রম করেছে, অর্থাৎ আমি মধ্যবয়সী একজন পুরুষ। আমার জীবন তখন অনেকটাই বদলে গেছে। আমি তখন আগের চেয়েও সচেতন ও সমসাময়িক চিন্তার অধিকারী। ফলে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা আমার আগের রোমান্টিকতাকে যথেষ্ট সঙ্কুচিত করে দিয়েছিল।
জন ফ্রিম্যান: আপনার লেখার মধ্যে প্রায়ই লাওবাইশিং অঞ্চলের ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, বিশেষকরে শানডং উপভাষার ব্যবহার প্রচুর। এ ধরণের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ফলে পাঠকের হৃদয়ে আপনার গদ্য খুব একটা আবেগ সৃষ্টি করতে পারেনি। এ ধরণের জটিল আঞ্চলিক প্রবাদ-প্রবচনের ইংরেজি রূপান্তরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়, এ সমস্যাটা কি আপনাকে হতাশ করেছে? নাকি আপনি আপনার অনুবাদক হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট এর সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে এর সমাধান করেছেন?
মো ইয়ান: হ্যাঁ, এটা সত্য। শুরুর দিকে আমি প্রচুর আঞ্চলিক শব্দ ও প্রবাদ-প্রবচন আমার লেখার মধ্যে ব্যবহার করেছি। এর কারণও আছে। সে সময় আমি তো বটেই এমনকি চীনও খুব একটা অগ্রসর রাষ্ট্র ছিল না। তাছাড়া আমার কখনোই মনে হয়নি যে আমার লেখাগুলো অন্য কোন ভাষায় অনূদিত হবে। অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছি, এ ধরণের আঞ্চলিক শব্দ অনুবাদকদের যথেষ্ট ভোগান্তির মধ্যে ফেলে। তবে শব্দগুলো এড়িয়ে যাবারও কোন উপায় ছিল না। কারণ বিশেষ কিছু আঞ্চলিক শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন ভাষাকে আরো প্রাণবন্ত ও আবেদনময়ী করে তোলে। তাছাড়া এগুলোকে আমি একজন লেখকের নিজস্ব ভাষাশৈলীর মৌলিক উপদান হিসেবেই বিবেচনা করি। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমি কিছু কিছু শব্দ ও প্রবচনকে মরিমার্জন করতে পারবো তেমনি আমি এটাও আশা করি যে শব্দগুলো দিয়ে আমি ঠিক যা বুঝাতে চেয়েছি অনুবাদকরা অনুবাদের সময় ঠিক তারই প্রতিধ্বনি করবেন। আমার মতে এটাই উৎকৃষ্ট সমাধান।
জন ফ্রিম্যান: ‘বিগ ব্রেস্ট অ্যান্ড ওয়াইড হিপস’, ‘ডেথ আর ওয়েরিং মি আওট’ ও ফ্রগ সহ আরো অনেক উপন্যাসের কেন্দ্র বিন্দুতে নারী চরিত্রের উপস্থিতি ও ভূমিকা বেশ জোড়ালো। আপনি কি নিজেকে একজন নারীবাদী লেখক মনে করেন নাকি শুধু চরিত্রের স্বার্থেই নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখেছেন?
মো ইয়ান: প্রথমত, আমি নারীদের প্রসংশা করি এবং তাদের সম্মানও করি। আমি মনে করি তারা মহীয়সী। নারীদের জীবন অভিজ্ঞতা এবং সহনশীলতা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। যে কোন দুর্যোগে পুরুষের চেয়ে নারীরাই সাহসীকতার প্রমাণ রাখে বেশি। আমি এভাবেই দেখি, কারণ নারীদের সেই সামর্থ আছে এবং তারা মা। এমন এক শক্তিবলে তারা এই যোগ্যতা অর্জন করেছে যা চিন্তা করাও কষ্টসাধ্য। আমার বইয়ে আমি নিজেকে নারীর অবস্থানে দাঁড় করাই এবং সে অবস্থান থেকেই আমি তাদের জগৎকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কিন্তু শেষ কথা হলো, আমি একজন পুরুষ লেখক, নারী লেখক নই। তাই নারীর অবস্থান থেকে লিখলেও নারীরা আমার লেখাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ নাও করতে পারে। তবে এটাই সব কথা নয়। আমি নারীদের ভালবাসি এবং তাদের প্রসংশা করি। কিন্তু তা সত্বেও, আমি জানি, তারা আমাকে একজন পুরুষ লেখক হিসেবেই বিবেচনা করবে।
জন ফ্রিম্যান: সেন্সরশিপ এড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টা থেকেই কি একজন সাহিত্যিক সূক্ষ্মদর্শী হয়ে উঠেন? তাছাড়া জাদুবাস্তবতা একজন লেখকের চিন্তা প্রকাশের পথকে কতটুকু প্রশস্থ করতে পারে? নাকি চরিত্র নির্মাণের চিরাচরিত পদ্ধতিই বেশি কার্যকর? অর্থাৎ কোন প্রক্রিয়াতে শাসকের সাথে বিবাদে না জড়িয়েই একজন লেখক তার গভীর চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারেন?
মো ইয়ান: হ্যাঁ, তাই। অনেক দিক থেকেই সাহিত্যের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক আছে। যেমন ধরুণ, আমাদের বাস্তব জীবনের অনেক সংবেদনশীল কিংবা রূঢ় বিষয়কে অনেক লেখকই সরাসরি স্পর্শ করতে চান না। এ অবস্থায় একজন লেখক তার কল্পনা শক্তিকে প্রয়োগ করে নিজেকে সেই বাস্তবতা থেকে আলাদা করে নিতে পারেন কিংবা চাইলে পুরো বিষয়টাকে তারা আরো জোড়ালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। এর ফলে তাদের সৃষ্টিকর্ম সাহসী, প্রাণবন্ত ও বাস্তবতার উৎকৃষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে। তাই আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, সীমাবদ্ধতা কিংবা সেন্সরশিপ সাহিত্যের জন্য সহায়ক।
জন ফ্রিম্যান: ইংরেজিতে অনূদিত আপনার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘ডেমোক্রেসি’তে আপনি চীনের অভ্যন্তরে একটি যুগের সমাপ্তির কথা বর্ণনা করেছেন। একজন কিশোর এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ক চীনা নাগরিকের অভিজ্ঞতা থেকে আপনি যে কথাগুলো বলেছেন তার মধ্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। আর পশ্চিমারা যা বলছে তা আরো বিস্ময়কর। তারা অগ্রগতি বলতে সবসময়ই কল্যানকেই বুঝেন কিন্তু আপনার স্মৃতিকথায় কিছু একটা হারিয়ে যাবার ইঙ্গিত রয়েছে। এই মূল্যায়নটা কি সঠিক?
মো ইয়ান: হ্যাঁ, আমার ঐ স্মৃতিকথা আমার জীবন ও অভিজ্ঞতার বর্ণনায় পরিপূর্ণ তবে কিছু কল্পিত বিষয়ও আছে। আর যে হতাশার কথা বলছেন তাও সত্য। কারণ বইটিতে একজন মধ্যবয়সী মানুষ তার যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে তাকিয়েছে। ধরুণ, যৌবনে আপনি একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন কিন্তু যে কোন কারণেই হোক সে এখন অন্যকারো স্ত্রী। এই স্মৃতি অবশ্যই বেদনাদায়ক। গত ত্রিশ বছরে আমরা চীনে নাটকীয় উন্নতি দেখেছি। এ উন্নতিটা হয়েছে চীনাদের জীবনযাত্রার মান কিংবা বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে। এ উন্নতি দৃশ্যমান। কিন্তু নিঃসন্দেহে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক ব্যপারেই সন্তুষ্ট নই। প্রকৃতঅর্থেই চীনের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু উন্নতি কখনো একা আসে না। ফলে চীনের উন্নতির সাথে সাথে কিছু সমস্যারও আবির্ভাব ঘটেছে। যেমন ধরুণ, পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় এবং নৈতিকতার অবক্ষয়। তাই আপনি যে হতাশার কথা বলছেন তার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে: প্রথমত আমি উপলব্ধি করছি যে আমার যৌবনকাল শেষ হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয়ত চীনের বর্তমান বাস্তবতায় আমি উদ্বিগ্ন, বিশেষকরে সেই বিষয়গুলো নিয়ে যা আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
জন ফ্রিম্যান: এরপর আপনার কোন বইটি ইংরেজিতে অনূদিত হবে?
মো ইয়ান: স্যান্ডালউড প্যানাল্টি।
cropped-gggg.jpg

সুগন্ধীটির নাম ছিল কেলি

মুললেখকঃ সান ড্যান্স

ooo

সুগন্ধীটির নাম ছিল কেলি
দামী ব্র্যান্ড সন্দেহ নেই
আমি পেতাম,কেলির গন্ধ
আর বুক ভরে টেনে নিতাম
তোমার শরীরের সবখান থেকে
কেলির মাদকময় সুবাস!!!

আমি পাগল হয়ে যেতাম
তোমাকে হাতড়ে হাতড়ে
দুর্ভিক্ষে পীড়িত মানুষ
আমি সেই গন্ধ নিতাম
তুমি বাধা দিতে
কস্টে চিতকার করতে,
আচড়ে কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করতে

তবু
আমি গন্ধ নিতাম,
এ যেন এক নতুন নেশা,
অপ্রচলিত,কিন্তু ধ্বংসাত্বক,তবু
আমার ভাল লাগতো,জিভ দিয়ে
সুবাস টির স্বাদ নেয়ার চেস্টা করতাম
বলতে-আমি নোংরামো করছি
হলামই নাহয় তাই-

স্বাদ-গন্ধ নিতে সেই তুমি ই তো
হাতেখড়ি দিয়েছিলে আমায়,তারপর
হারিয়ে গেছে,নাম না জানা
হাজারো সুগন্ধীর ভীড়ে,তবু-
বাতাসে আমি এখনও খুজি
রক্তে বান ডাকানো সেই
নেশাতুর সুগন্ধ!!

ঠিক এখনো কি সেই সুবাস
ব্যবহার করছ তুমি?
নাকি আমার মত,ফুরিয়ে গেছে
প্রয়োজনের সাথে সাথে?

Chhora-kobita

images

সকাল রয়ের কবিতা

সেবার রঞ্জুর কেক কাটার দির ওদের খিচুরী খাইয়েছিল। মশলা আর স্বাদ লেগে

আছে এখনও । আরও কত কি ভাবতে গেল ঘরওয়ালী হঠাৎ গুলির শব্দ !! পটকা ফুটলো

কি নুপুরদের বাড়ি !! উঠে বসবার আগেই উড়ন্ত বারুদ আচমকা দরজা ঠেলে আগুন

নিয়ে এলো।

আর্তচিৎকার- মাইরা ফেললো রে.. রমিজার ঘরে আগুন লাগসে রে…… আমার

মাইয়ারে নিয়া গেল কুত্তার বাচ্চারা; তোরা ওরে ধর

সংলাপে সংলাপে বারুদ গন্ধে আর আগুন শিখায় ভরে আসছে সব। বস্তির মানুষ

স্বপ্ন বুনতে বুনতে মৃতু্যকে ডেকে নিচ্ছে; বর্বর ভাবে বন্দুকের আঘাতে জান

পাখি উড়ে যাচ্ছে। মানুষ আজ খাচার পাখি।

হায়েনার দল সারি বেঁেধ পুরো শহরময় মানুষ মেরে বেড়াচ্ছে; মানুষ কিভাবে

মানুষ মেরে ফেলে সেটাই ভাবা দ্বায়। জগন্নাথ হলের চারপাশে গুলির আওয়াজে

সব ধোয়াময় ঘুমিয়ে থাকা প্রাণ গুলো হতবাক না হয়ে পারেনি এতোটা কঠিন

হবে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি।

qqqqq

সজ্জা

গোলাম কিবরিয়া পিনু

rubberwood_wood_bed_pictures_D_401.jpg_250x250

জেগে উঠবার জন্য বাদ্য বাজানোর দরকার নেই

সমুদ্রের ঢেউ ভেতরে রেখেছি

ঘাঘট নদীটা তা জানবে না, এই নদী মরে গেছে!

 

অগ্নিকুন্ড নিয়ে সজ্জিত হবার জন্য

রং রাঙানোর প্রয়োজন নেই

পদছাপ দিয়ে তৈরি হবে চিহ্ন।

 

রূপান্তরের জন্য নিরাপদ স্থান নেই

এখানে বনজঙ্গল পিটিয়ে শুধু বন্যজন্তু নয়

নিরীহ মানুষও ধরা হয়।

 

ভীষণ কষ্টে পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ

অতিক্রম করবার জন্য

চরণের স্পর্ধা ও ভরসা নিয়ে আছি।

 

কীভাবে সজ্জিত হতে হবে

উজ্জ্বল ও ঝকমকে হবার জন্য, তা জানি।

clara_schuman-2012-sr

নদী-পাহাড়-আমি

খোশনূর

এদিকে নদী ওদিকে পাহাড়

বসলাম নদীর তীরে গাছের ছায়ায়

পাখির কলরবে বিকাশ আনন্দের

ছায়াচ্ছন্ন আমার স্তব্ধতা এখানে

পরিণত কাব্য ; বিচিত্র ভঙ্গিতে এক ঢেউ

অন্য ঢেউকে ছুঁয়ে যায় চলার রূপরেখায়

কালের জলছবি সত্মরে সত্মরে যেনো

আদি অন্তের ইতিবৃত্ত খুঁজতে ছেয়েছি

নদী গল্প করবে মনে হলো

নদীর গান শোনা হবে

জানি না কখন কবে নদীর সময় হবে

পাহাড় সবুজ অরণ্য বুকে ডাকলো মনে হলো

কাছে যেতেই রুমঝুম ঝংকার শুনলাম

দেখি ঝকমকে ঝর্ণা চঞ্চল

বালিকা হয়ে নেচে নেচে ছুটছে

পিছু না দেখেই;

মধুর যৌবনে মোহিনী

ঊষসী অতন্দ্র প্রজ্ঞাদীপ্ত ঝংকৃত লয়ে

সত্মব্ধ পাহাড়, গেরুয়া পথ জানা-অজানা

বৃক্ষলতা রকমারী ফুল হাওয়ার দোলা

ভাবনার সাঁকোতে আলোর আখর

ঘনশিখরে নিঃসঙ্গের প্রহরী অনমত্ম

প্রপাত দেখে শৌখিন অমনোযোগে

শিল্পের বিলাসী উপকরণ কুড়িয়ে নিলাম

এখন নদী, পাহাড় আর আমি

ক্রমাগত একাকার হবো।

 download (3)

অধঃপতন

নিয়াজ মোর্শেদ

download (4)

একা একা নিজেকে গুড়িয়ে দেই

মগ্ন হই

আলোহীন তারাদের সাথে স্বচ্ছ, অনিকেত প্রার্থনায়

দু-হাতে রুদ্ধ করে মনের গতি

সকল সৌন্দর্য ভুলে

সদ্য চক্ষু ফোটা নয়া ইন্দ্রিয় পা ফ্যালে নিগূঢ় বাস্তবে

তবু বিরুদ্ধ বাতাস উড়িয়ে নেয় আমাকেই

সব কৌশল উল্টে দিয়ে

শঙ্কাহীন সুতাকাটা ঘুড়ির মতন।

download (2)

ঘননীল-মৃত্যু

মেহেদী হাসান

শয়তানের মদ্য মুঠো মুঠো পান করে ভবছো-

নদীর কোমল গন্ধ মাখবে দূষিত বগলে!

যে  ক্ষয়িষ্ণু সূর্য জ্বলে আজ ধূসর আকাশে,

তা থেকে  বিচ্ছিন্ন হয়ে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার।

সাতটি আকাশকে অনেক দূর টেনে জলে নামিয়ে

ডোবাতে চেয়েছিলে জানি বুকের এক খন্ড শ্যামলা জমি ।

অনেক কুকুর মরে গিয়ে আজও

মাছি হয়ে তোমার দগদগে ঘা চাটে ভরন্ত উল্লাসে।

 images (3)

 খোলা বাজারে আলু, পেয়াজ, করল্লার নিষ্পেষণ-

সুদৃশ্য আদরে নারী ধর্ষিত হয়ে হয়ে

পুলকিত সিগারেটের প্যাকেটে নিস্পৃহতায় দাঁড়িয়ে আছে মনে করে

ফুড়ে-ফেটে চৌচির হয়ে গেছে  স্ট্রবেরী-কনডমের পাকা বস্তা।

তোমারই জারজ সে-তীব্র পরিব্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন

এইচ আই ভির একটি দুর্দান্ত ক্ষুদ্র কনা,

আকাশ বাতাস ফাটিয়ে তীব্র চিৎকার দিয়ে

 আচম্বিতে প্রবেশ করবে তোমার অতলান্ত গভীরে।

শত সহস্র ফুল আছে ফুটে পচা ডোবা, কালো ড্রেন, আর ময়লার ঝুড়িতে

দুটি নয়-একটিমাত্র তীক্ষ্ণ কাটার শলাকা নীরবে-নিভৃতে গজাচ্ছে ধীরে

তারপর গন্ডা কয়েক খোঁচা মাত্র-

শরীরের এক কোনা বেয়ে উঠে দাঁড়াবে অশরীরী একগুচ্ছ চতুর্মাত্রিক ব্রণ;

ভরে উঠবে তোমারই বাসি রক্ত, ক্লেদ ও গোলাপী পুঁজে।

খুশকিরা তোমার বিবর্ণ দাড়ি-চুল সহ উঠে গিয়ে

দূর মৃত আকাশে কয়েকটি দোরা সাপ হয়ে যাবে।

একটি নক্ষত্র- দুই-তিন-অনেক নক্ষত্র হয়ে উঠছে জেগে-

বৃত্তাকার গোল চিহ্নের ভেতরে;

নিশ্চিত জানি-একটি বেদনাতেই ঘটবে তোমার ঘননীল-মৃত্যু

উপুর হয়ে শুয়ে থাকবে নিজেরই লাশের স্তুপের ‘পরে।

oooooo

 দূরত্ব

রাজকুমার

0814 (1)

ঘুড়িটির মাঞ্জা জুড়ে ক্ষয়
ঘুড়িটির সুতো কেঁটে গেছে

ধসে যাচ্ছে একাকী নাটাই
ঘুড়িটি, আর উড়ছে না ।

ttttt

নীল চাঁদ

রীনা তালুকদার

download (1)

কাল নাকি নীল আকাশেই

ওঠেছিলো নীল চাঁদ

নিশ্চয়ই আকাশ ছিলো ধূসর কালচে

নগর জীবনের সুউচ্চ ভবন

কখনোই চাঁদ দেখতে দেয়নি

তাই চাঁদ অন্যরকম ছিলো কি-না

জানিনা ; জানবোনা কোনদিন

খোলা জানালার গ্রীল ভেদ করে

আমাকে দেখেছে কি-না

কে-জানে; আমিতো জানিনা

যারা দেখেছে গাঁয়ের লোক

নারিকেলের চিরল পাতার ফাঁকে

তেতুলের কুচি পল­­বে ছোট্ট টুকরো টুকরো চাঁদ

কেউ কেউ শহুরে বাড়ির ছাদে ওঠেছিলো

দূর চাঁদের নীল জ্যোস্না জলে ভিজতে

কতকাল ভিজে আছি চাঁদের কলঙ্ক কুয়াশায়

তবে কী কাল চাঁদ কলঙ্ক ছাড়া ছিলো ?

তুমি কী দেখেছো তাকে;

কই একবারও যে বলনি ?

এ আমি তো কেবল দিনামেত্মর ছায়ায়

পর্বতের জ্বালামুখে দেখেছি

কৃষ্ণ কলঙ্কিত করতলের ছাপ !

Chhotogolpo-1

নিভু নিভু আলো

ফিদাতো মিশকা

images (2)

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার ।হাত মেললে হাত দেখা যায় না।এরকম অন্ধকারের মধ্যে আমি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছি। মোমবাতির আলোতে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভৌতিক পরিবেশে আমার ভয় লাগছে না ।কারন আমি জানি কয়দিন পর আমার মৃত্যু হচ্ছে ।মোমবাতির আলোতেwilliam butler yeats এর কবিতা পড়ছি।

When you are old
When you are old and gray andfull of sleep,
And nodding by the fire,take down this book,
And slowly read,and dream of the soft look
Your eyes had once, and of their shadows deep;

How many loved your moments of glad grace,
And loved your beauty with love false or true,
But one man loved the pilgrim soul in you.
And loved the sorrows of your changing face ;

And bending down beside the glowing bars
Murmur ,a little sadly ,how Love fled
And paced upon the mountains overhead
And hide his face amid a crowd of star .

আচ্ছা ,আমি কি কখনো বৃদ্ধ হব।আমার বয়স ২৩  বছর। যেহেতু কয়েকদিন পর আমার মৃত্যু হচ্ছে ।তাই আমার বৃদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সামনের সপ্তাহে আমার ফাঁসী হচ্ছে। মৃত্যু বাপারটা আমাকে আলোড়িত করছে না।কয়েকদিন পর ফাঁসী হবে বাপারটা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে ।যেন ফাঁসী হওয়াটা ডাল ভাত ।একজন মানুষের জীবনে ফাঁসী হওয়াটা খুব জরুরী ।আচ্ছা sorrows of your changing face মানে কি ,এটা দিয়ে কবি কি বুঝাতে ছেয়েছেন। ব্যাপারটা পরে ভেবে দেখতে হবে।

জেলেখানার মধ্যে বই পেলাম কেমন করে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। প্রত্যেকটা জেলখানাতে একটা লাইব্রেরী থাকে।তবে আমি লাইব্রেরীর বই পড়ছি না।আমি বইগুলো জেলার সাহেব কে দিয়ে আনিয়েছি। ফাঁসীর আসামীদের জেলখানায় জামাই আদর করা হয়।আমাকেও জামাই আদর করা হচ্ছে।এ পৃথিবীর নিয়ম অদ্ভুদ একজন মানুষ কয়দিন পর মারা যাবে দেখে তার প্রতি অদ্ভুদ সহানুবতি দেখানো হচ্ছে।জেলার আমাকে বিশেষ পছন্দ করছেন।কেন করছেন কারনটা স্পষ্ট না।এইসব মানুষদের মতিগতি বোঝা মুশকিল।উনি যখন আমার কাছে আমার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলেন।তখন বললাম ,আমাকে কিছু বইয়ের ব্যবস্থা করে দেন জীবনের শেষকটা দিন জ্ঞানচর্চা করে কাটাতে চাই ।মহানবী (সঃ) বলেছেন,জ্ঞানচর্চার জন্য সদুর চিন দেশে যাও,আমি জ্ঞানচর্চার জন্য জেলখানায় এসেছি।
জেলার সাহেব চমকে গেলেন ভাবলেন আমি রসিকতা করছি।তিনি বললেন,
-আমার সাথে রসিকতা করবেন না আমি রসিকতার মানুষ না।আপনার কোন ইচ্ছে থাকলে বলুন,বইতো জেলখানার লাইব্রেরিতে আছে ।সেখান থেকে নিয়ে পড়ুন ।
-লাইব্রেরিতে যে বইগুলো আছে সে গুলোতে হবে না ,আমার শেষ ইচ্ছে পুরন করতে হলে আমার লিস্ট অনুযায়ী বই আনিয়ে দিতে দিন।
-এটা আপনার শ্বশুর বাড়ি না এটা জেলখানা এখানে আপনি পুণ্য করে আসেন নাই যে আপনাকে জামাই আদর করা হবে ।
-তাহলে ঠিক আছে আমার শেষ ইচ্ছে পুরনের প্রয়োজন নাই।আর একজন খুনের আসামিকে আপনি করে বলছেন কেন তুই করে বলুন।
আমি খিক্ খিক করে হেসে উঠলাম ।জেলার সাহেব চলে গেলেন।
দুইদিন পর জেলার সাহেব আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন ।তারপর বললেন,
-আমি সহজে মুগ্ধ হই না ।যারা অপরাধী নিয়ে বসবাস করে তাঁরা এক সময় মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ।কিন্তু আমি আপনার রসিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। মৃত্যুকে  আপনি আমলে নিচ্ছেন না।এত হালকাভাবে মৃত্যুর কিছুদিন আগে কাউকে থাকতে দেখিনি।আচ্ছা, মৃত্যু কি আসলেই তুচ্ছ করার ব্যাপার ।

-তাহলে কি মৃত্যু নৃত্যগীতের বাপার,আমার ফাঁসী হচ্ছে ব্যাপারটা আমি নাচ গান করে সবাই কে জানাব।সবার সামনে চেহারায় টেনশন এঁকে বসে থাকব।যেন মানুষ জন আমার দিকে তাকিয়ে বলে আহা বেচারা।
-আমি আপনার সাথে তর্কে যাচ্ছি না।আমি আপনার ফাইল পত্র গেঁটে দেখেছি । কোর্ট আপনার বিরুদ্ধে কিছু প্রমান করতে পারেনি।আপনার স্বীকারউক্তিতে আপনার ফাঁসীর রায় হয়েছে।নিজের মৃত্যু নিজে ডেকে এনেছেন
-জেলার সাহেব জীবন মৃত্যু সব প্রাণীর জন্য দুইটা অধ্যায় মাত্র। জীবন নামক অধ্যায়টা ভালো লাগছে না বলে মৃত্যু বেঁচে নিলাম।
-ফিলসফি কপচাবেন না আমার ফিলসফি সহ্য হয় না
-তাহলে কি জোকস শুনবেন। একটা ছেলে নারিকেল গাছে উঠেছে ,তাই দেখে তার এক বন্ধু বলল কিরে তুই নারিকেল গাছে কেন।বন্ধুটি বলল এখান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং
কলেজ এর মেয়েদের দেখা যায়।প্রথম বন্ধুটি বলল, দোস্ত তুমি হাতটা ছেড়ে দাও তাহলে খুব কাছ থেকে মেডিক্যাল কলেজ এর মেয়েদের দেখতে পারবা।
যে অবস্থায় জোকসটা বলেছি, সে অবস্থায় হাসার কথা না কিন্তু জেলার সাহেব গলা ফাটিয়ে হাসতে লাগলেন ।তারপর বললেন ,কোন প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন ।আমি কাউকেই সহজে পছন্দ করি না ।কিন্তু কেন জানি আপনাকে খুব পছন্দ করছি।
মোমবাতিটা শেষ হয়ে আসছে ।আর পড়তে ভালো লাগছে না ।বাতিতি নিভিয়ে দিলাম।অন্ধকার প্রকট হচ্ছে ।অন্ধকার প্রকট হলে আমার পুস্পিতার কথা মনে পড়ে।পুস্পিতা,আমার পুস্পিতা তোমাকে খুব ভালবেসেছিলাম।
১৯৯৯ ,মে এর কোন এক দুপুরে আমাদের বাসার পাশে পুস্পিতারা আসল। পুস্পিতার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ।সরকারী বাসায় থাকতে ভালো লাগে না বলে বাসা ভাড়া নিয়েছেন।মেয়ে মানুষের চোখের দিকে তাকাতে আমার তীব্র অস্বস্তি হতো ,কিন্তু জানি না, কেন জানি পুস্পিতাকে দেখলে ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হত।পুস্পিতার সাথে প্রথম যেদিন কথা হল সেদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি দেখলেই কেমন জানি আমার ভিতরে অদ্ভুদ এক আকুলতা কাজ করে, বৃষ্টির ফোটাগুলোর স্পর্শ পাওয়ার জন্য আমার মধ্যে নেশা জাগে।আমি বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি বৃষ্টির স্পর্শ নেই।আমি কলেজ থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ একটা মিষ্টি কণ্ঠ বলল ,এই যে দাঁড়ান,আমি দাঁড়ালাম ।পিছন ফিরে দেখলাম পুস্পিতা ।কেমন কেমন হতে লাগলো,মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি ।পুস্পিতা আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বলল
-আপনি হাতে ছাতা নিয়ে ভিজছেন কেন ।ঠাণ্ডা লাগানোর খুব শখ আপনার ।আপনার ঠাণ্ডা লাগানোর শখ হলে আপনি ঠাণ্ডা লাগান ।আপনার ছাতাটা আমাকে দেন ।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না ।পুস্পিতা বলল উজবুকের মতো কি দেখছেন ছাতাটা দিন।
আমি ছাতাটা দিয়ে দিলাম ।পুস্পিতা চলে গেল।
মাথায় যথেষ্ট পেইন হচ্ছে ।এখন কিচ্ছু ভাবতে ভালো লাগছে না ।এখন আমি ঘুমাব। মৃত্যু পথযাত্রিদের ঘুমের সমস্যা করতে নেই…………………………………………………..

দুপুর বেলা সময়টা আমার কাছে অসম্ভব কষ্টের । দুপুর বেলা আমার মাথায় প্রচণ্ড রকম ব্যথা হয় । মনে হয় মাথার সব নার্ভ ছিঁড়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড ব্যাথাকে ভুলে থাকার জন্য মনকে কোন চিন্তায় নিবিষ্ট রাখতে হয় । আমি ব্যাথা ভুলে থাকার জন্য পুস্পিতার কথা ভাবছি । পুস্পিতার কথা ভাবলে কেমন জানি আমার ব্যাথা কমে যায় ।

দিনের পর দিন আমি পুস্পিতাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম ,পুস্পিতাকে নিয়ে ভাবতাম । আমার পৃথিবীর দুটা অংশ হয়ে গেল একটা অংশ জুড়ে পুস্পিতা বাকি অংশ জুড়ে বাকি পৃথিবী । পুস্পিতার ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমি যে তাকে এতোটা পছন্দ নিয়ে দিনের পর দিন ভালবেসে যাচ্ছি বিষয়টি সে বুঝতে পারছে কিনা। মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রায়ই একটা ব্যাপার হয় , কিছু ব্যাপার তারা চট করে বুঝে ফেলে আবার কিছু ব্যাপার অনেক বুঝানোর পরও বুঝতে পারে না ।

আমি খুব সিরিয়াস টাইপ এর ছাত্র ছিলাম। সিরিয়াস বলছি এইজন্য যে মফঃস্বলের মতো একটা জায়গা থেকে নিজে নিজে পরে সাতটা লেটার নিয়ে আমি এস এস সি তে বিভাগে তৃতীয় হয়েছিলাম । পুরো এলাকাতে আমার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল । এইসব খবর বাতাসের সাথে ছড়ায় ।

আমি বোধহয় খুব এলোমেলো ভাবছি। এবার পুস্পিতার কথা বলি ,যতদিন যাচ্ছিল আমার চিন্তার জগত ছোট হয়ে আসছিল ।আমি বুঝতে পারছিলাম প্রায় প্রতিটা মুহূর্তে আমি ভাবছি পুস্পিতা, পুস্পিতা এবং পুস্পিতাকেই।

এভাবে দিন চলতে থাকে । এর মধ্যে আমার ছোটবোন পিংকির সাথে পুস্পিতার বেশ ভাব হয়ে যায় ।পুস্পিতা আমাদের বাসায় আসা শুরু করে ।কিন্তু আমি ওর সামনে যাওয়ার সাহস পাই না ।আমাকে দূর থেকে তাকে দেখে যেতে হয় ভালবেসে যেতে হয়।

একদিন দুপুর বেলা আমি শুয়ে শুয়ে রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলাম,

‘ দিবস রজনী আমি যেন কার

আশায় আশায় থাকি ,

এমন সময় আমি বুঝতে পারলাম আমার পিছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে ।আমি চোখ খুলে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম ।হ্যাঁ পুস্পিতাই ছিল আমি কোন স্বপ্ন দেখছিলাম না ।

পুস্পিতা বলল ,

-          দুপুর বেলা এরকম ঘুমাচ্ছেন কেন ।দুপুর বেলা তো ঘুমায় খরগোশ  আপনি তো খরগোশ না ।

আমি কথা বলতে পারছিলাম না ,চুপ করে ছিলাম । পুস্পিতা বলতে লাগলো

- কথা বলছেন না কেন , আপনি মেয়ে মানুষ দেখে এত নার্ভাস হচ্ছেন কেন। মেয়ে মানুষ তো বনের বাঘ ভাল্লুক না । আর মেয়ে মানুষকে তৈরি করা হয়েছে পুরুষের সঙ্গী হিসেবে ।বাইবেলে কি আছে জানেন ,

Then the man said ,

This is now bone of my bone

And flesh of my flesh

She shall be called ‘woman’

For she is taken out of man

-আমি আসলে মেয়েদের সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত না। যারা সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে থাকে তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় ।আমার ক্ষেত্রে হল ,আমার মেয়েদের সামনে অনেক নার্ভাস লাগে ।

-কথাটা সত্য না ।আপনি নিজের ক্ষেত্রে এরকম ভেবে নিয়েছেন আপনি কিন্তু পিংকির সামনে অনেক কথা বলেন । তখন কিন্তু আপনি নার্ভাস ফিল করেন না ।

- হয়তো

-আপনার নার্ভাস লাগুক আর ভয়ে কাচুমাচু হন ,আমার কিছু যায় আসে না ।আমার বকবকানির অভ্যাস আছে ।মাঝে মাঝে বকবকানি করতে আসব ।আপনি নার্ভাস হয়ে কাঁপতে থাকবেন আর আমি বকবক করব । এখন আপনি ঘুমান আমি আসি । পুস্পিতা চলে গেল ,আমি চুপ করে বসে থাকলাম । অতঃপর পুস্পিতা আমার কাছে আস্তে লাগলো ,আমি প্রচুর কথা বলা শুরু করলাম আমাদের সম্পর্ক আপনি থেকে তুমি তে নেমে গেল। কিন্তু আমি পুস্পিতাকে আমার মনের কথা বলতে পারলাম না ।

একদিন পুস্পিতা আমার সামনে এসে বলল , এখনই আমরা নদীর পাড়ে যাব। তোমার সাথে আমি সেখানে বসে গল্প করব ।আমরা নদীর পাড়ে চলে আসলাম ।পুস্পিতা কথা বলা শুরু করল

-এই যে কাশফুল গুলা দেখছ , সেগুলো অনেক সুন্দর তাইনা ।

-হুম

-কিন্তু এখন যদি তোমাকে বলি এই কাশফুলগুলো আসল না কৃত্রিম ,তখন তোমার আর এতোটা ভালো লাগবে না । আসলে সুন্দর ব্যাপারটা আপেক্ষিক ।যেমন একটা মেয়ের চেহারা দেখে তোমার মনে হল মেয়েটার চেহেরাটা অনেক পবিত্র ।তোমার ভালো লাগবে মেয়েটাকে ।কিন্তু পরে যদি তুমি জানতে পার মেয়েটা পতিতা । তখন মেয়েটার দিকে তাকালে তোমার আগের মতো এতো পবিত্র লাগবে না । মনে এক ধরণের অস্থিরতা লাগবে।

-তুমি পাগলের মতো এইসব কি বলছ।

-আমি এখন তোমাকে একটা গল্প বলব ,এটা ছিল গল্পের ভুমিকা ।এবার আমি গল্প বলা শুরু করব এর মাঝখানে তুমি একটা কথা  বলবা না ।আমরা যখন যশোর এ ছিলাম । তখন মিতুল নামের একটা ছেলের সাথে আমার বন্ধুত হয়।একদিন মিতুলের সাথে ঘুরছি হঠাৎ মিতুল বলে বাসা থেকে ফোন আসছে মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চল মাকে দেখে আসি । আমি মিতুলের সাথে ওর বাসায় যাই । সেখানে ওর তিন বন্ধু মিলে আমার উপর উপগত হয় ।খুবই সংক্ষিপ্ত গল্প । তাইনা ।

আমি চুপ করে থাকি পুস্পিতা বলে যায়

-মিতুলের কাজই ছিল মেয়েদের সাথে বন্ধুত করে তাদের  সর্বনাশ করা । ওর মামা সরকার দলীয় সাংসদ ছিল ।তাই ওর বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারত না । আমিও পারিনি । এর পর বাবা ট্রান্সফার হয়ে এখানে চলে আসেন । আমি ভাগ্যকে মেনে নিতে চেষ্টা করি । কিন্তু প্রায়ই মনে হয় আমার গা গিন গিন করছে ,আমার শরীরে থেকে আছে কয়েকটা নিকৃষ্ট পোকা। কি আমাকে দেখে এখন ঘিন্না হচ্ছে তাই না, গা গিন গিন করছে তাই না।

-না পুস্পিতা , হায়েনার আঁচড়ে শরীরে ক্ষত হয় ,কিন্তু মনে না । আর শরীরের ক্ষত মনে ছড়াতে নেই । চিরকাল পাশাপাশি থাকতে হয় মন নিয়ে, শরীর নিয়ে নয় ।তোমার সাথে থাকতে আমার আপত্তি নেই ।

-আমি জানতাম তুমি এইরকমই বলবে অন্থু ।

তারপর পুস্পিতা আমাকে প্রথম বারের মতো বুকে টেনে নেয় ।আলতো করে ওর চুম্বনে ভিজিয়ে দেয় আমায় । আমি আনন্দে সাত আসমানে ভাসতে থাকি । এরপর পুস্পিতা আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দেয় । বলে এখানে আমার ভালবাসার কথা লিখা আছে ,আমি যেদিন বলব সেদিন তুমি সেটা খুলে পড় আচ্ছা।পুস্পিতা চলে যায় ।এরপর থেকে পুস্পিতার সাথে আমার কম কম দেখা হত আমি পরীক্ষা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলাম । আর ভাবলাম , পাইলাম আমি ইহাকে পাইলাম ।

একমাস পড় আমি কলেজ থেকে বাসায় ফিরলাম। পিংকি বলল ,ভাইয়া এদিকে আয় ।আমি গেলাম ।সে বলল ভাইয়া মনটা শক্ত কর । পুস্পিতা আপু সুইসাইড করেছে।

আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসল । মনে হল আমি প্রানহীন নিঃস্পন্দ।

পুস্পিতাকে কবর দিয়ে এসে আমি চিরকুটটা খুললাম ,

“ জানি তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো , তুমি সব অবস্থায়ই আমায় কাছে টেনে নিতে পারবে । কিন্তু তোমার পাশে দাঁড়িয়ে সবসময় মনে হত আমার শরীরের উপর কয়েকটা পশু ।তাই আমাকে চলে যেতে হবে । কিন্তু মাঝে মাঝে তোমার বুকে মাথা রাখতে খুব ইচ্ছে হয় । খুব । নিজের খেয়াল রেখ । আর একটুও দুষ্টুমি করবা না । বাই “

তারপর আমি ভীতু ছেলেটা অনেক সাহসী হয়ে গেলাম ।আমি যশোর গেলাম ।মিলন ও তার বন্ধুদের খুজে বের করলাম । প্লান করে খুন করলাম ।লাশ সালফিউরিক এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিলাম । কোন প্রমান থাকলো না । বাসায় চলে আসলাম । কোনকিছুতে মন বসাতে পারলাম না বারবার পুস্পিতার কথা মনে হল। একবছর পর মনে হল ,এভাবে বেঁচে থেকে কি লাভ । তাই পুলিশের কাছে ধরা দিলাম। নিজের মৃত্যু নিজে ডেকে  আনলাম । এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি , পুস্পিতার কাছকাছি যাওয়ার জন্য ।

বিকেল হয়ে যাচ্ছে । মাথার ব্যাথা কমে যাচ্ছে । মৃত্যুর আগে আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে । আমি মনে মনে বিজয় আহমেদের  কবিতা  পড়ছি

 ইঙ্গিতে কি কথা বলে ধান

প্রেম নাকি ধূসর-শাদা প্রিয়তম বিষাদ

 আমি জানি না , তবে ধানের ধবনিতেই

আমাদের যতো বোবা মুহূর্তের গান,

images (1)

আমি জেলার সাহেবের সামনে বসে আছি, হাতে হাতকরা পায়ে বেড়ি। জেলার সাহেবকে বিরক্ত মনে হচ্ছে তিনি আমায় দেখে বললেন ,

-আপনি দিগদারী করতে আসছেন কেন ।আমার আপনার দিগদারী ভালো লাগছে না ।

-জেলার সাহেব আমিতো দিগদারী করতে আসিনি আপনাকে ম্যাজিক দেখাতে আসছি ।আমি ম্যাজিক দেখাব , আপনি দেখে তৃপ্ত হবেন, হাততালি দিবেন। চা নাস্তা খাওয়াবেন ।

- হারামি ,খবরদার তুই ফাজলামি করবি না থাপরাইয়া তোর সব দাত ফেলে  দিব।কদিন পর মারা যাবি এক পা কবরে নিয়া রসিকতা করস ।

-জেলার সাহেব উত্তেজিত হবেন না । উত্তেজিত হলে আপনি স্ট্রোক করতে পারেন । আমি সত্যি সত্যি ম্যাজিক দেখাতে আসছি ।আপনি আমাকে একটা কয়েন দেন ।

জেলার সাহেব রাগে রাগে কটমট করতে করতে আমার দিকে কয়েন এগিয়ে দিলেন ।

আমি কয়েন হাতে নিয়ে ম্যাজিক দেখানো শুরু করলাম।

জেলার সাহেব এই যে আমি কয়েনটা ডান হাতে রাখলাম । এবার মুঠ বন্ধ করলাম।এবার মুঠ খুলালাম । কয়েন ভানিশ । এবার বাম হাত খুলে কয়েন বামহাত থেকে বের করলাম । বামহাত বন্ধ করে বললাম ,জেলার সাহেব এবার কয়েনটা আপনার পকেটে।

জেলার সাহেব পকেটে হাত দিয়ে কয়েনটা ফেলেন এবং মুগ্ধ হলেন ।

আমি বললাম,

-জেলার সাহেব মানুষের জীবনটা কয়েনের মতো চলমান । যেমন আমি বাইরে ছিলাম, এখন জেলে আছি কয়দিন পর কবরে থাকব ।ইন্টারেস্টিং না ।

-আপনি এবার বিদায় হন । এই এঁকে নিয়ে যাও তো।

-জেলার সাহেব এত বিরক্ত হচ্ছেন কেন ।আমি একজন মৃত্যুপথযাত্রী আমার সাথে আপনি দোয়া করে কিছুক্ষণ কথা বলুন । আমি লক্ষ করে দেখেছি যে আপনি প্রায় সময়ই অন্যমনস্ক থাকেন ।মনে হয় ছারপাশের কিছুই আপনি খেয়াল করছেন না । যাদের মনে কষ্ট লুকানো থাকে তাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় ।আমার বিশ্বাস আপনার মনে কোন কষ্ট লুকানো আছে। কষ্ট পুষে রেখে কি লাভ কষ্টের কথা কাউকে বললে কষ্ট কমে যায় ।

-আপনারে কে বলছে আমার কষ্ট আছে । রসিকতা করবেন না রসিকতা আমার পছন্দ না

-দেখেন আমি কয়দিন পর মরে যাচ্ছি । আমাকে বলে ফেললে কোন সমস্যা নাই । আপনার কষ্ট কমে যাবে।

-এতো যখন শুনতে ছাচ্ছেন তবে শুনেন । গত বছর আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করে । সে চিরকুটে লিখে যায় , তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয়। কিন্তু আমি জানি সে আমার উপর রাগ করে এটা করেছে। আমি নতুন জেলার হলে অনেক ব্যাস্ত হয়ে পড়ি । তার উপর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এক আসামি পালিয়ে যায়। আমার উপর চাপ আসতে থাকে প্রায় রাতে আমি বাসায় ফিরতে পারতাম না । বাসায় ফিরলেও ওর সাথে কেমনে কেমনে খারাপ ব্যাবহার হয়ে যেত।আমার মনে হয় আমি তাকে খুন করে ফেলেছি ।ব্যাপারটা আমাকে কষ্ট দেয় ।

-দেখেন জেলার সাহেব ,আমরা যেভাবে জীবনটাকে ভাবি, সবসময় টা ঠিক হয় না । আপনি আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করছেন । বিষয়টা হয়তো সত্য না । আপনার উপর রাগ করে উনি কাজটা করলে চিরকুটে আপনার উপর তার অভিমান থাকতো। আপনার স্ত্রী হয়তো অন্য কারনে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসেন দেখেই আজ আপনার খারাপ লাগছে আজো কষ্ট পাচ্ছেন ।আপনি মন খারাপ করে থাকবেন না । আপনি মন খারাপ করে থাকলে আপনার স্ত্রী অনেক কষ্ট পাবেন । এবার একটু হাসেন ।

আমি দেখলাম জেলার সাহেবের চোখে জল টলমল করছে ।

আমি বললাম, জেলার সাহেব আমার ক্ষমতা থাকলে আমি সব জেলখানাতে একটা করে বাথট্যাব বানিয়ে দিতাম।যাতে ফাঁসির আসামীরা শেষ কয়দিন বাথট্যাবে শুয়ে সিগারেট –চা খেয়ে আনন্দে দিন কাটাতে পাড়ে । উৎসব করে নিজের মৃত্যু উদযাপন করতে পারে । জেলার সাহেব এসে দিলেন । আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো । হঠাৎ মনে হল ইশ আর কয়টা দিন বাঁচতে যদি পারতাম ।আমি    lord Tennyson er কবিতা আবৃত্তি করছি

Tears, idle tears I know not what they mean

Tears from the depth of some devine despite

Rise in the heart and gather to eyes

In looking on the happy autumn –field

 And thiking of the days that are no more.

২৯ ডিসেম্বর রাত ১২.০১ মিনিটে অন্তুর ফাঁসী হয়ে যায়। ৭ জানুয়ারি জেলার সাহেব চট্টগ্রাম কারাগারে বদলি হয়ে যান । বাসার জিনিসপত্র স্থানান্তরের সময় তার হাত থেকে পরে তার স্ত্রীর মেইকআপ বক্স ভেঙ্গে যায় । সেখানে তিনি একটা চিরকুট পান ।

আমি জানিনা তুমি এটা কখনো পাবে কিনা । যদি পাও তবে আমাকে ক্ষমা করে দিও । আমি জানি তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো , কিন্তু আমি তোমার সুযোগ নিয়েছি । তুমি যখন ব্যাস্ত হয়ে পরলে তখন আমি সুজন নামে আমার পুরনো বন্ধুর সাথে মেলামেশা শুরু করি । আমাদের সম্পর্ক শরীরের দিকে জরিয়ে যায় । আমার গর্ভে ওর সন্তান চলে আসে ও আমাকে বিয়ে করার কথা বলে । কিন্তু তার আগে সে পালিয়ে আমেরিকা চলে যায় । আমার আর কোন রাস্তা ছিল না………………। গোলাপ শুকিয়ে যায় তবু মনেতে থেকে যায় গোলাপের ভালোবাসা

(বি দঃ এহা একখানা কাল্পনিক গল্প তবুও কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তার দায়ভার পুরোটা লেখকের

উৎসর্গ ।- আমার বর্ষাকে যার বৃষ্টিতে আমি প্রতিনিয়ত ভিজতে চাই । কিন্তু সে জানে না তার বৃষ্টি আমার জন্য কিনা

ধন্যবাদ জলফড়িং এর গল্প কে , তুই না থাকলে হয়ত গল্পটা শেষ করতে পারতাম না দোস্ত ।)

Probondho-nibondho-1

বাংলার নারী আন্দোলনের অগ্রদূত শিক্ষাব্রতী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন 

কোবিদ 

বাংলার নারী আন্দোলনের অগ্রদূত, লেখিকা, শিক্ষাব্রতী, সমাজসেবী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর তার জন্ম এবং ১৯৩২সালের একই দিনে তার মৃত্যুহয়। বাঙ্গালি সাহিত্যিক, নারী আন্দোলনের অগ্রদূত ও সমাজ সংস্করক বেগম রোকেয়া ষাখাওয়াত হোসেনের জন্ম-মৃত্যুবাষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

(রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান)
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা, আর তিন ভাই যাদের একজন শৈশবে মারা যায়। তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তাঁর বোনদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়নি, তাদেরকে ঘরে আরবী ও উর্দু শেখানো হয়। তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিকমনস্ক ছিলেন। তিনি রোকেয়া ও করিমুননেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান।

১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। বিয়ের পর তিনি ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ নামে পরিচিত হন। তাঁর স্বামী মুক্তমনা মানুষ ছিলেন, রোকেয়াকে তিনি লেখালেখি করতে উৎসাহ দেন এবং একটি স্কুল তৈরির জন্য অর্থ আলাদা করে রাখেন। রোকেয়া সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যজগতে পদার্পণ করেন। ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। এর পাঁচ মাস পর রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ভাগলপুরে। ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার ফলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে যান।

(বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল সেন্টারে বেগম রোকেয়ার প্রতিকৃতি, পায়রাবন্দ, রংপুর)
এখানে ১৯১১ সালের ১৫ই মার্চ তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল পুণরায় চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় ছাত্রী ছিল ৮ জন। চার বছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালের মাঝে এটি হাই স্কুলে পরিণত হয়। স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রোকেয়া নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যস্ত রাখেন। ১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সভায় তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা Sultana’s Dream। যার অনূদিত রূপের নাম সুলতানার স্বপ্ন। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলি হলঃ পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর। তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর রচনা দিয়ে তিনি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না – তা বলেছেন।

(বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র, পায়রাবন্দ, রংপুর)
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন স্মরণে বাংলাদেশ সরকার একটি গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে পৈতৃক ভিটায় ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। এতে অফিস ভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, ৪ তলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কক্ষ, লাইব্রেরি ইত্যাদি রয়েছে। স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়

(বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়)
২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ৭ম বিভাগ হিসেবে রংপুর বিভাগের একমাত্র পুর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ২০০৯ সালে ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ হিসেবে তাঁর নামকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়।এছাড়াও, মহিয়সী বাঙালি নারী হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদানকে চীরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসনের জন্য “রোকেয়া হল” নামকরণ করা হয়।
১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। সেসময় তিনি ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন।

(বেগম রোকেয়ার জন্ম-শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে (১৮৮০-১৯৩২) ১৯৯০ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দু’টি স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করে)
উনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক, বাঙ্গালী নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের জন্ম-মৃত্যুদিনে আমাদের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সূত্রঃ Sewallbelmont
Rokeya Sakhawat Hossain

Chhoriye dilem chhora

শাহ আলম বাদশা’র ছড়াগুচ্ছ 

জীবনের চতুষ্পদী

downloado

(১)

বেকার বসে থাকবো কতো

চাকরি খুঁজি ফি-সনে

কিন্তু আহা ব্যর্থ আমি

ঘুষছাড়া এই মিশনে?

(২)

জোয়ান মেয়ে ফেললে সেকি

এমনতরো কৌতুকে

গিলতে শুধু চায় যে দেখি

হা-করা এক যৌতুকে!

(৩)

জীবন আমার ওষ্ঠাগত

যেদিকে চাই ধুধুরে

দু’চোখে তাই সর্ষে ফুল

ঘোর আঁধিয়ার শুধুরে।।

ll

চাটুকার

vvvv

জিয়া হক

সবখানে চাটুকার

চাটুকরি করছে

জি হুজুর মহাশয়

পায়ে লুটে পড়ছে।

ঝোপ বুঝে কোপ মেরে

ফায়দাটা লুটছে

স্বার্থের লাগি শুধু

চারদিকে ছুটছে।

দেশপ্রেম নীতিবোধ

সংস্কৃতি ভুলছে

ভীনদেশি “কোলাভেরি”

কীযে সুর তুলছে।

তেলতেলে তেলমাথা

আরো তেল ঢালছে

চান্স নিয়ে টার্গেটে

 গুটি শুধু চালছে।

জ্যামিতিক হারে দেখ

চাটুকার বাড়ছে

ক্ষমতায় বসে ফের

কলকাঠি নাড়ছে।

b

বড়দের মতো

আসলাম প্রধান

 

পিচিচটা কাল থেকে

নাক ঝারে টিস্যুতে

হামাগুড়ি দিয়ে যায়

টয়লেট ইস্যূতে

 বড়দের ভাব দেখি

তার সবকিছুতে।

গালে হাত শুয়ে শুয়ে

চোখ রাখে পেপারে

মনে হয় কাগজের

পড়াগুলো সে পারে

এ রকম ভঙ্গিমা

তার মতো কে পারে ?

dddd

জনতার শক্তি রুখবে দুর্নীতি

মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান

 

দুর্নীতি দূর করে দেশটাকে গড়তে

একসাথে সবাইকে হবে আজ লড়তে।

সোনাফলা স্বপ্নের আমাদের দেশটা

এসো ভাই দেশগড়ি চালাই প্রচেষ্টা;

কিছু লোক করে ভোগ লুটে নেয় অর্থ

মানে নাকো আইন তারা নিয়মের শর্ত

গড়ে বাড়ী কিনে বাড়ী অবৈধ উপায়ে

দুর্নীতি করে যায় দুই হাত দুপায়ে!

তাদেরকে রুখতে হবে আজ আমাদের

খুঁটির জোর থাকনা যত ওই মামাদের

জনতার শক্তি যে রুখবেই দুর্নীতি

প্রতিবাদ প্রতিরোধে গড়ে যাই সুনীতি।

শপথে বলিয়ান সুদৃঢ় অঙ্গীকার

দুর্নীতি চ্যাম্পিয়ান হবো নাকো বার বার

তবেই তো আমাদের সম্মান বিশ্বে

বিজয়ের গৌরবে গাঁথা রবে শীর্ষে। 

Dharabahik Uponnas-1

 সমাধি ‘পরে

লুতফুন নাহার

k4281572

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

বিয়ের প্রথম রাতে  সুরমা বধু বেসে ফুলশয্যায় জীবন সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছে ।এমনিতেই প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না তার উপর বাসর রাত বলে কথা ।যে মানুষটিকে নিয়ে এতদিন নিজের মনে কত বাসর সাজিয়ে কল্পনায় প্রেমালাপ করেছে, বিয়ের পর বাস্তব বাসরে সেই ভালবাসার মানুষটিকে সশরীরে পাওয়ার আকাঙ্খা আর প্রত্যাশার সীমা অতিক্রম করে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ জলোচ্ছ্বাসের মত প্রকান্ড ঢেউ নিয়ে হৃদয়ের কিনারায় আছড়ে পড়ছে ।মন চাচ্ছে  সে ভালবাসার মানুষটিকে নিজেই গিয়ে নিয়ে আসে তার কাছে ।কিন্তু নারীত্বের অলঙ্কার-লজ্জা ধারণ করে বসে আছে যে মানবী তার পক্ষে সেই অলঙ্কার খুলে স্বামীকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজের কাছে নিয়ে আনতে পারছে না বলেই বসে বসে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে । রাত প্রায়  দু’টোর দিকের টলতে টলতে তার স্বামী ঘরে প্রবেশ করল ।দরজাটা বন্ধ করে খাটের নিকট আসল ।তারপর সুরমার পাশে বসে ওর চিবুক ধরে মুখখানা উঁচিয়ে অনেকক্ষণ অপলক চেয়ে রইল । সুরমার ভিতরটা তখন যৌবনের উচ্ছ্বাসে তরঙ্গায়িত হচ্ছে ।তার শরীরে কেমন যেন শিহরণ হচ্ছে । তার স্বামীর মুখ থেকে যে বিকট মদের গন্ধ বেরিয়ে আসছে যৌবনের মাদকতায় উম্মত্ত দেহ সেদিকে কোন প্রকার সংবেদন সৃষ্টি করতে পারে নি। ধীরে ধীরে চোখ খুলে স্বামীর দিকে লজ্জাভরা নয়নে তাকাল ।চোখে চোখ পড়তেই স্বামীর আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসল ।

চিবুকটি ঝাপটা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলল- এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকেও মুখটিতে অসাধারণ কিছুই চোখে পড়েনি । সেই সাদাসিদে, এক গেঁয়ো, সেকেলে ভাব ছাড়া! এটা আমার ঘর । নিশ্চয়ই জান, এই ঘরে শুধু আমিই থাকি । বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে । কোন সাহসে  আমার বউ হওয়ার সাধ জেগেছিল? তোমার মত মেয়েরা শুধু আমার জুতো পরিষ্কারের কাজে লাগতে পারে, বুঝেছ? আমার অসংখ্য র্গাল ফ্রেন্ড আছে তাদের নিয়ে আমি বেশ ছিলাম, বেশে আছি এবং বেশ থাকব ।বউয়ের অধিকার নিয়ে বিরক্ত করলে এর ফল ভাল হবে না ।আমি এই বাসা ছেড়ে চলে যাব তাহলে ।  যারা তোমাকে এ বাড়ীর বউ বানিয়েছে, তাদের কাছে থেকো ।

সুরমা কান্নায় কিছুই বলতে পারল না । ফুপিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগল ।

সায়েম আবারও বলল-  তুমি এখনও আমার ঘরে, তা আবার আমার খাটে বসে আছ? এই ঘরটা ফুল  দিয়ে সাজিয়েছে কে? (ফুলগুলো টেনে হেচড়ে ছিঁড়তে ছিঁড়তে) আমার শোবার জন্য ফুল     দিয়ে ঘর সাজানোর প্রয়োজন হয়না ।এয়ার-ফ্রেশনারই যথেষ্ট । যাও এক্ষুনি আমার ঘর থেকে দূর হও ।না হয় আমি যখন বের করে দেব তখন সিনক্রিয়েট করে বলত পারবে না যে আমি তোমার গায়ে হাত তুলেছি ।

সুরমা কেঁদে কেঁদে বলল- দোহাই তোমার আমাকে রাতটুকু তোমার ঘরে থাকতে দাও । আমি না হয় তোমার জুতা পরিষ্কারের পরিচারিকা হয়েই তোমার পায়ের কাছে থাকব । এই ফ্লোরে শুয়ে শুয়ে আমি জীবন কাটাব । তুমি শুধু সবার সামনে স্বামীর মিথ্যে অভিনয়টুকু করো । ঐ সব অভিনয় আমার দ্বারা সম্ভব নয় ।আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই নি। তাই স্বামীর অভিনয় করে কারও মন খুশি করার দায় আমার নয় । যারা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়েছিল তাদের বুঝিয়ে দেব মনের উপর জোর করার ফলটা কেমন ।ঠিক আছে, ফ্লোরে শোতে চাও শোও । তবে, আর কোন রাত যেন আমার ঘরে তোমায় না দেখি ।

কান্নায় কান্নায় সুরমার সারা রাত কেটে যায় । নেশাগ্রস্ত সায়েম বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে থাকে । প্রত্যূষে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সুরমা । তখনও বাড়ীর কেউ ঘুম থেকে উঠেনি ।মনে দারুণ জ্বালা দাউ দাউ করে জ্বলছে । পিতৃ-মাতৃহীনতার কষ্ট নতুন করে মনে জেগে উঠে ।চার তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে যায়।বাবা-মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে । অনেকক্ষণ পর একটা হাত তার কাঁদ র্স্পশ করলে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তার শ্বাশুড়ী কাঁদো কাঁদো নয়নে দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাশুড়ীকে দেখে কান্নার বেগ আরও গতি ফেল ।তাঁকে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কাঁদতে লাগলো ।শ্বাশুড়ী অনেক জোরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দু’হাত দিয়ে সুরমার দু’বাহু ধরে বললেন-

পাগলী কাঁদছিস কেন? দেখ চেয়ে, তোর বিয়ের সংবাদে তোর বাবা-মা কেমন  মিটি মিটি হাসছে ।এমন দিনে কাঁদতে হয়? আর শুন, বাবা-মার জন্য আর কাঁদিস

না । এবার আমাদেরকে বাবা-মার মত আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধর ।দেখবি, নিজেকে আর একা মনে হবে না । তাছাড়া, আমার বর্হিমূখী ছেলেটাকেও তো প্রেম দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ঘরমূখী করতে হবে। এই ছোট জীবনে দাম্পত্য জীবনের সুখ যত পারিস্ দু’হাত দিয়ে কুড়িয়ে নে ।

সুরমা চোখ মুছে তার জেঠীমা-বতর্মানে তার শ্বাশুড়ীর সাথে তৃতীয় তলায় চলে গেল ।নাস্তার টেবিলে সবার মত সায়েমও এল ।বাবা মাকে গুড-মর্ণিং জানিয়ে চেয়ার টেনে বসল ।সামনের চেয়ারটা তখনও খালি পড়ে আছে ।মামুন চৌধুরী বলে উঠলেন- কোথায় আমার বৌমা কোথায়? কই রে মা আমরা সবাই নাস্তার টেবিলে বসে গেছি ।

সুরমা রাতের কথা ভুলতে পারছে না ।যে স্বামীকে জুতা পরিষ্কার করার পরিচারিকার দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারই সামনে বসে খাবার খেতে বসার ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস তার হলো না । তাই মামুন চৌধুরীর পাশে এসে বলল- বাবা, আপনারা খান । আমার খেতে একটু দেরী হবে ।

সাবিহা চৌধুরী বলে উঠলেন- কিরে মা দেরী হবে কেন? না, না তোর কোন কথা শুনব না । এক্ষুনি আমাদের সাথে খেতে বস ।

সুরমা অপমানে, ঘৃণা আর ভয়ে একাকার হয়ে অবনত মস্তকে চেয়ারখানা টেনে বসল । তারপর ভীত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখে নিল স্বামীর প্রতিক্রিয়া । সায়েম একটু নড়ে চড়ে বসল । কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের মত করে খেয়ে উঠে গেল ।মা বললেন-‘ছেলেটা খাওয়া দাওয়ায় সব সময় কেবল তাড়াহুড়া ।’ সবাই তখনও নাস্তার টেবিলে ।সায়েম গেট-আপ হয়ে বেরিয়ে যাবে এমন সময় মামুন চৌধুরী বলে উঠলেন- দেখ, সাবিহা, তোমার ছেলের কান্ড দেখ ।বিয়ের পর দিন নতুন বউকে রেখে কেমন ঢেং ঢেং করে বেরিয়ে যাচ্ছে ।কোথায় যাচ্ছ তুমি?

সায়েম বাবার কথার জবাব না দিয়ে হন্ত দন্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ।তার মা সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন-  ছি! বাবা, বউমাকে বাসায় রেখে এভাবে বেরিয়ে গেলে লোকে কী বলবে আর বৌমারও মন খারাপ হবে । লোকে কি বলল না বলল এত কিছু ভাবার মত সময় আমার নেই ।আর তোমার বৌমার নিকুচি করি ।তার মনের খবর তোমরাই রেখ । আমার ঐসবে আগ্রহ কিংবা মাথা ব্যথা নেই ।এবার আমায় যেতে দাও।

সায়েম হন্ হন্ করে গাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল ।সুরমা নাস্তার টেবিল থেকে দৌড়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে গেল ।দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগল । পিছন পিছন মামুন চৌধুরী এবং সাবিহা চৌধুরীও গেলেন। তাঁরা দরজা খোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করলেন; ভিতর থেকে কিছুতেই কোন সাড়া পাচ্ছিলেন না। তাঁরা দু’জনেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন ।এমন সময় ভেতর থেকে সুরমার গলার আওয়াজ ভেসে এল- মা, বাবা তোমরা চলে যাও । আমি এখন বিশ্রাম নিব ।

মা, শোন দরজা খোল । তোর বাবার অবস্হা তো জানিস । দুই দুই বার স্ট্রোক করেছে ।আমাদের চিন্তার মধ্যে রাখিস্ না, মা । প্লিজ, মা দরজাটা খোল ।

সুরমা দরজা খুলে দিল ।মামুন চৌধুরী সুরমাকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন । আর বললেন- মারে, আমরা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে যেয়ে তোর জীবনটা পুরোপুরি শেষ করে দিলাম । ভেবেছিলাম, সায়েমের সাথে তোর বিয়ে হলে তুই যেমন আমাদের  ঘরেই থেকে যাবি তেমনি সায়েমকেও বশে আনা যাবে ।আমাদের ক্ষমা করে দিস্ মা ।এতিমের এই সবর্নাস আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন কিনা জানি না – এই বলে সুরমাকে ছেড়ে দিয়ে তিনি ওয়ারড্রবের উপর মাথা রেখে কাঁদতে থাকেন ।

সাবিহা চৌধুরী দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন ।সামনে এগিয়ে এসে সুমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- মাগো, প্রথম রাতে মেয়েরা অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকে । সেই ঘর থেকে তুই যে শূণ্য হৃদয়ে বের হয়ে বাবা-মায়ের ছবির নিকট দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছিলি তখনও আমি বুঝতে পারিনি । আমি ভেবেছিলাম, তুই তোর সুখের আনন্দ বাবা-মায়ের নিকট ভাগ করতে এসে আবেগে আপ্লুত হয়ে এভাবে কাঁদছিলি ।তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার অবস্হা্ও যে আমার নেই ।

সুরমা নিজের চোখ মুছে শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চোখ মুছতে মুছতে বলল- তোমরা তো আমার কোন ক্ষতি করনি । এতিমকে তোমাদের স্নেহ-ছায়াতলে চীরকালের মত যে ঠাঁই দিয়েছ-তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ ।আমার কষ্ট শুধু-আমার হতভাগ্য জীবনের সাথে জড়িয়ে তোমার ছেলের সুন্দর জীবনটা টানাপোড়নের মধ্যে পড়ে গেল ।তোমরা শুধু শুধু আমার জীবনের কথা ভাবছ । অথচ একবারও তোমার ছেলের জীবনের কথা ভাবনি ।

মামুন চৌধুরী বললেন- ওর জীবন তো সব সময়ই এলোমেলো ।সেই এলোমেলো জীবনে তোরে জড়িয়ে তোর জীবন আঁধারে ডুবিয়ে দিলাম ।

—আমার কোন দু:খ নেই । তোমাদের পাশে তো থাকতে পারব । এমন যদি হতো সায়েমের পরিবর্তে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে হতো আর আমার ভাগ্যটা

এমনি হতো, তখন দৌড়িয়ে কী তোমাদের কাছে আসতে পারতাম? তোমাদের  মত কে আমায় এভাবে আদর, স্নেহ দিয়ে শান্তনা দিত ? আমার নিয়তি

আমি মেনে নিয়েছি, তোমরাও মেনে নাও ।দেখ, জোর না করে ওকে ওর মত চলতে দাও, কোন দিন ঘরমূখী হয় কিনা –তার প্রতিক্ষায় তেমরাও থাক,

আমিও থাকব ।

সপ্তাহ খানেক র্পূবে সুরমা লেকচার পোষ্টে এ্যাপোয়েন্টম্যান্ট লেটার রিসিভ করে ।পনের দিনের মধ্যে কমর্স্হলে যোগ দেওয়ার কথা । বিষয়টি নিয়ে সুরমা তার শ্বশুর, শ্বশুড়ীর সাথে আলাপ-আলোচনা করে- বাবা, মা তোমরা তো জান আমাকে আগামী সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করতে হবে । তোমরা যদি অনুমতি দাও তাহলে ১নভেম্বরে আমি জয়েন করতে চাচ্ছি ।

মামুন চৌধুরী বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই জয়েন করবে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করবে সেটা অবশ্যই আনন্দের এবং গর্বের বিষয় । তার চেয়ে জরুরী হলো তোমাকে কোন না কোন কাজে মনোনিবেশ করা ।বাসায় থেকে সারাদিন অবহেলা, বঞ্চনার কষ্ট পুষে পুষে বড় ধরনের একটা রোগ বাঁধিয়ে বসবে । কাজের সাথে সাথে মেন্টাল রিলিফ পাবে ।ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে, কলিগদের সাথে যতটুকু সময় কাটিয়ে আসবে ততটুকু সময় অন্তত: ভাল থাকবে।অন্যদিকে, সায়েম তোমাকে যতটা র্দুবল মনে করে ততটা র্দুবল আর ভাবতে পারবে না।সুরমা সাবিহা চৌধুরীর সিদ্ধান্তও জানতে চাইল । তিনিও সহমত প্রকাশ করলেন ।

(চলবে)

Word Converter-1

স্যান্ডি নিলমের মত মেঘ সাজো

আলমগীর সরকার লিটন

perfect-storm-377x285

কি সুনামি কি স্যান্ডি তবে কি নিলম

মেঘে মেঘ সাজো ভেসে বেরাও এ খানে,

ধূসর সন্ধ্যা তারা ঘুমহীন শেষপ্রহরের

তারা মিটমিট করে জ্বলছে দেখো না ঐ।

এই যমুনার নিস্পন্দ হওয়া ঢেউ সাজো

যে ঢেউ এসে লন্ডভণ্ড দুমরে মুঝরে দিয়েছে

ধু ধু কোন চরের ধুলিতে উড়ছে উড়ছে,

সেই উড়ন্ত একবিন্দু ধূলি যদি উড়ে যায়

ঐ গাঁয়,গাঁয়ের মেঠো পথের বুক জুড়ে

ফুটে থাকা নয়তো ঘাস ফুল নয়তো শিশির

ভিজা টলমল গোলাপের পাপড়িতে।নিঃসঙ্গ

তারা বলছে সবি তো রয়েছে ও খানে,

সেখানে নাকি সুখ শান্তি আর আনন্দ বয়ছে।

শুধু প্রভাতের সূর্য উঠার মত,হ্যা এখানে

স্যান্ডির হাওয়া নিলম সুনামির ঝরছে ঝরছে

কখন তীব্রবেগে কখনো হিমশীতল একটু

উষ্ণতা নেই তবুও শত বছরের পর বছর

অপেক্ষা করা উজ্জ্বল নক্ষত্রের পাই দেখা ।

download

তোমাকে শোনাব যে আলাপ

প্রফুল্ল রায় সদাশিত

81804

তোমাকে শোনাব যে আলাপ নিত্যান্ত আপন করে

নির্ভেজাল চেনা শব্দ গুচ্ছে যা শিরা- উপশিরায়,

মাতৃত্বের গর্ভাশয়ে কিংবা ভূমিষ্ঠে, জন্মের পরে

তীব্র কাহা … কাহা ধ্বনি গুচ্ছে, ঘুমে আধো জাগায়

মায়ের সোহাগী বুলিতে ঐ শিল্পীর রং তুলিতে

বোবা মনের ইশারায় আবেগময় অনুভূতিতে

বিলাসী হাসি – কান্নায়, ভালবাসা, মান- অভিমানে…

তুমি আমি নিত্য দিন ভাবি, মুখে বলি, আগামীর পথে চলি

কিংবা ঠাট্টা – হিংসায় গেয়ে যাই বিটকালের পদাবলী

মন জয়ী সুর তালে গীতি কথায়, শিল্পীর গানে………

কথা, গান, মান- অভিমানী সুরে

যেখানে ভিজে তোমার আমার দেহ মন

অস্তিত্বের শেকড় সমস্ত খুঁড়ে।

oooi

সমুদ্রের মত

আজিম হোসেন আকাশ

ffff

তুষার গলা নিথর সমুদ্রের মত

কেবলই নি:সরণ সারাদেহে;

স্বপ্নের বিভোরে কামনার স্রোতে

বার বার ভেসে যাই প্রতিরাতে নি:শব্দে।

কেমন করে বিছিয়ে দেয় নারী

সমস্ত অস্তিত্বের কোমল বিছানা;

কি নিপুণ কারুকাজে সজ্জিত অঙ্গ

বাহুর ভাঁজে লুকানো অজানা রত্ন

শিকারীর হয় না মিস নিশানা।

প্রেম দিয়ে পারে বিনোদিনী নারী

সব কিছু রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিপূন মিলাতে;

তবু কেন যেন মনে হয় অলীক

তাবৎ স্বর্গসুখ-যেন স্বপ্নাক্রান্ত ছোট্ট

জীবনে ভাঙ্গা কাঁচ তুলে আনা দু’হাতে।

বস্ত্রহীন শরীরে, তৃষিত ঠোঁটের উন্মুক্ততা

আর কত বাসনার সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা;

হৃদয়ের অবরুদ্ধ দরজা খুলবে আর কত

প্রতিরাতে যুগলডোরে নিভৃতে-নির্জনে,

নারী দেহ খুঁজবে আর কত সুখ সম্ভোগে-

কোন যাত্রায় হবে শেষ তার আনমনে।

b

স্মৃতির পাতা

আলেয়া আক্তার আলো

150488

জানি, আসবেনা ফিরে

তবু বসে আছি তোমার প্রতীক্ষায়

দিনের আলোয় রাতের অন্ধকারে

মনের দরজা খোলে

খুঁজে বেড়াই স্মৃতির আবাস

কী পেলাম, কি না পেলাম

হাজার যুক্তিতে নাইবা খন্ডালাম

তোমার স্মৃতির পাতা

তুমি যদি দাও আমায়

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্যথা

আমি মনে করবো-

দিয়েছো আমায় শ্রেষ্ঠ উপহার

কেন আসবেনা তুমি বলে দাও

অপরাধ করেছি আমি তোমাকে ভালোবেসে

তার ক্ষমা কি কখনও পাবো না আমি ;

তুমি নাইবা করলে ক্ষমা আমায়

আশাবাদী-তুমি একদিন ফিরে আসবে

তুমি এসে বলবে-পরিচিত

খুলে দাও তোমার বন্ধ দরজা

আমি ফিরে এসেছি তোমার কাছে।

k6185671

শূন্যতা

কিশোয়ারা সুলতানা শিলা

love_quote-13483

কীসের যেন ছায়া অনুভব করি

ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে সারাবেলা

নিজেকে সামলাতে মিথ্যে স্বপ্নের প্রাসাদ গড়ি

চারিদিকে বিশাল শূণ্যতা নিয়ত কুরে কুড়ে খায়

সাপের বিষজ্বালা অনন্ত জ্বলে

কেউ বুঝেনা ; বুঝতে চায় না

সুখ কোথায় কে জানে

কেবলি সীমাহীন কষ্টের নীলে ভাসি

সুখের প্রাচীরের ভেতরে দারুন হতাশা

মুছে ফেলতে চাই জীবনের গ্লানি

স্রষ্টার কী নিদারুন বিধান মানতেই হয়

প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না গোণা

একদিন হয়ত চলেই যাবো হৃদয় ভরা আক্ষেপ নিয়ে

বন্ধ হবে চিরতরে হৃদয়ের দুর্বার চাওয়া পাওয়া।

Word Converter-1

বিজয়ের শপথ

সাবরিনা আহমেদ চায়না

বায়ান্ন একুশ এর গল্প শুনেছি মায়ের মুখে

একাত্তর যুদ্ধে ভয়াবহ প্রহর কেটেছে প্রিয়জন হারিয়ে

বুকের রক্ত দিয়ে বর্ণমালার রাখলো যারা মান

তাদের কথা ভুলে সবাই দেশকে করতে চায় অসম্মান

বাংলা মাগো আর কতকাল বলো আর কতকাল

থাকবো বিজয়ের পথ চেয়ে…

শত মায়ের আঁচল ভিজে আজও চোখের নোনা জলে

যাদের বুকের তাজা রক্তে ভেসেছিল রাজপথ

একুশ এলে সাজ সাজ রব সেই সব পথ

ইতিহাসের সত্য কথাটি হলো না আর লেখা

ফেব্রুয়ারির বই মেলাতে এলো না সে কথা

বাংলা মায়ের রক্তের ঋণ যায় কী ভুলে থাকা

বায়ান্ন একুশ একাত্তর ঘুরে এসেছে স্বাধীনতা

বিভেদ নয় যুদ্ধ নয় নয় হানাহানি

বাঙালীর বিজয় পতাকা যুগে যুগে

উড়বে বাধাহীন নীলিমায়

এ শপথে কাজে কর্মে এগিয়ে আমরা যাবোই

এসো তবে সংগ্রামীরা একসাথে হই আগুয়ান।

 download

ডিসেম্বর মানে অহংকার

আলী মুহাম্মদ লিয়াকত

 

রাঢ় কিংবা মাগধি নয়

পালি অথবা প্রাকৃত নয়

শুদ্ধ বাংলায় উচ্চারিত

আন্দোলনে বিস্তারিত

উর্দি থেকে উর্দু নিয়ে

আরবী হরফে বাংলা দিয়ে

ধরাকে জ্ঞান করলে সরা

এদেশে চাষ যাবে না করা

সোনার বাংলা সোনার মাটি

বাংলা ভাষা মায়ের খাঁটি

রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই

এছাড়া বিকল্প নাই

 

শোষক শাসক পাকি-পোঁকা

বুঝলো এরা খাবে না ধোকা

ঝাঁকে ঝাঁকে ছুড়লো গুলি

উড়িয়ে দিল ছয় ছ’ খুলি

ভার্সিটির ঐ সবুজ ছায়ায়

ঘুমিয়ে গেল মায়ের মায়ায়

পলিমাটি রক্ত সারে

রোপিত হলো পথের পারে

 

একটি মাত্র বীজ যার নামটি স্বাধীনতা

বায়ান্নর সেই বিদ্রোহে রচিত হলো কাব্য-গাঁথা

ধীরে ধীরে অংকুরিত পত্র পল­বে বিকশিত

একাত্তরের সাতই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে

শেখ মুজিবের বর্জ্রকণ্ঠে একটি মাত্র ভাষণে

ঘোষিত হল একটি কথা

আর কিছু নয় স্বাধীনতা

বাংলার দামাল কামাল ছেলে ভয় ভীতি সব পিছু ফেলে

যুদ্ধে গেল শপথ নিলো পাকি সেনাদের করবে শেষ

গড়বে স্বাধীন বাংলাদেশ

 

নয় মাস ধরে মার খেয়ে, পাকি-পোঁকা হয়রান হয়ে

শেষ রক্ষা করলো তাদের হাতিয়ার ঢাল দিয়ে

মায়ের কোলে ফিরলো খোকন বিজয় হাসি নিয়ে

তোমার আমার অহংকার বিজয়ের মাস ডিসেম্বর।

পাহারা

গিয়াস উদ্দিন চাষা

wwim

যখন

বাংলাদেশ ঘুমায়

তখন

রাত্রি জেগে জেগে কবিরা

কবিতা লিখে লিখে

শব্দ আর উপমা এঁকে এঁকে

পাহারা দিয়ে রাখে

বাংলাদেশকে।

default

এখনও অপেক্ষা

মোঃ দেলোয়ার হোসেন রাতুল

images

তুমি আসবে বলে

সেই কবে থেকে অপেক্ষা আমার

মোহমায়া কামনার নদী

প্রতিক্ষণ খরতর হয়

স্বার্থের দ্বন্দ্ব, হিংসা দ্বেষ

ক্ষমতার অহমিকা সুন্দর সত্ত্বাকে

বিভ্রান্ত করে, বিচ্যুত করে চলমান গতি

অন্ধকারের কালো থাবা

ছুঁয়েছে সমাজ

অনাচার মিথ্যাচার ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে

বিশুদ্ধ বিবেক

প্রলুব্ধ মন ভেসে যেতে চায়

ত্যাগের মহিমা বিলুপ্ত করে

অপেক্ষায় আছি

তুমি এলে নতুন করে জ্বালাবে আলো

ঘুমন্ত বিবেক শাণিত হবে

অধিকার ফিরে পাবে বঞ্চিত পৃথিবী

সত্যের মহিমা বিকশিত হবে

শান্তি সাম্যে ভরে ওঠবে পৃথিবী আবার

পরমাত্মার সম্মিলনে জেগে ওঠবে অনন্ত আত্মা

তুমি এসো-

তোমার জন্য সেই অনাদি থেকে

এখনও অপেক্ষা আমার।

ggg

আড়াল হয়ে থাক

ডাঃ নাসিম জাহান নীনা

কার যেন অস্পষ্ট অবয়ব ছিল

ছোঁয়া যায়নি

কার কিন্নরী কণ্ঠস্বর বোঝা যায়নি

কে কুড়ায় ভোরের শিউলি

তারে দেখা যায় না

আড়াল হয়েই থাকা তার স্বভাব

কার নূপুরের ধ্বনি

বেজে বেজে যায় আচমকা

তারেই খুঁজে ফিরি

তার প্রতিধ্বনি পাহাড়ের উপত্যকায় শোনা যায়

মেঘবতী দিনে নিষাদের সুর হয়ে বাজে

আমার আত্মায় ছল করে যায় বার বার।

durchai-dhuttoree-chai_1

চটুল ছন্দে লেখা শাহ আলম বাদশা’র শিশুতোষ মজার ছড়ার বই এখন অনলাইনে! পড়ুন আর মজা উপভোগ করুন।

বইটি পড়তে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন–দুরছাই ধুত্তোরী ছাই!

ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। নবম সংখ্যা।। অক্টোবর/২০১২ ঈসাব্দ


ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত।

লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ
krondosee@yahoo.com

আমরা অনেকেই কথা বলি বেশী কিন্তু কাজ করি কম। অথচ আমাদের জীবনে করার মতো কাজের যেমন শেষ নেই তেমনই আমাদের আয়ু খুবই অল্প?

মানে দাঁড়ালো এই যে, আমাদের স্বল্পায়ুর মধ্যেই কাজ করে যেতে হবে অনেক, নিজেদের সব দায়দায়িত্ব আমৃত্যু সম্পন্ন করতে পারি আর না পারি চেষ্টাতো করে যেতেই হবে!

নতুবা পরকালে কী জবাবদিহি করবো স্রষ্টার কাছে? দুনিয়াতেই যখন জবাবদিহির শেষ নেই–তখন অমানুষের মতো পশ্বাচারকে আঁকড়িয়ে ধরে চলে-ফিরে এই সুন্দর দুনিয়াটাকে কলুষিত করার মাধ্যমে পরকালের নিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছার পর; কী থাকবে আমাদের আত্মরক্ষার উপায়, সেটাও একবার ভাবি!!

তাই চলুন, আমরা প্রতিদিন অন্তত একটি করে ভালো কাজ করি এবং নিজেদের জীবনকে সাজাই প্রকৃত মানুষের মতোন করে!!  

পরিশেষে, কাজী মোতাহার হোসেন এর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হলো, আমরা তাঁর পরকালীন শান্তি কামনা করি। 

কবি জালাল উদ্দিন রুমী 

তানভীর সজিব

রুমীর জীবন এর সুচনাকাল :

রুমীর পৃথিবীতে আগমনের সময়টা ইতিহাসের খুব একটা ভালো সময় নয় । একদিকে খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড অভিযান, ইউরোপের পশ্চিম অংশ থেকে আনাতোলিয়া উপদ্বীপ পেরিয়ে সর্বত্র আছরে পরছে । পূর্ব দিক থেকে দুধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী । এমন এক সময় মানব আত্বার মাঝে সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতী, সান্নিধ্য সৃষ্টিকারী মহান প্রেমিক জালাল উদ্দিন রুমীর জন্ম ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে সেপ্টেম্বর।

১২০৭ সনের ৩০ শে সেপ্টেম্বর রুমী জন্ম গ্রহন করেন বলখ শহরের নিকটস্থ একটি স্থানে যা বর্তমানে আফগানস্থানের একটি অংশ । রুমীর ছিলেন ইসলামি ফিকহ, ধর্ম ও সুফীবাদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে ধারক এক বংশের অধিকারী । তার পিতা বাহউদ্দিন ওয়ালাদ এর লিখিত একটি বই মারিফ (আত্বা কে ভালোবাসার কথা ) যা থেকে রুমী অত্যন্ত অনুপ্রানিত হয়েছিলেন । রুমীর তরুন বয়সেই তার পরিবারকে তখন বলখ থেকে পালাতে হয় কারন ইতিহাসের আরেক ভিলেন চেঙ্গিস খান ধেয়ে আসছে তার শহরের দিকে । রুমী ও তার পরিবার প্রথমে দামেশকে ও পরে নিশাপুরে যান । সেখানে রুমির সাথে সাক্ষাত ঘটে কবি ও শিক্ষক ফরিদউদ্দিন আত্তারের সাথে । তিনি কিশোর রুমির মধ্যে বিরাট আধ্যাত্বিক চেতনা দেখতে পান। বাহাউদ্দিন এর পেছনে রুমিকে দারিয়ে থাকতে দেখে ফরিউদ্দিন বলেন একটি সাগর আছে আর তাকে অনুসরন করছে একটি মহাসাগর । তিনি রুমীকে একটা একটা গ্রন্থ উপহার দেন , ইলাহিনামা (আল্লাহর গ্রন্থ)

বেশ কিছুদির পর রুমির বিশোর্তিন্নো বয়সে তার পিতা ইন্তেকাল করেন । রুমী তার পিতার দায়িত্ব তথা মুরিদদের আত্বার বিকশের সাথে জরিত বিভিন্ন বিষয়, ধর্মতত্ব, কবিতা , সঙ্গীত এবং বিভিন্ন ইসলামি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন । শিঘ্রী তার ক্ষ্যাতি ছরিয়ে পরে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দশ হাজার ছাত্রের সমাবেশ ঘটে । রুমীর পরিচালিত দরবেশ সুফি তরিকার লক্ষ্য ছিল আত্বাকে উন্মোচন, মিলনের রহস্য আবিস্কার। তার এসব অনুশিলন করতেন গান, কবিতা, ধ্যান, নিরবতা , কাহিনী , সংলাপ এর মাধ্যমে । রুমী ইসলামে বিষয়ে মস্ত বড় পন্ডিত ছিলেন । তার রচিত কো্রানের তাফসির, অনুবাদ , ব্যাখ্যা আজো পঠিত হয় ।

 সুফী রুমীর নতুন করে নিজেকে চেনা :

১২৪৪ সালে রুমীর জিবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন একটি সাল । এ বছর তার প্রিয় ব্ন্ধুর সাক্ষাত পায় রুমি । সে আর কেউ না সামশেদ তাবরেজ । যার কারনে রুমীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুফিতে পরিনত করেছে । তাবরেজ ছিলেন একজন দরবেশ । যাকে অনেকেই ড্যান্সিং দরবেশ বলে থাকেন কেননা সে রাস্তায় নেচে নেচে আল্লাহর জিকির করতেন । লোকো তাকে নেহায়েত পাগল বলে মনে করত এমনকি প্রথমদিকে রুমী নিজেও । তাবরেজ এর মাঝে এমন কিছু পেয়ে যায় যা সে এতো দিন খুজে বেরাচ্ছিল । এদিকে এতজন বদ্ধ পাগলের সাথে রুমীর এই সক্ষ্যতা দেখে মানুষজন বলাবলি করতে লাগল রুমি নিজেই হয়ত পাগল হয়ে গেছে ।অনেক গ্রন্থে তাবরেজের সাথে রুমির পরিচয়ের বিভিন্ন বিবরন পাওয়া যায় : কেউ বলে রুমী একদিন মুরিদদের নিয়ে তার পিতার মা রিফ পড়ে শুনাচ্ছিলেন। এমন সময় তাবরেজ এসে তার হাত থেকে গ্রন্থ নিয়ে পানিতে ফেলে দেয়ে । তখন রুমি বলে আপনি কে ? কি করছেন এসব ? তখন তাবরেজ বলে তোমার এসব আর পড়া ঠিক হবোনা। কিছুক্ষন পর তাবরেজ রুমিকে পানি থেকে কাগজগুলো তুলে রুমীর হাতে দিলেন যা কিনা সম্পূর্ন শুকনা ঝরঝরা । রুমি তখন বলে ওগুলো ওখানেই পরে থাকুক । এই পরিত্যাগের মাধ্যেমে রুমি নিজে ধর্মিয় গুরু পেশা বাদ দিয়ে তাবরেজের কাছে বায়াত নিতে চায়। তাবরেজে তাকে বলে আমার কাছে বায়াত নিতে হলে তোমার আমার কথা শুনতে হবে যা তুমি করতে পারবে না । আমার কথা না মানলে তোমাকে আমি বায়াত হিসেবে নিতে পারবনা । রুমী সব মানার কথা বলে । তাবরেজ আরো ভাবতে বলে তাকে । বহু ঘটনার মধ্য দিয়ে রুমীর সাথে তাবরেজের বন্ধুত্ব হয়। তাবরেজ সম্পর্কে রুমির একটি কবিতার বাংলা হলো :

  সমস্ত কিতাব গ্রন্থ যা আছে সব নদীতে ফেলে দাও ওখানে আল্লাহ নেই আল্লাহকে পেতে হলে সামশেদ তাবরেজের কাছে যাও

  এভাবে আস্তে আস্তে রুমীর আর তাবরেজ এর ঘনিষ্ঠতা বারতে থাকে আর রুমির সমস্ত রহস্যের জট খুলতে থাকে। সে নিজেকে নতুন করে চিনতে শুরু করে।

  রুমীর কবিতার দুটি ধারা ফানা আর বাকা , দুটি আরবি শব্দ ।সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের যথাক্রমে খেলা ও ব্যাবচ্ছেদ এর ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়েছে। ফানা হচ্ছে একের ভিতরে আরেকজনের লীন হওয়া । একের অস্তিত্তের ভিতরে নিজেরটাকে হারিয়ে ফেলা ।যেমন সরাই খানায় মাতাল বলে উঠে যে আমাকে এখানে এনেছে , সেই আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। আগুন ঘিরে উড়াউড়ির পর পতঙ্গ স্বয়ং আগুনের শিখিয় পরিনিত হওয়ার পর পশ্ন করে মোমবাতির শিখায় এমন কি ছিল যা আমায় শিঘ্রি গ্রাস করে নিল ?

বাকা দরজা পেরিয়ে ভিন্ন পথ । আরবিতে বাকার ভিন্ন অর্থ আছে । ভিতরে একটা অস্তিত্ব । বাকা এমন একটি অবস্থান সব সময় আরেকজনকে অনুভব করা । যার সাথে ফানা তার সাথেই সে সব সময় বাকা অবস্থায় থাকে । রুমীর কিছু রহস্যে ঘেরা সংলাপে থেকে কিছুটা দেখা যায় :

বাকা বলছে :

বন্ধু আমাদের ঘনিষ্টতা হচ্ছে

যেখানেই তুমি তোমার পা রাখবে

পদতলে দৃঢ়তার মাঝে

আমাকেই অনুভব করবে

ফানা বলছে :

এ কেমন প্রেম

আমি তোমার অস্তিত্ব দেখছি

তোমাকে নয় ?

বাকাকে বিবেচনা করা হয় রুমির বসন্তকালের কবিতা হিসেবে ।

সদা উপস্থিত সবুজ, সজিব সুন্দর ।

এক সাথে থেকো বন্ধুরা

বিক্ষিপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো না।

জেগে থাকার জন্য আমাদের বন্ধুত্ব

রুমী তার জীবনের শেষ বারোটি বছর ধরে একটি সুদীর্গ ধারাবাহিক কবিতা মসনবী রচনা করেছেন । চৌষট্টী হাজার লাইন বিশিষ্ঠ কবিতাটি ছয় খন্ডে বিভক্ত । বিশ্ব সাহিত্য এর সমতুল্য আর দ্বীতিয়টি নেই । অস্বাধারন একটি কাব্যগ্রন্থ । । এটি বহু বিষয়ে ঘিরে স্ফিত হয়ে উঠা একটি কাব্যগ্রন্থ ।কোথাও আত্বার মধ্যকার কথা বার্তা, কোথাও কিছুটা রসিকতা কোথাও কোরানের আয়াতের ব্যাখ্যা । রুমীকে নিয়ে নিয়ে বহু গবেষকদরে মধ্যে আমেরিকান কবি কোলম্যান বার্কস মসনবী নিয়ে বলেছেন “এ এক এমন এক প্রবাহ যার আনন্দ থেকে নিজেকে বিরত রাখা কঠিন । মসনবীর কোনো সীমা পরিসীমা নেই “

 রুমির বাসররাত

১২৭৩ সনের ১৭ ই ডিসেম্বর ঐ দিন পৃথীবি জুরে রুমীর মৃত্যুবার্ষীকি পালিত হয় । সুফীরা বিশেষ করে তাসাউফ পন্থিরা তাকে উরস বলে । উরস বা বাসরের রাত । সৃষ্টিকর্তার সাথে রুমির মিলনের রাত ।

আমি সেই প্রেমিকের সাথে আছি

যে দুই পৃথিবীকে একটি হিসেবে দেখেছে ।

এবং সেই একটিকেই জেনেছে

প্রথম, শেষ বাহির ও ভিতর বলে

এটাই কেবল মানুষের নিশ্বাস ।

[পুনশ্চ : পুরো লিখাটা দিতে আমার কোলম্যান বার্কস এর রুমীকে নিয়ে লেখা The Sole of Rumi বই থেকে সাহাজ্য নিয়েছি । কিছু জিনিস আগে থেকে জানতাম । কিছু নেট থেকে । কোলম্যান বার্কস যে বছর বইটা বাজারে বের করেন ঠিক সে বছরি নাইন ইলেভেন এর ঘটনা ঘটে, এতো কিছুর পরেও রুমিকে নিয়ে লেখা তার গবেষনা প্রকাশনীটি খোদ ইউ এস এ তে বই টি বেস্ট সেলার নির্বাচিত হয়। রমী কবি হিসিবে ইউরোপ এ্যমেরিকা সহ বহু দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। আমাদের নজরুলকে অনেক কাঠমোল্লা পছন্দ করেনা কারন সে একাধারে ইসলামি সঙ্গীত আবার সেই সাথে শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন, রুমি প্রায় ৮০০ বছর আগেও একি কাজ করে গেছেন তার কবিতাতে খ্রীস্টধর্মের বিভন্ন দিক নিয়ে কথা বার্তা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় সাম্যবাদ ।]

মনঃসমীক্ষণ

প্রফুল্ল রায় সদাশিত

(ক)    

অস্তমিত সূর্যের হাতছানি সে তো অন্তিম কথা নয়

বন্ধু বন্ধুত্ব অন্তরলীন তাতেও আলো আঁধারের খেলা

কালো বেলা ভালো বেলা আলো দেখায় ভরের সূর্যোদয়

হিসেব মেলে ঘুমেসিক্ত বা ঘুম ভাঙ্গা রাতের রাঙা  চাঁদে

বাস্তব অবাস্তবের মধ্যরেখায় , বিস্মৃতির শয্যায়

 

জল ঠেলে সদ্য ডুবা ডুবি  খেলে সাঁতারে ধায় অতীতে

হা – ডু- ডু কিংবা ছেলে খেলাচ্ছল কর্মে মরে আবার জন্মে

নতুন খেলা শুরু হলেও গন্তব্য ভবিষ্যৎ গুদামে।

 

শরীর মন তত্ত্বে যাপিত জীবন ত্রিতাপ জ্বালায়

দিন বদলের শপথ  মুখ পুড়ে কালের দ্রাঘিমায় ।

 (খ)

জনতার চোখে সবুজ প্রত্যাশার নীল ঢেউ ভাবায়

অর্জিত স্বাধীনতা বদ্বীপ জুড়েই নাটাইয়ে বাঁধা

রঙিলা ঘুড়ির মতো আহত মন উড্ডীন ।

 

দিন বদলের লাটিম ঘোরে দিন ও রাত্রির চাকায়

পুঁজিবাদ অবমুক্তাঙ্গনে  কালের কৃষ্ণ প্রেমী রাধা

জটিলা কুটিলারে ফাঁকি সেটাও বড় কঠিন ।

বাজার ভাবনা

আবুল বাশার শেখ

 

সকাল বেলা বউটা বলে

বাজার করা লাগবে,

তা না হলে ছেলে-মেয়ে

না খেয়ে সব থাকবে।

কি আর করা ব্যাগটা হাতে

বাজার পানে যাওয়া,

দ্রব্যের দাম আকাশ চূড়ায়

হায়রে খাওয়া দাওয়া!

বাজার এখন বেজায় গরম

লাগামছাড়া ঘোড়া,

মধ্যবিত্তে কিনবে কি আর

কপালটাই তো পোড়া।

বেতন যা পায় তা দিয়ে

টানা টানি অবস্থা,

অর্থমন্ত্রীর এসব নিয়ে

নেই কি কোন ব্যবস্থা!

দেশ দরদী যারা আছেন

তারাও একটু ভাবুন,

নীতি কথা নয় বাস্তবতায়     

এবার একটু নামুন।

রম্যরচনা

রসুলপুর গ্রামের ওয়াজ-মাহফিল

ডা.সুরাইয়া হেলেন

রসুলপুর গ্রামের মিয়া সাব ভাবিয়া দেখিলেন, এই যে কয়েক বৎসর যাবৎ অনাবৃষ্টি, খরা, নয়তো অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছবাস ; এরূপ প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার গ্রামটিকে বিরান ভূমিতে পরিণত করিয়া তুলিতেছে। তাহার মূলে অনাচার-পাপাচার দায়ী। ইহাছাড়া পূর্বে গ্রামেগঞ্জে ম্যালেরিয়া, কলেরা, বসন্তে মানুষ মরিয়া সাফ হইতো! এখন সে স্থান দখল করিয়াছে ডেঙ্গু, এইডস নামক মারণব্যাধি! ডাক্তার-বৈদ্য কী করিবে? ঔষধের সাথে সাথে তদবিরেরও প্রয়োজন আছে। তাছাড়া ঘরে ঘরে রঙিন টি.ভি.,ডিস, ভি.সি.আর এসবের বদৌলতে বেলাজ বেহায়া নারীপুরম্নষ একযোগে আধা-নেংটা আওরতদের বেগানা পুরুষের সাথে উদ্দাম নাচ-গানসহ সিনেমা, নাটক উপভোগ করিতেছে! আল্লাহর গজব এই গ্রামে নামিয়া আসিবে নাতো কি বেহেশতের নহর বহিবে?

          

তিনি গ্রামের মুরুব্বীদের ডাকিয়া এক ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করার কথা উত্থাপন করিলেন। হুজুর মোহাম্মদ আহাম্মদ আবদুলস্নাহ কাশিমপুরী ইবনে মুক্তাদির-আল-ইমরান বড়ই নেকবখত, কামেল,আল্লাহর পেয়ারা বান্দা। যতবড় নাম, ততবড় কামেল! শোনা যায় তাঁর ১২টি পালা জ্বিন সবসময় তাঁহার পাহারায় থাকে। এর মাঝে সর্দার হলো, কীসমত জ্বীন! এই কীসমতের অসাধ্য কাজ এই পৃথিবীতে কিছুই নাই, তার অগম্যও দুনিয়ার কোন স্থান নাই! হুজুরকে রাজি করাইয়া এই গ্রামের নারী-পুরুষদের উদ্দেশ্যে ওয়াজ-নসিহত করাইতে পারিলে ,তাহারা সঠিক পথে আদব-লেহাজের সাথে চলিলে, এইসব গজব হইতে আল্লাহ নিস্তার দিতে পারেন। সকলেই মিয়ার বেটার সাথে একমত হইলেন ।

         

আগামী শুক্রবার বাদ জুম্মা, মসজিদের সামনের ময়দানে শামিয়ানা টানাইয়া মাহফিলের স্থান নির্ধারন করা হইলো। সম্ভ্রান্ত নারী-পুরুষদের জন্য উচ্চস্থানে পর্দা টানাইয়া পৃথকভাবে বসিবার ব্যবস্থা করা হইলো। নিমনবিত্তদের জন্য  সামনে পাটি পাতিয়া স্ত্রী-পুরুষ একইস্থানে কিন্তু ডানদিকে পুরুষ ও বামদিকে স্ত্রীলোকদের স্থান নির্দেশ করা হইলো! ১০মাইল দূরের  মধুপুর মাদ্রাসায় লোক পাঠাইয়া হুজুরের অনুমতি আদায় করা হইয়াছে।

          

 মাহফিলের দিন জুম্মার পর সারাগ্রাম ভাঙিয়া এমনকি পাশর্ববর্তী গ্রাম হইতেও লোকজন আসিয়া, মানুষে মানুষে ময়দান পরিপূর্ণ হইয়া গেলো! একটা উৎসব উৎসব ভাব! অবস্থাপন্নরা পরিষ্কার পাজামা পাঞ্জাবি, আতর-টুপি আর তাহাদের নারীগণসহ মাহফিলে আসিলেন। গরিব দিন-মজুর শ্রেণীর পুরুষরাও লুঙ্গি-টুপিসহ সবচেয়ে ভালো জামা গায়ে উপস্থিত হইলো! নিম্নবিত্ত মহিলারাও  তাহাদের তোলা ভাল শাড়িটি পরিয়া আসিল।

          মিয়া বাড়ির বান্ধা কামলা ও দাসী করিমের বাপ, করিমের মা ও হুজুরের মাহফিলে ওয়াজ শুনিয়া কিছু পূণ্যসঞ্চয়ের নিমিত্তে উপস্থিত হইয়াছে। করিমের মা তাহার একমাত্র তোলা বিবাহের লালশাড়িটি পরিয়াই হাজির হইলো! তাহার অন্য শাড়ি টুটা-ফুটা, তেল-হলুদ-মরিচের দাগে ভরা।

         

হুজুর সুরমা চোখে, নূরানী চেহারায়, সুললিত কণ্ঠে কোরানের আয়াত তেলাওয়াত করিয়া, তার বাংলা তরজমা সহ ওয়াজ-নসিহত করিতেছেন। একপর্যায়ে তিনি বলিলেন, ‘যে সমস্ত পুরুষ বেহেশতে যাইবে, আল্লাহ তাহাদের খেদমতের জন্য ৭০জন অনিন্দ্য সুন্দরী  হুর প্রদান করিবেন।’

          মুখরা ও স্পষ্টভাষী বলিয়া করিমের মার বদনাম আছে! এই সময় সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া  হুজুরের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জিজ্ঞাসা করিল, ‘হুজুর, আমরা বেহেশতে গেলে মাইনে মাইয়্যা মানুষের লাইগা কী ব্যবস্থা? ঐহানে খেদমতের জন্যি আমরা কী পাইবো?’           

         

হুজুর বিস্ময়ে হতবাক হইয়া বলিলেন, ‘বেহেশতে কাহারো খেদমত লাগিবে না! সেখানে অনন্ত সুখ। যাহা চাইবে তাহাই সাথে সাথে আপনিই হাজির হইবে! পবিত্র নারীরা সেখানে তাঁহাদের স্বামীদের ফিরিয়া পাইবেন।’

         

করিমের মা ততক্ষণাৎ সভয়ে বলিয়া উঠিল, ‘বাপরে বাপ, আবার করিমের বাপ!’

     

উপরোক্ত কৌতুকখানি সবারই জানা। পরের অংশটি বলার জন্য এই লেখাটির অবতারনা করিতেছি।

      করিমের মার কথা শেষ হইতে না হইতেই করিমের বাপ মারমুখী হইয়া তেড়িয়া আসিল! হুজুরকে সাক্ষী রাখিয়া বলিতে লাগিলো, ‘দেখলেন হুজুর, কতবড় বদ মাইয়্যালোক লইয়া সংসার করতাছি! অর চোখে কু, মনেও কু। বেহেশতে অর পরপুরুষ পাওয়ার ইচ্ছা! হাবিয়া দোযখেও এই বেডির জাগা হইবো না!’

     

মাহফিলে একটা ভীষন গোলযোগ শুরু হইয়া গেল! হুজুর সবাইকে শান্ত হওয়ার আহবান জানাইলেন। কে শোনে কাহার কথা! ইহার মাঝেই করিমের মা বলিতে লাগিলো, ‘যেই বেহেশতে করিমের বাপ থাকবো, হেই বেহেশত আর বেহেশত থাকবো না! হাবিয়া দোযখ থাইকাও খারাপ হইয়া যাইবো! এই বেডা দুইন্যাত ঐ আমার সংসার দোযখ বানাইয়া রাখছে! আর গোঁদের ওফরে বিষফোঁড়ার মত বেহেশতে তো এই বেডার লগে আরও থাকবো আমার ৭০ হুর সতীন মাগী! বেহেশতে যদি চাইলেই সব পাওয়া যায় তো আমার আর করিমের বাপের কী দরকার? আর বেডাইনের ঐ ৭০ হুরের দরকারটা কী?’

        

মিয়া সাবসহ সম্মানিত মুরুব্বীরা করিমের মা’র স্পর্ধায় স্থম্ভিত হইয়া গেলেন! তাহাকে তখুনি মাহফিল হইতে বাহির করিতে স্বেচছাসেবীরা অগ্রসর হইলো। মিয়া সাবের বেগম পর্দার আড়ালে মুচকি হাসিয়া, তাহার পুত্রবধূদের  বলিলেন, ‘করিমের মা কথা তো মিথ্যা বলে নাই? তোমরা কী বল? ’বধূগণ মনে মনে করিমের মাকে সমর্থন করিলেও এক্ষণে মাথানত করিয়া নিরুত্তর রহিল! দেয়ালেরও কান আছে না?

        

প্রবল বাকবিতণ্ডার মধ্যে মাহফিল আর জমিলো না! হুজুরসহ কেহই করিমের মার প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারিলেন না! করিমের মা ও বাপ দুজনই মিয়াবাড়ির চাকরিটি হারাইলো! তাহাদের একঘরে করা হইলো! বেগম সাহেব কিছুই করিতে পারিলেন না! শত হইলেও জ্বিনপালা হুজুরের বিধান!

         

বলাবাহুল্য এ যাবৎকাল করিমের মার সংসারে ১টি  মাত্র দোযখের উপস্থিতি ছিলো!  এই ঘটনার পর তাহার জীর্ণ-দীর্ণ কুটিরে হাবিয়া দোযখসহ আরও সাত সাতটি দোযখ নামিয়া আসিল!সজ্জা

গোলাম কিবরিয়া পিনু

জেগে উঠবার জন্য বাদ্য বাজানোর দরকার নেই

সমুদ্রের ঢেউ ভেতরে রেখেছি

ঘাঘট নদীটা তা জানবে না, এই নদী মরে গেছে!

 

অগ্নিকুন্ড নিয়ে সজ্জিত হবার জন্য

রং রাঙানোর প্রয়োজন নেই

পদছাপ দিয়ে তৈরি হবে চিহ্ন।

 

রূপান্তরের জন্য নিরাপদ স্থান নেই

এখানে বনজঙ্গল পিটিয়ে শুধু বন্যজন্তু নয়

নিরীহ মানুষও ধরা হয়।

 

ভীষণ কষ্টে পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ

অতিক্রম করবার জন্য

চরণের স্পর্ধা ও ভরসা নিয়ে আছি।

 

কীভাবে সজ্জিত হতে হবে

উজ্জ্বল ও ঝকমকে হবার জন্য, তা জানি।

নিয়াজ মোর্শেদ

অধঃপতন

একা একা নিজেকে গুড়িয়ে দেই

মগ্ন হই

আলোহীন তারাদের সাথে স্বচ্ছ, অনিকেত প্রার্থনায়

দু-হাতে রুদ্ধ করে মনের গতি

সকল সৌন্দর্য ভুলে

সদ্য চক্ষু ফোটা নয়া ইন্দ্রিয় পা ফ্যালে নিগূঢ় বাস্তবে

তবু বিরুদ্ধ বাতাস উড়িয়ে নেয় আমাকেই

সব কৌশল উল্টে দিয়ে

শঙ্কাহীন. সুতাকাটা ঘুড়ির মতন।

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানসাধক ড.কাজী মোতাহার হোসেনঃ মৃত্যুদিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

কোবিদ

কাজী মোতাহার হোসেন ১৮৯৭ সালের ৩০শে জুলাই কুষ্টিয়া (তখনকার নদীয়া) জেলার কুমারখালি থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এটি তাঁর মামাবাড়িতে । কাজী মোতাহার হোসেনের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে। তাঁর পিতা কাজী গওহরউদ্দীন ও মাতা তাসিরুন্নেসা।মামা বাড়িতে জন্ম হলেও কাজী মোতাহার হোসেনের শৈশব কাটিয়েছেন ফরিদপুরের বাগমারায় তবে শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুষ্টিয়াতেই।                       

মেধাবি ছাত্র হিসাবে বৃত্তি নিয়ে ১৯০৭ সালে নিম্ন প্রাইমারি ও ১৯০৯ সালে উচ্চ প্রাইমারি পাশ করেন। ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষা পাস করে ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯১৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পরীক্ষায় বাংলা ও আসাম জোনে প্রথমস্থান অর্জন করে বৃত্তিলাভ করেন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয়শ্রেণীতে প্রথমস্থান নিয়ে এমএ পাশ করেন। উল্লেখ্য, সেবছর কেউ প্রথমশ্রেণী পাননি। 

১৯২১ সালে এম. এ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন সময়ে কলকাতার তালতলা নিবাসী মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমানের কন্যা সাজেদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের সংসারে চার পুত্র ও সাত কন্যা ছিল। তন্মধ্যে – সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন, কাজী আনোয়ার হোসেন, কাজী মাহবুব হোসেন প্রমূখ রয়েছেন। 

১৯২১ সালে ঢাকা কলেজে ছাত্র থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ডেমনেস্ট্রেটর হিসেবে চাকরি শুরু করেন এবং একই বিভাগে ১৯২৩ সালে একজন সহকারী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। কাজী মোতাহার হোসেনের নিজ উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে এম.এ কোর্স চালু হয় এবং তিনি এই নতুন বিভাগে যোগ দেন।তিনি গণিত বিভাগেও ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৫১ সালে তিনি পরিসংখ্যানে একজন রিডার ও ১৯৫৪ সালে অধ্যাপক হন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পরিসংখ্যান বিভাগে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে স্থাপিত পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের তিনি প্রথম পরিচালক। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারী (Professor Emeritus) অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। 

১৯৩৮ সালে ভারতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন। যুগপৎভাবে, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পি.এইচ.ডি করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘Design of Experiments’তাঁর ডক্টরাল থিসিসে তিনি ‘Hussain’s Chain Rule’ নামক একটি নতুন তত্ত্বের অবতারণা করেন। বস্তুত, তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) তিনিই প্রথম স্বীকৃত পরিসংখ্যানবিদ। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একাধারে একজন বাংলাদেশী পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। 

কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী এবং সেই আলোকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত গড়ে তোলার জন্য তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তিনি ছিলেন তার একজন দৃঢ় পৃষ্ঠপোষক। বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করে এ-সব আন্দোলনে গতিদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ৬-দফাকে কেন্দ্র করে ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে আন্দোলন সংঘটিত হয় তারও একজন বলিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন কাজী মোতাহার। 

১৯৬১ সালে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতার মুখে ঢাকায় রবীন্দ্র-জন্মশত বার্ষিকী পালনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালি-সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদজ্ঞাপন করেন। তিনি বাংলা বানান ও লিপি সংস্কার কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সভাপতি হন। 

১৯২৬ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজলের সাথে তিনি “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি কিছুকাল ‘শিখা’ নামক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি বাংলা একাডেমির একজন প্রতিষ্ঠাতা। কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর অনেক বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে সঞ্চয়ন(১৯৩৭), নজরুল কাব্য পরিচিতি(১৯৫৫), সেই পথ লক্ষ্য করে(১৯৫৮), সিম্পোজিয়াম(১৯৬৫), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস(১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান(১৯৭৪), নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৭৬), প্লেটোর সিম্পোজিয়াম (অনুবাদ-১৯৬৫)অন্যতম।

সম্মাননা। 

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৭৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়ে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডি.এস.সি ডিগ্রি দ্বারা সম্মানিত করে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করে। কাজী মোতাহার হোসেন ভবন নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের নতুন নামকরণ করা হয়। 

বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবেও আছেন কাজী মোতাহার হোসেন। তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে আছেন কাজী মোতাহার হোসেন। ব্যক্তিগত জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। নজরুল তাঁর মোতাহার নামকে আদর করে ‘মোতিহার’ ডাকতেন। 

১৯২৫ সালে নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যাপারে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দাবা খেলায় তাঁর অনন্য সাধারণ অবদানের কথা স্মরণ করেই বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে কাজী মোতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। 

দেশ বরেণ্য এই সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, ক্রিড়াবিদ ও বিজ্ঞান সাধক ড.কাজী মোতাহার হোসেন ১৯৮১ সালের আজকের দিনে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন। আজ তাঁর মৃত্যু দিবস। জাতীয় অধ্যাপক ও জ্ঞানতাপস এই মহান শিক্ষাবিদের মৃত্যুদিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

তথ্যসূত্রঃ

১। উইকিপিডিয়া

২। বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, সম্পাদকঃ সেলিনা হোসেন ও নূরুল ইসলাম, ২য় সংস্করণ, ২০০৩, বাংলা একাডেমী,

৩। জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী, সংগ্রহকালঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ইং

৪। ১১৩তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, সংগ্রহঃ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ইং

৫। ছবি, ইণ্টারনেট থেকে সংগৃহীত 

চলে যাবো একদিন

মফিজুল ইসলাম খান

মায়াবী পর্দা ঝুলিয়ে সব কটি জানালায়

চোখ রেখে সংগোপনে চলে যাবো একদিন।

 পেছনে কাঁদবে স্বজন জানাশোনা অলিগলি

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ ঝড়তোলা নীলাকাশ।

 

এখনো সময় আছে মনের জানালা খুলে

প্রভূর চরণে রাখো এলোমেলো ভাবনাগুলো

ঘুরে ঘুরে দেখো তার কুদরতের খেলা

রংয়ের মানুষ, তাই বিদায় নেবার আগে

মেখে নাও অন্তরে মুঠো মুঠো প্রেম।

 

একদিন চলে যাবো সঙ্গীহীন একা

মুখরিত বাতায়ন সোনালী চশমা

কবিতার পান্ডুলিপি সখের ল্যাপটপ

অনাদরে থাকবে পড়ে প্রিয়মুখ

পরিবার পরিজন মাতৃভূমি, সব। 

সুখের আশায় প্রেমের টানে

আনোয়ার হুসাইন খান সোহেল

এসএসসি পাশ করার আগেই রোকেয়াকে অভিভাবকরা বিয়ে দেয়। প্রথম পক্ষের কোন সন্তান না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন রোকেয়ার বাবা। আধুনিক যুগের ছোঁয়া লাগেনি তাদের গায়ে। ৯ ভাই বোনের সংসারে রোকেয়া সপ্তম। অতি গরীব ঘরের ঘরণী রোকেয়া। অতি কষ্টে দিনাতিপাত করে। মা বাবার সংসার থেকে মাঝে মধ্যে আর্থিক সাহায্য পায়। তা দিয়েও ভালো চলে না তাদের সংসার। তাছাড়া স্বামী অলস প্রকৃতির লোক। বলতে গেলে এক ধরণের ভবঘুরে জীবন কাটায়। রোকেয়া তাকে কর্মমূখী করার চেষ্ঠা করে বিফল হয়। ভাইদের কাছে বিষয়টি অবগত করলে সিদ্ধান্ত হয় রোকেয়াকে এই সংসারে রাখা হবে না। কথামত কাজ, রোকেয়া কোর্টে গিয়ে প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দেয়। 

বড় ভাই সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন। সেই সুবাদে আর একজন সৈনিকের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক সময় নিজের বোনের বিয়ের প্রসত্মাব দেন বন্ধুতুল্য ছোট ভাইকে। সুন্দরী রমণী রোকেয়াকে দেখে তাজুলের পছন্দ হয়। বিয়ে হয় ভাইয়ের শশুরবাড়ীতে। সেখানেই ফুলশয্যা অতিবাহিত করেন। বউকে নিজের বাড়ীতে নেননি তাজুল। সরকারী কোয়ার্টারে ওঠেন নব দম্পতি। দুজনেই অবশ্য পোড়খাওয়া। তাজুলও আগে একটি বিয়ে করেছিল। সংসারে বনিবনা না হওয়া ১ম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়।

ভালই চলছে দুজনের মধুর সংসার জীবন। প্রায় ১৫-১৬ বছরের সংসার জীবন। ছোট খাটো সমস্যা ছাড়া বড় কোন ধরণের অসুবিধা হয়নি ওদের। দু সন্তানের জনক-জননী এই জুটি। ছেলেটা দেখতে মায়ের মত ফুটফুটে সুন্দর। আর মেয়েটা ঠিক বাবার মত । সবাই বলে ছেলেটা কালো হতো, আর মেয়েটা ফর্সা হতো। এটা মানতে নারাজ বিধাতার বিধিবদ্ধ নিয়ম।  যাকে যেভাবে ইচ্ছে তৈরী করবেন। কাউকে লাবণ্য দিয়েছেন, আর কাউকে দেননি। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতে ভুল ধরা মহা অন্যায়। এটা অনেক সময় মেনে নিতে কষ্ট হয় অনেকের। যে কারণে এই মন্তব্য করে ফেলে হয়তো নিজেরই অজান্তে

এক সময় তাজুল মিশনে দেশের বাইরে যায়। বছর দুয়েক পরে দেশে আসে তাজুল। স্ত্রীর মতিগতি দেখে বুঝতে পারে সে এই দীর্ঘ সময়ে অন্য কারো প্রেমে পড়েছে। পড়ারই কথা। এত দীর্ঘ সময় বিরহব্যাথা কি দমিয়ে রাখা যায়? চার মাসের অধিক একাকী থাকাটা সকল বিবাহিত যুবতীর জন্যই কষ্টসাধ্য। ছেলে মেয়ে দুটোর বয়স, বছর দুয়েকের ব্যবধান। ওরা একই ক্লাসে পড়ে। সমত্মান দুটোকে শিক্ষালয়ে পাঠিয়ে রোকেয়ার আর কাজ নেই, শুধু ভারতীয় চ্যানেলের সিরিয়াল দেখা। আর পরকীয়া বন্ধুকে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে সময় দেয়া ছাড়া। মোবাইল ফোন সাথে থাকলে আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। অসাধ্যকে সাধন করছে সবাই। স্ত্রীকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার বিফল চেষ্টা করে তাজুল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি,। নরমে, গরমে, চরমে সকলভাবে বুঝিয়েও ব্যর্থ মনোরথ।

একদিন রোকেয়া এই সোনার সংসার ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যায়। খোঁজ খবর নিয়ে অনেক চেষ্টা তদবির করে বুঝিয়ে রোকেয়াকে ফিরিয়ে আনে তাজুল। রোকেয়ার আর মন বসেনা এই সংসারে। স্বামী বেচারাও একটু কড়া মেজাজী। পান থেকে চুন খসলেই খবর আছে। দুজনের সম্পর্ক যেন দা-কুমড়ো। ভাইয়েরা রোকেয়াকে বাড়ীতে এনে আটক রাখে। সংসারের এই বেহালদশা থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজে। না, শেষ পর্যন্ত বড় কোন সিদ্ধান্ত কেউই নিতে পারে না। দুটো সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার তাদের পুনর্মিলন ঘটে। এভাবে চলে যায় কিছুদিন। সাপে-নেউলে সম্পর্কের আর উন্নতি হয় না। এই ফাটল আর জোড়া লাগে না।

কোন এক অমবস্যার রাতে রোকেয়া আবার অজানার পথে পা বাড়ায়। মোবাইল ফোন বন্ধ। একদিন দুদিন যেতে যেতে ছয়মাস অতিবাহিত হয়। রোকেয়ার আর কোন হদিস নেই। একদিন তার এক আত্মীয় দেখে রোকেয়া একটি নার্সিং হোমে কাজ করে। তার মোবাইল নম্বরটি আনে অনেক কষ্টে। এরপর মায়ের সাথে প্রায়ই কথা হতো নিষ্পাপ দুটি সমত্মানের। রোকেয়া এক সময় এই নার্সিং হোম থেকে চাকুরী ছেড়ে চলে যায়। মোবাইলে কলও আর দেয় না প্রিয় সন্তানদের কাছে। আজ ৩-৪ বছর হবে  কোন খোঁজ নেই রোকেয়ার। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়না তাজুলের। সন্তানের মুখের দিকে আর কত তাকিয়ে থেকে সময় পার করা যায়। শেষ অবধি তালাক দেয় রোকেয়াকে। রোকেয়ার অভিভাবকরাও এখন জানেনা রোকেয়া কি বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। কিছুটা সন্দেহের তীর রয়েছে তাজুলের দিকে। তাজুল কি রোকেয়াকে মেরে লাশ গুম করে ফেলেছে না কি? মুখ খুলে কেউ কিছু বলে না। এভাবেই ছিঁড়ে যায় রোকেয়া-তাজুলের সম্পর্কের রশি। মায়ের ভালোবাসা বঞ্চিত সন্তান দুটি বেড়ে ওঠছে অবজ্ঞায় আর অবহেলায়। ওরা আগামী ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী। 

সবাইকে আজ ধিক্কার দিতে শোনা যায় রোকেয়াকে। কি হবে এই দুটি সন্তানের? কতইনা কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে ওদেরকে পরিণত জীবনে। পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন করে জায়গা করে নেয় আরেকটি পরকীয়া কাহিনী।

দাদীমাকে

রাজকুমার


দাদীমা, স্কুলপালানো দিন কামড়ে দিয়েছে লালপিপড়ে
আগুনও কেড়ে নিল ঢোড়াসাপ তাড়াকরা চেলাকাঠ,
ঘুড়িদের সুতো কেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে চাকুরশহরে
হাতের তালুতে পেতে খোসাছাড়ানো বনেদী আপেলজীবন

এখন শহরজুড়ে বৃষ্টিরা মাথা খুটছে কাঁচের জানালায়
আজও কি ঘরজুড়ে আপনার কিসার ছোয়া;
নিভুনিভু পিদিমের ছায়ায় জমাট বাধছে রাত
রাজপুত্র একশ্বাসে ছিড়ে ফেলছে শামুকশব্দ; কালো ভোমরের মাথা

আমি ফিরব দাদীমা
আমাকে ফিরতেই হবে-
আপনার হাতের মুড়ি-মুড়কি, খেজুড়গুড়ের পায়েসের ঘ্রাণে
আমাকে যে আপনার গল্পের রাজপুত্র হতেই হবে দাদীমা

তুমি নেই

আজিম হোসেন আকাশ

তুমি নেই-তাই শূন্যতায় ডুবে গেছে

তোলপার করা হৃদয় নদীর দু’কূল,

চেনা আকাশ হয়েছে ঢের অচেনা-

ঝরে গেছে কাননের যুথিকা-বকুল।

তুমি নেই-তাই ব্যাথার শ্রাবণে অঝরে-

ঝরেছে কত না দুঃখ-শোকের বৃষ্টি,

সুখের পরাগে দূরে অন্তহীন আকাশে

হারিয়ে গেলে-পারিনি ফেরাতে দৃষ্টি।

তুমি নেই- তাই কুয়াশার মেঘ ভেঙ্গে

উঠে না হৃদয়ে একটি রোদেলা দুপুর,

পাহাড়ী ঝর্না ঝরে না নির্ঝর-নিশ্চুপ

বাজে না ঋতুর পায়ে প্রকৃতির নূপুর।

তুমি নেই-তাই বিনিদ্র রজনী কাটে-

একাকী বিষন্নতার গভীর তমসায়,

কুয়াশায় ঢেকে গেছে কবিতার ছন্দ

ফেলে আসা কোন গোঁধলী ছায়ায়।

তুমি নেই-তাই ভাবনারা জমাট বাঁধে-

শতাব্দীর দাহে, স্বপ্নেরা পুড়ে হয় ছাই,

ব্যাকুল হৃদয় দেখেনি আজো নতুন স্বপ্ন

কবিতার প্রেরনায় সুদূরে চেয়ে আছি তাই।

কয়লা-কালো

মেহেদী হাসান

জন্ম যদি হতো ঘোর আফ্রিকাতে

ওখানে তো কেউ সাদা নয় শরীরের রঙ সবারই কালো-

অথবা যদি ঠাস-বর্ণিল ইউরোপে-

আমার গায়ের চামড়া নিশ্চয় রঙধনু সাত-রঙের সমাহার হতো!

সাদা-কালোর রঙ্গিন দেশে জন্ম-

শক্ত-অন্ধকার হয়ে-হয়েছি অসুন্দরের সমার্থক কালো

যখন আমি ছোট্ট কুট-কুটে শিশু, পাড়া-পড়শীরা বলে;

দেখো-দেখো বাচ্চাটি হয়েছে কেমন কুচকুচে-

মাথা নেড়ে প্রাচীন দাদী বলে, সোনার আংটি যে বাঁকাও ভালো।

কিন্তু এ সোনা যে বাঁকা নয়, এ যেন কয়লা-কালো!

সেই থেকে কালোর হল যাত্রা শুরু-

আমাকে আরো কালো করলো খেলাচ্ছলে শরীরে মাখা ধূলো

খা-খা করা চৈত্রের দুপুরে বগলে বই খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে যেতে,

বিকেল বেলায় কাদা-মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে রোদে পুড়ে হলাম কাক-কালো;

লাল জ্বলজ্বলে সূর্যটি আমার চামড়াটিকে করতে থাকে অবিরাম গাঢ়।

সাদা কুয়াশায় ঢেকে এলো কড়কড়ে ঠান্ডা শীত

তবে এবার একটু কি সাদাটে হবো!

ও শীত কালো কালো গোলাকার-ছোপ মুখে রেখে দিয়ে গেলো।

আকাশ কাঁপিয়ে রঙ ছড়িয়ে বর্ষা এলো-

জমাট মেঘ জড়িয়ে ধরে ময়লা মোরে করল আরো।

উজ্জ্বল বসন্তে কোকিল শুনিয়ে গেলো গান,

সিগারেট খেতে খেতে ঠোঁট দুটিও থ্যাবড়া কালো

সত্যি বলছি,  প্রিয়ার মুখে তাই স্নিগ্ধ-চুমু খেতে পারিনি এখনো।

অনেক লোকের উত্তাল মিছিল বিপ্লব হবে আজকালই,

কলার খোসা পচে গেলে হয় যেমন কালোঃ

এখানেও রোদ আমাকে রেহাই দিলোনা

হোয়াইট কলারের দাবড়ানি খেয়ে শরীরে রংহীন জখম হলো-

দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেলাম, বসতে গিয়ে উবু হলাম

কিছু ধুতরা-বিবর্ণতা ঘিরে ধরল।

মানুষের রঙ্গীনপনা মুখ দেখে যখন দিয়েছি হেসে খিল-খিল

বড়-বড় ধবল দাঁত গেছে বেড়িয়ে

এতোবড় ঝলমল যুগেও হয়েছি তাই নিতান্তই চৌদ্দ ইঞ্চি সাদা-কালো।

তীব্র শীতের দেশে গিয়েছি অন্য কারো নয়, নিজেরই শরীরটাকে টেনে নিয়ে-

টিকোলো নাক জিজ্ঞেস করে,

কেনো তুমি নিকষ কালো?

মা-বাবা কেউ নয়তো সাদা,

লোডশেডিং এর দেশে জন্মে হৃদয়টাতেও আলো জ্বলেনা

কালো হই বয়সের চাপেও

চুলগুলোও তবু হচ্ছে ধূসর ক্রমান্বয়ে——

ইচ্ছেপূরণ

নাজমুল আহসান মুক্ত

জীবনে কখনো এমন সিদ্ধান্তহীনতায় পড়িনি। টুটুল যেটা বলছে সেটা কোনোমতেই মানতে পারছি না আমি। অথচ এরকম সময়ে ওর অনুরোধ রাখব না, এটা ভাবতে গেলেও খারাপ লাগছে। ইচ্ছে করছে ছুটে বেরিয়ে যাই এই ফিনাইলের গন্ধভরা ঘরটা থেকে। পারছি না, টুটুল আমার হাত চেপে ধরে আছে।

গত অক্টোবরে ওর ক্যান্সার ধরা পড়ে। শুরুর দিকে ওকে জানাইনি। কিন্তু বেশিদিন চেপে রাখা গেল না, ও জেনে ফেলল। এরপর সাধারণত যা হয়, জানার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো ও। দুইতিনদিনের মাথায় হসপিটাল চেঞ্জ করে এখানে আনা হল। দেশের সেরা হসপিটাল, টাকার জোরে সুচিকিৎসা হচ্ছিল। কিন্তু ছেলের পিছনে সব ঢেলে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলেন আংকেল, ওর বাবা। ভিটেমাটি সব বিক্রি করে দিলেন। আংকেল ব্যবসা করতেন, ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। আমাকে একদিন ফোন দিলেন, রাতে। তারাতারি মালিবাগ যেতে বললেন। টুটুলকে হসপিটালে নেওয়ার পর থেকে আন্টি ওখানেই আছেন, টুটুলের মামার বাসা। আংকেল ঢাকা-খুলনা ছুটাছুটি করেন। এতো রাতে যেতে বললেন, আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম।মালিবাগে পৌঁছলাম রাত সাড়ে ন’টার দিকে। আংকেল আমাকে ডেকে পাশে বসালেন। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছি।
-‘বাবা শোন, তুমি টুটুলের কাছের ফ্রেন্ড, কথাগুলো তোমাকেই বলি।’
আমার ভয় আরও বেড়ে গেল, কী বলতে চাচ্ছেন আংকেল। প্রায় ফিসফিস করে বললাম ‘জ্বি, বলেন।’
-‘আমি কাল রাতে খুলনা থেকে আসছি। আজ সারাদিন হসপিটালে ছিলাম, এই একটু আগে এখানে এলাম। ফ্রেশ হয়েই তোমাকে ফোন দিলাম। আসতে চাচ্ছিলাম না, তোমার খালাম্মা জোর করে পাঠিয়ে দিল। সারারাত জার্নি করে আসায় শরীরটাও টায়ার্ড ছিল, তার উপর সারাদিন হসপিটালে!’
আমি বুঝতে পারলাম আংকেল কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। অপ্রয়োজনীয় কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইছেন। বললাম- ‘নতুন কোন খবর আছে আংকেল?’
আংকেল মনে হল দিশা পেলেন। ‘হ্যা, বাবা। তুমি তো সব জানো। আমার ব্যবসা, জমিজমা সব গেছে। ছেলের জন্যে জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি, তাতে তো লাভ হবে না বাবা। আজ শেষ যে সম্বল ছিল, সেটাও বিক্রি করে দিলাম। পালানের একটু জমি ছিল আর ঘর সহ দোকানের জমিটা।’
-‘ও!’ আমি বলার কিছু খুঁজে পেলাম না।
-‘এই টাকায় সপ্তাহখানেক চলবে, তারপর কী করব বাবা?’ আংকেল অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চোখ মুছলেন। আমি জানি এটা ভয়াবহ সমস্যা। ইতোমধ্যে বড় অংকের ঋণ নিয়েছেন ব্যাঙ্ক থেকে, সম্পদ-সম্পত্তি বলে তো কিছু থাকল না। এই ঋণ শোধ করবেন কীভাবে! আর টুটুলের চিকিৎসা-ই বা চলবে কীভাবে! আমি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারছি না। টুটুল ছোটবেলা থেকে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ওর জন্যে কিছু করতে পারছি না, কষ্টে বুকটা ব্যথা করতে লাগলো।হলে ফিরলাম রাত ১২টা নাগাদ। পুরো রাস্তাটা কাঁদতে কাঁদতে এসেছি। কাউকে বলে কোনো হেল্প পাবো এরকম মনে হল না। তারপরও সকালে কামাল ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। মাস্তান টাইপের কামাল ভাই হলে আছেন ৭-৮ বছর, আদুভাই কিসিমের মানুষ। সব শুনলেন, কিছু বললেন না। দুইদিন পর কামাল ভাই আমাকে ডেকে পাঠালেন। টুটুলের সাহায্যার্থে কনসার্ট হবে, তবে একটু দেরি হচ্ছে। কৃতজ্ঞতায় মাথাটা নুয়ে এল আমার। এরপর জানুয়ারির শুরুতে কনসার্ট হল।বেশ টাকা এল হাতে।পরের সপ্তাহে একটা মোটা অংকের টাকা নিয়ে টুটুলের কাছে গেলাম কামাল ভাইকে নিয়ে। কামাল ভাই টুটুলকে চিনতেন না, অথচ যখন টুটুলের মাথায় হাত রেখে বললেন-‘চিন্তা করো নাই ভাই, সব ঠিক হয়ে যাবে!’, আমি অবাক হয়ে গেলাম। কামাল ভাইয়ের চোখে আমি যে স্নেহ আর ভালবাসা দেখলাম তার তুলনা হয় না। কামাল ভাই বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, আমি থেকে গেলাম। এরপর নানা ব্যস্ততায় দুইতিন দিন হসপিটালে যাওয়া হয় নি।‘এই, কী ভাবিস?’ টুটুল আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিল।
-‘হ্যা, বল।’
-‘বললাম তো!’ টুটুল বলেছে, কিন্তু যেটা বলেছে সেটা হয় না। ওর ধারণা ও বাঁচবে না, অযথা এতোগুলো টাকা নষ্ট করার কী দরকার! আমাকে প্রস্তাব দিয়েছে টাকাগুলো শীতার্তদের সাহায্যার্থে দিয়ে দিতে। এটা কোনও কথা হল?
-‘দোস্ত, আমার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করবি না তুই?’ আমি একেবারে দিশেহারা হয়ে গেলাম। কী করব এখন! ডাক্তার যা বলেছেন তার অর্থও এটাই দাড়ায়, টুটুল বাঁচবে না। তাই বলে ওর প্রস্তাব মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু বন্ধুর শেষ ইচ্ছে পূরণ!শেষ পর্যন্ত ওর জোরাজুরিতে রাজি হয়ে গেলাম।
-‘আর শোন, কামাল ভাই টাকা দিয়ে গেছেন এটা কেউ জানে না। তানহা জিজ্ঞেস করেছিল কনসার্টের ব্যাপারে, আমি কিছু বলি নি। ’ তানহা টুটুলের গার্লফ্রেন্ড, আমাদের এক বছরের জুনিয়র।
-‘তো কি হয়েছে?’ ও কী বলতে চাচ্ছে অনুমান করতে পারছি।
-‘প্লিজ দোস্ত, কাউকে বলবি না। বাবা-মাকে তো অবশ্যই না, তানহাকেও না।’
প্রতিবাদ করতে চাইলাম, কিন্তু ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। মনটা খচখচ করতে লাগলো। ওকে বলে এলাম ব্যবস্থা করে ওকে জানাব। বাইরে বেরুনোর সময় দেখলাম তানহা, রিসিপশনের মেয়েটার সাথে কথা বলছে। আমাকে দেখে হাসল, আমি দেখলাম বন্ধুর প্রেমিকার চোখে কষ্টের ছোপছোপ রক্ত!ভার্সিটিতে গিয়ে খোঁজ নিলাম। শীতার্তদের সাহায্যে চতুর্ভুজ নামের ছাত্রদের একটা দল উত্তরবঙ্গে যাবে, আগামিকাল দুপুরে রওয়ানা দেবে। ওদের সাথে কথা বলে আবার হসপিটালে এলাম, চতুর্ভুজের লিডার ছেলেটা আমার সঙ্গে এল। টুটুলকে সব জানালাম। কথা পাকা হল, কাল সকালে ওদের অফিসে গিয়ে টাকা দিয়ে আসতে হবে।সময় দুপুর সাড়ে ১২টা। আমার হাতে একটা স্লিপ। চতুর্ভুজে টাকা জমা দিয়েছি, তার রশিদ। টাকাটা দিয়ে সোজা হসপিটালে চলে এসেছি, মিনিট বিশেক লেগেছে। ৯০৪ নম্বর কেবিনের দরজাটা হাট করে খোলা। আমি ভিতরে ঢুকিনি। বাইরে থেকেই দেখতে পেলাম তানহার পাথরের মত নিশ্চুপ মূর্তি। আন্টি কেবিনের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, কয়েকজন নার্স তাঁকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে। আমার সামনে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আংকেল ভিতরে ঢুকলেন। হারুন মামা আর অপরিচিত একটা লোক তাঁকে ধরে ফেলল, আংকেল জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। আমি এখান থেকে টুটুলের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, মুখে তৃপ্তির হাসি।টুটুল মারা গেছে ১২টা ১০মিনিটে; আমি হিসেব করলাম ঠিক যখন টাকাটা আমি চতুর্ভুজকে দিয়েছি, তখন।

দ্বিচারিতা 

নাজমুল হক পথিক

ভাল লাগে তোমার দ্বিচারিতা 

ভাল না লেগে কি উপায় আছে ?

পৃথিবীর এখন বড় অসুখ,

সব কিছুকে উপভোগ্য করে নিতে হবে ।

 নইলে হয়ে যাবো হেমায়েতপুরের বাসিন্দা।

আশা আজ দুরাশা, প্রেম নীল বিবর্ণ।

 তবু কেন তোমার আস্ফালন 

আধুনিক সভ্যতার দাম্ভিক অহংকারে!

আমি চাই তাই সেই আদিম সমাজ ,

 হোমার আর টলেমির সমাজজীবন ,

 ভারতীয় তপোবন, উজ্জয়িনী নগর

নারীর প্রথম ভালবাসায় আজীবন বেঁচে থাকা ।

শকুনেরা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে 

এ পৃথিবী থেকে ।

 ক্রমে একদিন আমরাও শকুন হয়ে যাবো।

 দৃষ্টি যাবে কেবল গলিত শবদেহের দিকে ।

সাধ জাগে মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যের কবি হই ।

 কবি বিজয় গুপ্ত হবে সাথী 

লেখা হবে শুধু দ্বিচারিণীর কাব্য ।

নির্জনরাতের অন্ধকার আরও ঘন হয় ।

 তুমি আমি পাশাপাশি ,

 চির বুভুক্ষু এ হৃদয় ,

 তোমার প্রেমের সুধায় আমি চির সুখীজন।

জানি কাল তুমি যেতে পারো অন্যের হাতে

সব জেনে-শুনেও পান করি বিষ

     আবার খুঁজে ফিরি নতুন কোন সফ্ট্ওয়্যার।

ফরমেট করি অবাধ্য হৃদয়কে বারবার ।

আয়নাতে তোমার প্রতিকৃতি দেখো

কোনো বিভৎসতা কি চোখে পড়েনা ?

‘প্রতিবাদ’

 আহমেদ বায়েজীদ

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মলির একটি হাত খামচে ধরে দাড়িয়ে পড়লো রাবেয়া।
‘কিরে দাড়িয়ে পড়লি কেন?’ ঘাড় ফিরিয়ে জানতে চাইলো মলি।
‘ঐ শয়তানটা! ’ কাঁপা গলায় বললো রাবেয়া।
‘কোন শয়তানটা, কার কথা বলছিস?’
‘মাদবরের পোলা। দোকানের সামনে।’
সামনে পথের দিকে তাকায় মলি। কিছু দূরে টং দোকানের সামনে একটি মটর সাইকেল রাখা। মাদবরের বখাটে ছেলে পিন্টু আজও দাড়িয়ে আাছে ওদেরকে উত্যক্ত করার জন্য।
‘আমার ভয় করছে আপা। চলো বাড়ি যাই।’ আবার বললো রাবেয়া।
‘আজ কিছু বলবেনা, কাল শাসিয়ে দিয়েছি না।’
‘সে জন্যই তো আরও ভয়। যদি কিছু করে বসে। চলো আজ কলেজে যাওয়ার দরকার নাই।’
‘কি বলছিস রাবেয়া! একটা ফালতু ছেলের ভয়ে কলেজে যাব না। চল আমার সাথে, দেখি কি হয়।’
মলির হাত জাপটে ধরে দাড়িয়ে থাকে রাবেয়া। অনেকটা জোর করে ওকে টেনে নিয়ে যায় মলি। মলি আর রাবেয়া চাচাতো বোন। মলিরা আগে ঢাকায় থাকতো। ঢাকার স্কুল থেকেই এসএসসি পাশ করেছে মলি। কিন্তু ওর বাবা হঠাৎ দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় মলি আর মলির মা গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। গ্রামের কলেজে ভর্তি হয়েছে মলি। ওদের কলেজে যাওয়ার পথে প্রতিদিন রাস্তায় দাড়িয়ে থাকে পিন্টু। কলেজের ছাত্রীদের নানা ভাবে উত্যক্ত করে। টাকাওয়ালা বাবার অতি আদরের পুত্রদের যা হয়। লেখাপড়া বাদ দিয়ে উছৃঙ্খল জীবন যাপন।
হাঁটতে হাঁটতে দোকানের সামনে চলে আসে মলি আর রাবেয়া। দোকান পার হয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে ডাক শুনতে পায়, ‘এই যে শহরের নন্দিনী, দাড়াও।’
ডাক শুনে দাড়িয়ে পড়লো মলি। ওর হাত ধরে টেনে সামনে নিয়ে যেতে ব্যর্থ চেষ্টা করে রাবেয়া। দোকানের ভিতর থেকে এক সঙ্গীসহ বের হয়ে এলো পিন্টু।
‘দোস, কাইলকা নো তোরে ঝাড়ি দিছিল?’ মলিকে দেখিয়ে পিন্টুকে বলে সঙ্গীটা।
‘খুব দেমাগ, তাই না সুন্দরি!, বিশ্রী ভাবে হাসতে হাসতে বললো পিন্টু।
‘শুনুন, আপনাকে না কালকে বলেছি রাস্তা-ঘাটে কখনও মেয়েদের ডিস্টার্ব করবেন না। লজ্জা-শরম নেই নাকি! ভদ্রলোকের ছেলে হলে তো একবারেই শুনতেন।’ বলতে বলতে গলা চড়ে যায় মলির।
মলির কথা শুনে আবারও বিশ্রীভাবে হেসে ওঠলো পিন্টু। সঙ্গীটির দিকে চেয়ে বলে, ‘বলে কি সুন্দরি’ আমি নাকি ভদ্রতা জানি না!’
হেসে ওঠে দু’জনে একসাথে। আশপাশের কয়েকজন লোক আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। যেন মজার কোন কিছু দেখছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে খপ করে মলির একটা হাত ধরে ফেললো পিন্টু।
‘হাত ছাড়ু–ন বলছি।’
‘যদি না ছাড়ি!’
‘ভালো হবে না বলছি। হাত ছাড়–ন।’
‘কি করবে তুমি। দেখি করো তো। হাত ছাড়বো না।”
অন্য হাত দিয়ে কলেজ ব্যাগটা রাবেয়ার হাতে দিল মলি। এবার ঝাড়া দিয় পিন্টুর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। হাত ছাড়িয়ে নিয়েই চোখের পলকে এক ঘুষি বসিয়ে দিলো পিন্টুর চোয়ালে। ঘুষি খেয়ে ছিটকে নিজের মটর সাইকেলের উপর পড়লো পিন্টু। উঠে দাড়াবার আগেই আবার ছুটে গিয়ে শার্টের কলার ধরে টেনে তুললো মলি। সজোরে লাথি মারলো তলপেটে। এবার ছিটকে দোকানের বেঞ্চির উপর পড়লো পিন্টু।
চোখে ভয় আর অবিশ্বাস নিয়ে কয়েক মূহুর্ত মলির দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ দৌড় দিল পিন্টুর সঙ্গীটি। একজন জাপটে ধরলো সেটাকে। এতক্ষণে যেন হুশ ফিরে এসেছে উপস্থিত লোকদের। অন্য দুই তিনজন চড়াও হলো পিন্টুর উপর। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে মলি বললো, ‘থাক বেশি মারার দরকার নেই। পুলিশে দিয়ে দিন। এতক্ষণ তো সবাই তামাশা দেখছিলেন।’
একজন বললো, ‘এই হারামজাদার লাইগা কোন মাইয়া শান্তিতে স্কুল-কলেজে যাইতে পারে না। আমরা এত দিন মুখ বুইজা সহ্য করছি। আইজকা তুমি আমাগো চোখ খুইলা দিছ, বইন।’
এক বয়স্ক লোক বলে উঠলো, ‘ওর লাইগাই আমি আমার সেভেনে পড়া মাইয়ারে তাড়াতাড়ি বিয়া দিছি।’ মূহুর্তে এলাকায় চাউর হয়ে গেল কথাটা- ‘কলেজের মেয়েরা পিন্টুকে ধোলাই দিয়েছে’। সবাই সরব হয়ে উঠলো পিন্টুর বিচারের জন্য। খবর পেয়ে এলো পিন্টুর বাবা। উপস্থিত লোকজনের কাছে সে ক্ষমা চাইলো ছেলের কৃতকর্মের জন্য। শেষে বললো, ‘পুলিশে খবর দাও, আমি নিজে ওরে পুলিশের হাতে তুলে দিবো। আর আজ থেকে এই এলাকার সব মেয়ে নিরাপদে স্কুল-কলেজে যাবে।’
 রাবেয়ার ঘোর এখনও কাটেনি। বোবা হয়ে দাড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। মলি গিয়ে ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললো, ‘চল্, কলেজে চল্। অনেক দিন ধরেই মার্শাল আর্টের প্রাকটিস হচ্ছিল না। আজ সুযোগ পেয়ে কাজে লাগালাম।’

শাহ আলম বাদশার ছড়া

পুকুরচুরি

 সবুজঘেরা দেশটাতে আজ

হরেক রকম চোর

চুরির তালেই ব্যস্ত এবং

আনন্দে বিভোর!

কেউবা করে সিঁধেলচুরি

ছিঁচকে অসহায়

কেউ কলমের খোঁচায় আবার

লাখটাকা সরায়?

কেউ গুদামের মাল সরিয়ে

হচ্ছে কলাগাছ;

কেউ ব্যাঙ্কের ক্যাশটা মেরে

নাচে ধিতাং নাচ।

জনগণের ভোট নিয়ে কেউ

করেই পুকুরচুরি—

চোরের অভাব এদেশে নেই

নেই যে কোথাও জুড়ি!!

শান্তি আসুক

সোনাফলা বাংলাদেশে

ফলেনা আর সোনা

দেশটাজুড়ে চলছে শুধু

শোষণের বীজবোনা?

ঘুষখোর আর চোরের তরে

দেশটা হলো শেষ

দুঃখীর তরে আছেই যেনো

নামের বাংলাদেশ!

নিঃস্ব-গরীব পায়না দিশে

দুঃখে তারা মূক

ছদ্মবেশী ভন্ড যারা

পায় তো তারাই সুখ।

শোষকগুলো শোষণ করে

মুখেই প্রীতির গান

রক্তেগড়া দেশটাকে হায়

করছে অপমান?

 

এই অনাচার দাঁড়াও রুখে

উচ্চ কঠিন শিরে

শোষণ-শাসন দূর হয়ে যাক

শান্তি আসুক ফিরে!

তোর অধরে চুম
জিয়া হক

নামলো চোখে ঘুমের পরী-
ঘুমের পরী এসে
চোখের পাতা জাপটে ধরে
মিষ্টি হেসে হেসে।

ক্লান্ত শরীর এলিয়ে পড়ে
ফুলের বালিশ পেলে
ঘুমের দেশে হারিয়ে যাই
আকাশ ঠেলে ঠেলে।

মধুর বিকেল আলসে হয়ে
ফুরিয়ে যায় রোজই
ফুরিয়ে যায় রংধনু সুখ
পাই না তারি খোঁজ-ই।

              হায়রে অবুঝ ঘুম                   
তোর অধরে চুম!

সমাধি ‘পরে

লুতফুন নাহার

(গত সংখ্যার পর)

সেটা ঠিক আছে । আমার মনে হয় বিয়ের পর সায়েম এমন থাকবে না ।

          তাছাড়া, সুরমা সায়েমের ব্যাপারটা যতটা মেনে নেবে অন্য মেয়ে হয়ত:

          সেভাবে মেনে নেবে না ।সুরমার দিকে তাকিয়ে সায়েম অবশ্যই ভাল পথে ফিরে

          আসবে । অন্যদিকে, পিতৃ-মাতৃহীন মেয়েটাও আমাদের চোখের সামনে থাকবে ।

       

         আমার কাছে বিষয়টা বেশ চিন্তণীয় মনে হচ্ছে ।এ ব্যাপারে মন কিছুতেই সায়

         দিচ্ছে না ।তবুও তুমি সুরমার সাথে আলাপ করে দেখতে পার ।যদি সুরমা মন

         খুলে সায় দেয় তবেই………..

 

সুরমা বাগানে পানি দিচ্ছে ।গুন গুন করে গান গাচ্ছে ।মামুন চৌধুরী অনেকক্ষণ ধরে বাগানে পায়চারী করছেন ।সুরমাকে দেখে ওর দিকে এগিয়ে এলেন ।সুমরাও তার জেঠাকে দেখে পানি দেওয়া বন্ধ করে ওনার দিকে এগিয়ে গেল ।

          বাবা, আমি ভাবছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করব । তুমি কি বলো?

 

          শিক্ষকতা করতে চাস?

          হ্যাঁ ।ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশুনা করে শিক্ষকতার চেয়ে উত্তম কোন চাকুরী হতে

          পারে? তাছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলে কথা!

 

          তা তো অবশ্যই । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে ক’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের

          শিক্ষক হতে পারে?

    

           চাকুরী করবি ভাল কথা ।কিন্তু আগে অন্য বিষয় নিয়ে ভাবছি ।

     

           কোন বিষয়, বাবা?

 

           দেখ মা, ছেলে-মেয়েরা বড় হলে তাদের বিয়ে দেওয়া, তাদের প্রতিষ্ঠিত করা

           সব বাবা-মায়েরই কতর্ব্য। মার্ষ্টাস পাশ করেছিস্ ।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতার

           অফার এসেছে ।কমর্জীবনে প্রবেশ করবি ।তবে, আমরা কত দিন আর বেঁচে

           থাকব ।তোর বাবা-মা চলে গেছেন ।মেয়েদের দু’টো ঠিকানা, এক হলো-বাবার

           বাড়ি, আরেক হলো স্বামীর বাড়ি ।বাবার বাড়িতে মেয়েরা ক্ষণিকের অতিথি

          আর স্বামীর বাড়ি তাদের স্হায়ী ঠিকানা ।তাই তোকে সেই ঠিকানায় পৌঁছে

          দিতে চাই ।তুই কি বলিস্ ।

 

          বাবা তোমাদের সিদ্ধান্তের বাহিরে কোন কথা বলার দীক্ষা তো পরিবার থেকে

          পাই নি ।তাই তোমাদের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা ।তোমরা আমাকে অনেক বেশী

          ভালবাস । তাই তোমাদের ভালবাসার প্রতিফলন অবশ্যই আমার সুখের ঠিকানা

          হবে-এটাই আমার বিশ্বাস ।

 

          কিন্তু মা তুই ব্যপারটা কি ভাবে নিবি জানি না ।তারপরও মতামত জানানোর

          তোর র্পূণ অধিকার আছে ।তুই এ যুগের উচ্চ শিক্ষিতা ।তুই মতামত প্রকাশের

         অধিকার নি:সংকোচে ভোগ করবি এটা আমার একান্ত বিশ্বাস ।আমি আমার বখে

         যাওয়া ছেলেটাকে তোর ভালবাসা, সুন্দর জীবর্নাদশণ আর মমতার বাঁধনে বাঁধতে

         চাই ।যদি তুই রাজি থাকিস্ ।

সুরমার হৃদয় সাগর আনন্দে উছলিয়ে উঠল ।সুরমার চোখের কোণে আন্দশ্রু এসে পড়ল ।কিন্তু সুরমা তার জেঠাকে তা বুঝতে না দিয়ে মাথা নীচু করে মনে মনে ভাবল-‘বাবা, এই স্বপ্ন তো আমি যৌবনে পর্দাপণ করেই দেখেছি । এই স্বপ্নের পুরুষের সাথে কল্পনায় কত বাসর সাজিয়ে কত বার হারিয়ে গিয়েছি প্রেম সাগরে ।’ তারপর জেঠাকে বলল-

         বাবা, তোমরা যদি মনে করো আমি তোমার ছেলের যোগ্য পাত্রি এবং আমরা

         দু’জন সুখী হব তাহলে আমি তোমার প্রস্তাব স্বাগ্রহে গ্রহণ করে নিলাম ।দোয়া কর,

         আমার হৃদয়-মরুভূমিতে যেন ছোট্ট একটা মরূদ্যান গড়ে তুলতে পারি ।

মামুন চৌধুরী মোটামুটি নিশ্চিন্ত হলেন । তবে, ছেলের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি ।

কারণ, তিনি জানেন, সায়েম বিয়ের বন্ধনে জড়াতে কিছুতেই চাইবে না ।সে মুক্ত বিহঙ্গের মত নিজের so-called society-তে ডানা জাপটাবে ।তাই তাকে দাম্পত্য জীবনের বন্ধনে জোর র্পূবক আবদ্ধ করতে হবে । তাহলেই একদিন সংসার নামের নীড়ে ফিরবেই। (চলবে)

শিশুতোষ ক্রন্দসী

স্বপ্ন দেখি

আলমগীর সরকার লিটন

গোলাপ ফুটেছিল এ বাগানে

এই চাঁদ মিটি মিটি করে

জ্বল ছিল গো ভীষণ পুড়ে

শেষপ্রহরে কালো আঁধারে

যে স্বপ্ন দেখা হয়নি

ঘুমের ঘোরে ঘুমের ঘোরে

এখন কেন দেখি বারে বারে ।।

 

ঘুম ঘুম সকালে মুচকি মুচকি

মিষ্টি ঠোঁটে হাসির কি উল্লাস

বলো নাগো এই দেখায় কি

ভাল বাসার বহির প্রকাশ

আনন্দের চিত্তে ভাবনার জালে

খুব বেশী দেখতে হচ্ছে করে ।।

 

খুঁজি খুঁজি হারিয়ে যাওয়া

দিনগুলি দিনগুলি এখন শুধু স্মৃতি

স্মৃতির বেদনা হয় যে জ্যোতি

ক্লান্ত দেহে নেই রে শান্তি

দু’চোখ জুড়ে আঁধার দেখি

 আলো জ্বলেনা আর চারিধারে ।।

পিডিএফ আকারে ‘ক্রন্দসী’ দেখুন

ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। অষ্টম সংখ্যা।। সেপ্টেম্বর/২০১২ ঈসাব্দ


ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত। লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ
krondosee@yahoo.com

ছবি কথা বলে


মাহমুদ দারবিশের কবিতা

[মাহমুদ দারবিশ: আগস্ট ২০০৮ তারিখে আমেরিকার টেক্সাসে মারা যান প্যালেস্টাইনের কবি মাহমুদ দারবিশ৩০টির বেশি কবিতার আর ৮টি গদ্যগ্রন্থের প্রণেতা এই কবিতাঁর গভীর প্যালেস্টাইনপ্রীতির জন্য বিখ্যাতদারবিশ আরবিভাষায় লেখালেখি করলেও ইংরেজি, হিব্রু ফরাসিভাষায় বাক্যালাপের দক্ষতা তাঁর ছিলদারবিশের অনেক কবিতা থেকে গান তৈরি হয়েছেমৃত্যুর আগে দারবিশ প্যালেস্টাইনে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে গেছেন।]

ছাড়পত্র

ছায়ার মাঝে তারা আমাকে চিনতে পারেনি

ছাড়পত্র থেকে ছায়া আমার রং শুষে নিয়েছিল

এবং তাদের সম্মুখে আমার একটা প্রদর্শনী হয়েছিল

একজন ভ্রমণপিপাসু যে কিনা ভালোবাসে আলোকচিত্র সংগ্রহ করতে

অথচ আমাকে তারা চিনতেই পারেনি,

আহা………ত্যাগ করোনা

আমার করতল সূর্যকিরণ থেকে বিচ্ছিন্ন

কারণ বৃক্ষগুলো আমাকে চিনতে পেয়েছে

আমাকে নীরব করে চন্দ্রের মত তুমিও চলে যেওনা!

 

সকল পাখি আমার মত নীরব হয়েছিল

এয়ারপোর্টের দূরবর্তী দরজা পর্যন্ত

সকল গমক্ষেত

সকল বন্দীশালা

সমস্ত শ্বেতপাথরের স্মৃতিফলক

সীমানার সমস্ত কাঁটাতার

সকল চোখেরা

আমার সঙ্গে ছিল

কিন্তু, তারা তাদেরকে ছাড়পত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়

 

ডোরা-কাঁটা হয় আমার নামেছাড়পত্রে

মাটির উপর আমি নিজের হাতকে লুকিয়ে যাই

আজ কাজের ভারবহন করি

আকাশের মত অনুভূতিতে

আমার মত পুনরায় উদাহরণ সৃষ্টি করোনা!

ওহ! ভদ্রলোক, ধার্মিক

বৃক্ষগুলোকে তাদের নাম জিজ্ঞাস করলেনা

উপতক্যাদের জিজ্ঞাস করলেনা কে তাদের জননী

আমার কপাল পুড়ে যায় তৃণাচ্ছাদিত ভূমির আলোয়

এবং নদীর জলের মত আমার হাত লাফিয়ে ওঠে

মানুষের সকল আবেগ-অনুভূতি যেন আমার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ

সুতরাং, ছাড়পত্র আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেই।।

অনুবাদ : অনিকেত রায়হান

                                                                                                                      

     

সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মত কালজয়ী হলে ছড়াও সাহিত্যে টিকে যায়:গোলাম কিবরিয়া পিনুর সাথে অনলাইন আলাপ


প্রকাশিত বই: মুক্তিযুদ্ধের ছড়া-কবিতা, ফসিলফুয়েল হয়ে জ্বলি, ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত।

দুপুর মিত্র: সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ছড়া আসলে হারিয়ে যাবে। আপনার কি এরকম মনে হয়?
গোলাম কিবরিয়া পিনু: না ! হারিয়ে যায় না ! কিছু ছড়া থেকে যায়, বহু ছড়া হারিয়ে যায়। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমন ছড়ার ক্ষেত্রেও। বহু ছড়া বহু কাল হলো আমাদের কাছে জীবন্ত!

দু: ছড়াকে শিশুসাহিত্য হিসেবেই কি আপনি মেনে নিতে চান? চাইলে কেন? না চাইলে কেন নয়?
গো: ছড়ার একটা বিরাট অংশ শিশু সাহিত্যের অর্ন্তভুক্ত হয়ে আছে, এখনো শিশু সাহিত্যের ধারায় ছড়া অন্যতম প্রধান ধারা, শিশু উপযোগী ছড়া শিশুদের জন্য কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক ছড়া শিশুদের মনোযোগ কাড়লেও তা সাহিত্যের অংশ হয়ে সব পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে।

দু: ছড়ার আবেদন ক্ষনস্থায়ী। আপনি কি একমত? হলে কেন না হলে কেন নয়?
গো: না! সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মত কালজয়ী হলে ছড়া সাহিত্যে টিকে যায়, না হলে নয়। অনেক ছড়ার আবেদন স্থায়ী হয়ে আছে, তার উদাহরণের প্রয়োজন নেই, আমরা সেসব ছড়া পড়ে এখনো অনুরণিত হচ্ছি।

দু: রাজনৈতিক ছড়াচর্চা অনেকটাই কমে গেছে বা বলতে গেলে নেই। এর কারণ কি? অনেকেই এই ছড়াকে সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী বলে থাকেন। আপনারও কি তাই মনে হয়? হলে কেন না হলে কেন নয়?
গো: একমত। রাজনৈতিক ছড়াচর্চা অনেকটাই কমে গেছে বা বলতে গেলে নেই, কারণ রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন ছড়াকারের অভাব একটা মূল কারণ, আর রাজনৈতিক চেতনার ঘাটতি শুধু ছড়ার ক্ষেত্রে নয়, বর্তমানে বাংলাদেশের কবিতাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা অনুভব করা যাচ্ছে। ‘ছড়া সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী’ এবিষয়ে পূর্বেই বলেছি।

দু: অন্নদাশংকর রায় এর মতে, ছড়া লেখার উপকরণ আসে সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে। আপনিও কি এরকম মনে করেন? বা এর ফলে ছড়া তার বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলছে- এরকম মনে হয় কি?
গো: পুরো একমত নই। অনেক ছড়া অনেক বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে বা লেখা হয়ে থাকে, তা সমসাময়িক উপকরণ নিয়ে নয়।

দু: ছড়া তার প্রয়োজনের খাতিরেই হাল্কা হয়। কিন্তু ছড়াকাররা একে এতটাই হাল্কা করে ফেলেন যে ছড়া কোনও গুরুত্বই বহন করে না। আপনি কি একমত? হলে কেন ? না হলে কেন নয়?
গো: গুরুত্বপূর্ণ ছড়া ও ছড়াকার আছে আবার হাল্কাও আছে। যারা ছড়া হাল্কা করে ফেলেন তাদের মূল্যায়ন সেভাবেই হবে! তবে সেজন্য তেমন সমালোচক প্রয়োজন, যার অভাব সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে।

সকাল রায় এর কবিতা 

নুপুর বিছানায় শুয়ে ভাবছে অবশেষে বিয়েটা হচ্ছে তাহলে। ভালোবাসার

পূর্নতার আর বাকী নেই ……..

দেশের অবস্থা ভালো না। বড় আয়োজন করা গেলনা। তাই অনেককেই বলা হয়নি।

জয়ন্ত গ্রামের বাড়ী থেকে কাল আসছে না; আসবে হল থেকে। গ্রামের বাড়ী

থেকে ওদের সবাই মিরপুরে মামার বাড়ীতে উঠেছে। বিয়েটা হয়ে গেলেই গ্রামে

চলে যাবে।

নুপুরের চোখ কি যেন খুজে; থমকে যায়। দেয়ালর টিকটিকি মুখ নাড়িয়ে কি

যেন বলতে চায় ? বস্তির বাসী খাবারের মাছি চুপ হয়ে আছে আজ। ক্লান্তি নয়

শান্তি নেই মনে।

রাত তখন নিশুতি।

হাওয়া আছে থমকে। পরিবেশ নিস্তব্ধ।

নুপুরের চোখে ঘুম নেই; ঘুম আসবে বলে সেই যে কখন চোখ থেকে উবে গেছে আর আসছে না।

পাশ ফিরতে যাবে আচমকা গুলির শব্দ !! কেপে উঠলো ঘর!!

বসে উঠল নুপুর। গুশির শব্দ এক নাগারে বেড়েই চলেছে।

বিছানা থেকে গড়িয়ে নামে ও হাত বাড়ায় দরজায়।

বাড়িময় আতংক গেটের বাইরে আর্তনাদ।

ছোট কাকু , তিতলি মাসী, রঞ্জু, সবাই উঠোনে এসে জড়ো হয়েছে।

পাশের বস্তিতে আগুন জ্বলছে।

বিভিন্ন রকমের গুলির শব্দ। চারদিক প্রকম্পিত।

তিতলী মাসী আর রঞ্জু গেট পেড়িয়ে বাইরে আসার আগেই জলন্ত নগরী ঢাকার

অবর্ননীয় দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায় ওরা। চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি

আসছে। সেই সাথে হাহাকার কান্না।

কাল নুপুরের বিয়ে তাই পুরো বাড়িময় আলোকসজ্জা। আজ এ বাড়িতে পটকা ফুটবে

তার বদলে সারা শহরের বারুদ ফুটছে।

বাড়ির কুকুর গুলো থমকে গেছে গুলির তান্ডবে। ওরা হতবাক চোখে দাড়িয়ে আছে।

ঝোপের পাশে জোনাকি ছিল তাও এখন নেই। আওয়াজে আওয়াজে সরগরম এ কলোনি। শুধু

মাটি ফেটে আসা কঠিন শব্দ।

চাঁদ রেখে আকাশে, কান পেতে বাতাসে দু পেয়ে উপোসী মানুষ গুলো ঘুমিয়ে

ছিল; ছিল সারাদিনের ক্লন্তির মাঝে একটু ঘুম।

একটা দিন কাজ না পেলেই হলেও পেটের জলুনি বাড়ে ওদের সেখানে কদিন পর পর

হরতাল হয়েই আসছে।

খিদে লাগা চাঁদ; কালকেশী রাত; ওদের অভাবের আয়নায় শুধু পেটের ক্ষুদা ভাসে।

উপোসী ঘরওয়ালীরা ভাবে এই রাতে উচু পাঁচিল ঘেরা মানুষ গুলো কি করছে কে

জানে। কি করছে নুপুর ম্যাডাম।

উদার প্রকৃতির মতোন

শাহ আলম বাদশা 

চারিদিকে বারুদের গন্ধ, রোদন হাহাকার

মানুষের রক্তে লোলুপ উন্মাতাল
ক্রুর হাসিমুখে হিংস্র ঈগল
প্রতিপ্রাণে প্রাণে তোলে কাঁপন
কিংবা হৃদয়ে জমায় হতাশার কালোমেঘ!
এখন বড়ই দুঃসময়
উদ্ভ্রান্ত মানুষের মনে নেই সুখ
কেবল জমাটবদ্ধ উৎকন্ঠা-উদ্বেগ
বাতাসে বাতাসে ছোটে হিংসার বীজ—
ইথারে ইথারে বাজে ধ্বংসের বীণ
আদমের তাজা রক্তে হচ্ছে অযথা লাল
সবুজ জমিনের পবিত্র প্রলেপ
আমাদের রন্ধ্রেরন্ধেও্র ঢুকেছে মরণকীট
নাছোড় এইড্স মারে তাই ভয়াল ছোবল
ছেঁড়া তসবিহদানার মতোই আজ
একেএকে ঝরছে কি খোদার গজব?
নদীর উচ্ছল মাছের মতোন
ঝাঁকঝাঁক পাখির মতোন
জ্বলজ্বলে তারার মতোন
অথবা উদার প্রকৃতির মতোন
হতে পারে নাকি শান্ত-নিঝুম
পৃথিবীর বেভুল মানুষ!!

আর্তনাদ

মনজুর মোরশেদ

 

স্বপ্ন লালিত নবরত্নের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা, অন্তর্যামীর অঙ্গুলি হেলনে তার বিস্তার, কস্মিনকালের কক্ষপথে তার বিচরণ, পরজীবীতার দর্শনে তার পূর্ণতাপ্রাপ্তি আর বিধাতার নির্দেশে তার আগমনী বার্তা, কুহেলির উত্তরণ ঘটিয়েছেদীর্ঘ প্রতীক্ষার পথ পেরিয়ে, জড়তার বন্ধনকে ছিন্ন করে, বিশাল অর্ণবের অজস্র লহরীর সন্ধানে ব্যাপৃত আত্মার নিবিড় আবেষ্টনের মোহ দর্শনে আবির্ভাব ঘটেছিল নব অতিথির

সে এক ইতিহাসনবরত্নের সন্ধান আর আগমনী বার্তার প্রতীক্ষার পালা পার্বণের ইতি ঘটেছেরূপের আবর্তে, অম্রমুকুলের মিষ্টি মধুর সৌরভে, মন মাতানো হিল্লোলের আবহ নিয়ে আগমন ঘটেছিল তারসে ছিল গোলাপ সদৃশ শিশির বিন্দুর ন্যায় চির সুন্দর, চির কোমল, চির অম্লানসে এক নিষ্পাপ হৃদয়, বেদনার সাগর, প্রকৃতির মতই শান্ত ও নির্বাকপরনেই নব অতিথির মৌনতা নির্বাসিত করেছে হিল্লোল, জমাট করেছে রিক্ততা, ভারাক্রান্ত করেছে মাতৃ হৃদয়তারই মাঝে জননীর চাহনিতে নেমে এলো দিগন্তের বিলীনতা, হৃদয়ের নীরব আহাজারি আর গভীর বেদনাবিদায়ের তরে তার সমগ্র হৃদয় জুড়ে বেজে চলেছে বেদনা-মলিন বিষণ্ণতার অমিয় বাণী

স্বপ্ন সাধের নবরত্নের অন্তর্ধান আর বঞ্চিত হৃদয়ের অজস্র রক্তক্ষরণ মাতৃহৃদয়ের আবেদনকে মর্মস্পর্শী করেছেআমার বিশ্বাস, নব তনয়ার প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা আর মাতৃহৃদয়ের করুণ আর্ত-চিৎকার আপনার হৃদয়কে বিদীর্ণ করেছে

গোলকপিণ্ড (তাদের ভাষায়) পতনে মুখটা তাদের শুরুতেই ভার ছিলপতিত বস্তু (তাদের ভাষায়) প্রাণহীন জেনে তাদের কুসংস্কারের পারদের গতি ঊর্ধ্বমুখী হলঅজস্র তির্যক বাক্য আর বিকৃত মুখভঙ্গি তাদের বিতৃষ্ণা প্রকাশে যথেষ্ট ছিলহীনতার কাদা মাখানো কদর্য কথা তার জানা ছিলনাযোগ্যতার উপহাস আর বাঁকা বাক্যের বিষবাষ্পের বীনবাণী আর অফুরন্ত খেদোক্তি ধৈর্যহীনতার খোরাক যুগিয়েছিলতবুও মাতৃত্বের অমোঘ আসক্তিতে অশ্রুসিক্ত টলমল বারি আঁখির পাতায় শুকিয়ে রেখেছে

নব অতিথির নিষ্পাপ প্রাণের আত্মাহুতি আর নিরুপমার বেদনার্ত আর্তনাদ বধির বিবরে প্রবিষ্ট না হলেও বিধাতার কর্ণকুহরে ঝংকৃত হয়েছে নিদারুনভাবেজটিল আবর্তের কুটিল চিন্তার মেলায় তাকে শুনতে হয়েছে কুসংস্কার আর তির্যক  বাক্যের অজস্র শব্দমালাশত কঠোরতা ও জীবন সায়াহ্নের অন্তিম মুহূর্তে সে বাকরুদ্ধ হলেও প্রতিবাদের অজস্র সত্যের লৌহকপাট তার আঁখি জুড়ে ঠিকরে পড়েছিলকুৎসা আর কপট বাগ্নীতার প্রতিযোগিতার সমাজে সত্যের অসহায়ত্ব মর্যাদা না পেলেও বিধাতার দরবারে ঠিকই মর্যাদা পাবে বলে বিশ্বাস করি

সেতো কারো কল্পনার বিলাস নয়, নাম পরিচয়হীন কোন সমালোচকের অযোগ্যতার করুণার পাত্র নয়, নয় কোন কুসংস্কারের কাব্য কাসিদার উল্টো প্রলাপ

নিকৃষ্টতম অপবাদ, নিয়তির পরাকাষ্টে হস্তক্ষেপ আর সৃষ্টি কর্তার সৃজন কর্মে নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবনে তারা ছিল সদা ব্যস্তশৃঙ্খলিত লৌহকপাটে আবদ্ধের কর্কশ আবৃত্তি উজ্জ্বল গগনকে তমাসক্ত করেছেকথার প্রতিটি বুলিতে প্রকাশিত হয় অভিযোগের রসাত্মক নাট্যাংশসেই সাথে শৃঙ্খলিত কব্যের বিকৃত বিবৃতি স্বাভাবিক সমতা ও সম্পর্ককে সীমিত করেছেদায়িত্ব ও কাণ্ড জ্ঞানহীন একটি উদ্ধৃতি হুতাশনের লেলিহান শিখার প্রজ্বলনকে তরান্বিত করেছেসৃষ্টির পূর্ণগ্রাসে একবিংশ শতাব্দী যেন অসমব্যাধির ভারে নুহ্যশতাব্দীর অকৃপণ সৃষ্টি আজ বারুদহীন যুদ্ধে বিধ্বস্তচারদিকে দেখা যাচ্ছে মানবতার বিপন্ন স্বাদমানবতা আজ অসহায়, শৃঙ্খলিতমেকি মানবতার লেবাস পরে অবয়ের অট্টহাস্যে তারা উল্লসিতমানবতার দোহাই দিয়ে স্বার্থসিদ্ধির সবকটি কপাট খুলে দিয়ে সমাজের বিষময় রস পান করাতে তারা বদ্ধপরিকর

তারা কান থাকতেও বধির, চোখ থাকতেও অন্ধ, যাদের হৃদয় আছে অনুভূতি নেইসত্যকে যারা অস্বীকার করতে চায়, মিথ্যাই তাদের চাতুরীর ট্র্যাজিক কাব্যআর যারা সত্যকে জেনেই অস্বীকার করে মিথ্যাই তাদের ভ্রষ্ট বীরত্বের সাধহীন মহাকাব্য

তিনটি কবিতা 

বাবুল হোসেইন 

সমুদ্রসঙ্গমের পর

কে বলে তুমি দেখতে পারো নাতোমারও তো আছে সহস্র চোখ, অজস্র পাপড়ির সঙ্গমে নেচে উঠা চোখের মণি। চিকচিকে গতর খেলা করে জ্যোতির্ময় সেই অন্ধকারেযেখানে তাহার ছায়া উঠে নড়ে; অথৈ সমুদ্দুরে।

***

শিখেছি জোৎস্নাবৃষ্টিরাতের শুভ্রতা

শিখেছি জোৎস্নাবৃষ্টি; রাতের শুভ্রতা। কুয়াশার তুহিনস্পর্শ চেখে জেনেছি বরফশীতলকথা। জেনেছি কি তোমার অপেক্ষার মৃত্যু অথবা সোনালি সন্ধ্যার গান কিংবা চোখের গহ্বরে সমুদ্র পোষার গল্প।

***

নিশিপুর

নিশিপুর ঘুমক্লান্ত চোখের ভিতর স্বপ্নের মায়াবেড়ী হয়ে জেগে থাকে অষ্টপ্রহর। নিশিপুর আমারও আছে মনোভূমি জুড়েনিয়ত ফসল ফলাই উৎকৃষ্ট চাষি। নিশিপুরে যাবার তাড়না নেই বস্তুত গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া থাকে না; দিনশেষে বাড়ী ফেরা স্বনিয়মেই ঘটে।

চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ইবনে সীনা 

আ.হ.ম. সবুজ

সূচনা : বহুমুখী প্রতিভাধর বিজ্ঞানী ইবনে সীনা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক অবদান রেখেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা তাঁর জীবন ও সাধনার একটি চিত্র তুলে ধরব।

জন্মসন ও জন্মস্থান : আবু আলী হোসাইন ইবনে সীনা বুখারা (যা বর্তমানে উজবেকিস্তানের অন্তর্গত) এর আফসানা নামক স্থানে ৯৮০ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব ও কৈশোর : ইবনে সীনার পিতা আবদুল্লাহ একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর পুত্রের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ইবনে সীনার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা করেন এবং আরবী ভাষা আয়ত্ত করেন। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অল্প বয়সেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ইবনে সীনা কৈশোরেই ‘হাকিম’ উপাধিতে ভূষিত হন। আরবী ‘হাকিম’ শব্দ দ্বারা ‘বিজ্ঞানী’, ‘প্রজ্ঞাবান’ ইত্যাদি বোঝায়।

কৈশোরে চিকিৎসাকার্যে সাফল্য: মশহুর জীবনীকার ইবনে খাল্লিকান বলেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইবনে সীনার নিকট প্রসিদ্ধ চিকিৎসাবিদগণ চিকিৎসাশাস্ত্র ও তার অভিনব চিকিৎসা প্রণালী শিক্ষা করতে আসেন। এই ১৬ বছর বয়সেই ইবনে সীনা বুখারার সুলতান নূহ ইবনে মানসুরের এক কঠিন রোগের চিকিৎসায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন এবং তাঁর শাহী-চিকিৎসক নিযুক্ত হন। সুলতান তাঁকে এর জন্য পুরস্কৃত করতে চাইলে ইবনে সীনা তখন সুলতানের বিখ্যাত সুবৃহৎ কুতুবখানা (লাইব্রেরী) -এ অধ্যয়ন করার অনুমতি চান। অসামান্য প্রতিভাবান ইবনে সীনা এই গ্রন্থাগারে দুরূহ গ্রন্থাবলী নিবিষ্টচিত্তে অধ্যয়ন করতে থাকেন।

রচিত গ্রন্থাবলী: ইবনে সীনা রচিত ২১টি সুবৃহৎ গ্রন্থ ও ২৪টি ক্ষুদ্র গ্রন্থের বর্ণনা পাওয়া যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই মহান সাধক দর্শন, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, জ্যামিতি, ভাষা-তত্ত্ব, সংগীতশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। এর ভেতরে ১৮ খণ্ডে সমাপ্ত দর্শনশাস্ত্র বিষয়ক গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’ বিশ্ববিখ্যাত একটি গ্রন্থ, যেখানে তিনি আত্ম‍ার রোগ নিরাময়ের দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। ‘কানুন ফিত-তিব্ব’ শীর্ষক চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক সুবৃহৎ গ্রন্থ ইবনে সীনার শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে স্বীকৃত।

কী এক সার্কাস!

নিয়াজ মোর্শেদ

কী এক সার্কাস!
লিখি প্রেম, ঠোট থেকে খসে নগ্ন বিষফল উত্তাপ
পিছল দেহ ছুয়ে পৃথুলা প্রিয়তীর সবুজ নিঃশ্বাস
ঘুমের সুতো খসে অধোমুখ, মাংসল লকলকে চাকু
রাতের বরণকুলো উষ্ঞ পালক গোজে অন্ধ আয়নার ভেতর

নিরীহ রোদ্দুরে হাঁটে ফিকেরং পাতাদের সবুজ-বিকেল
পাতার সবুজ রক্ত চাটতে চাটতে মানুষ হাঁটে নামি
মানুষ শান্তির ফেরীওলা! শান্তি ফেরী করে
হাতের তালুতে ছেলেভুলানো লাটিম কোমল রোদ্দুর ছিড়ে খায়

যে এক পাখির ঝাক মৃত্যুকে আরোগ্যের অ্যাম্বুলেন্স ভাবে
কেউ কেউ তারাও নিয়ত বেরোয় রীতিরুদ্ধ গন্ধমের ঘ্রাণে
কী এক আজব সার্কাস!
রাতের নিবিড় ভূগোল কয়লা হতে হতেও চকমকে চাকু গিলে খায়

 

শিক্ষা

মোহাম্মদ আলমগীর খান

১.               

-হ্যালো, হ্যালো! রিয়া??

-কে?? হুজ দিস??

-রিয়া, আমি মুনা

-ওহহ্যাঁ মুনা বল

-দোস্ত খবর শুনেছিস? হাইকোর্ট নাকি সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে

আরে এটাতো অনেক আগের খবর

-আসলে আমি ফোন করেছিলাম এটা জানার জন্য যে আংকেল তো অনেক বড় পোস্টে আছেন সচিবালয়ে, তুই আসলে কি হবে জানিস কিছু? সরকার কি সিদ্ধান্ত বদলাবে???

-আরে ধুর! সরকার কেন সিদ্ধান্ত বদলাবেমনে হয়না কিছু হবে

-দোস্ত! তাহলে আমার কি হবেএত কষ্ট করে পড়াশোনা করলামমেডিকেলে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিলমনটা খুব খারাপ হয়ে গেল

-আরে তোর চিন্তা কি?? এবার গোল্ডেন পেয়েছিস

-আরে গোল্ডেন পেয়েছি বলেইতো আর চান্স শিওর নাশুনেছি এখানে অনেক ধরাধরি হবেআমার তো বলার মত কেউ নেই

-হুমআমি অবশ্য বাপিকে বলেছিদেখি বাপি কাল কথা বলবে বলেছে

-ইয়ে, মানে রিয়া, তুই কি একটু আমার জন্য বলতে পারবি আংকেলকেপ্লিজ দোস্ত আমার জন্য এটুকু করআমার খুব কান্না পাচ্ছেবাব-মার খুব ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হবো

-ইয়ে মানে মুনা, বাপি ডাকছে রেএখন রাখিপরে এ ব্যাপারে কথা হবেবাই

২.

-আব্বু

-কিমা?

-আব্বু, তোমার কি উপরের লেভেলে কারো সাথে পরিচয় আছে? মানে সুপারিশ করার মত?

-নারে মাআমি সামান্য শিক্ষক মানুষআমার কারও সাথে তেমন পরিচয় নেইতুই কি মেডিকেল নিয়ে বেশী চিন্তা করছিস?

-হ্যাঁ বাবাসরকার নাকি সিদ্ধান্ত বদলাবে নাআর সবাই বলছে এবার মেডিকেলে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক ধরাধরি হবেবাবা, আমার তো মনেহয় মেডিকেলে পড়া হবেনা

-আমি কী বলবো রে মাকপালে থাকলে হবেতাও আমি দেখি ধরাধরি করার মত কাউকে পাই কিনাতুই মন খারাপ করিসনা মাএকি?? কাদছিস কেন পাগলী??

-আব্বু, আমার খুব খারাপ লাগছে আব্বুঅনেক -নে-কষ্ট হচ্ছে

-কাদিসনা মাসবার কপালে সবকিছু থাকেনা

-তোমার চোখে পানি কেন আব্বু?? আচ্ছা দেখো আমি আর কাঁদছিনাতুমি কেঁদোনা বাবা

৩.

-বাপি? ওহ বাপি, ম্যাগাজিনটা রাখোনা

-ইয়েস মাই ডিয়ারবল কি হয়েছে??

-আচ্ছা বাপি, আমি তো এবার শুধু প্লাস পেয়েছিআর এসএসসিতে শুধু মেডিকেলে তো আবার ভর্তি পরীক্ষা হবেনাতাহলে আমার কী হবে, বাপি?

-আরে? কি হবে মানে? তোমার বাপি আছে কেন?? আমি কালকেই আবুলকেফোন দিবোকোন চিন্তা করোনা ডিয়ার জাস্ট চিল

-ওহ বাপি! ইউ আর সো সুইটবাপি, চলো আজ বাইরে খাই

-হুমওকেগেট রেডি দেন

৪.

-হ্যালো, আপনি কি জনাব আবুল সাহেবের পিএস বলছেন??

-জ্বীনা, আমি উনার পিএস এর পিএস বলছি। কী দরকার বইলা ফালান

-না, মানে আমি আসলে

-আরে, এত আমি, আসলে করতেছেন ক্যান??? সোজা কামের কথায় আসেন মেডিকেলের লাইগ্যা ফোন দিছেন??

-জ্বী, জ্বী ! আপনি ঠিক ধরেছেন

-জিপি কত??

-জিপি মানে?? আপনি কি জিপিএ’র কথা বলছেন?

-হইলোকত?

-জিপিএ তো প্লাসতবে দুটা গোল্ডেন নাএসএসসিতে খুব শরীর খারাপ ছিল বলে গোল্ডেন পায়নি

-ধুর মিয়াসোনাগুলা নিয়াই ভেজালে আছিআপনে তো সোনাও পান নাই

-জ্বী মানে আমিতো নাআমার মেয়ে

-হইলোসরকারীতে হবেনাবেসরকারী মেডিকেলে চেষ্টা করতে পারিতয় খরচা বেশী পড়বো

-মানে বলছিলাম কি যে, সরকারীতেই যদি একটু দেখতেনবেসরকারীতে পড়ানোর ক্ষমতা নাই আমাদের

-বলেন কি?? আপনি কি করেন আগে এইডা বলেন

-জ্বী, আমি একজন শিক্ষক

-বুঝছিতাইলে ভাই চেষ্টা কইরেন নাঅনেক টাকার মামলা

-কেন ভাই? -লাখেও কি হবেনা??

-হাহাহাধুর মিয়াআপনার কোন আক্কেলই নাইএইবারের রেট কত জানেন?? এইবারে সরকারী মেডিকেলের রেট হলো ১০-২০ লাখবেসরকারি -১০, সাথে বেসরকারি মেডিকেলের নিজের ফিতো আছেই

-ওহঠিক আছে ভাইধন্যবাদ

৫.

-হ্যালো, স্লামালাইকুম স্যার

-জ্বী, আমজাদ সাহেবকেমন আছেন বলেন?

-স্যার, সবই আপনাদের দোয়াআপনার শরীরটা ভালো তো স্যার?

-আর বলেন না, এই পোলাপানগুলা কি সব মানববন্ধন টন্ধন করতেছেকেমন লাগে বলেনওদিকে ম্যাডাম আবার বলতেছেন সিদ্ধান্ত যেন ঠিক থাকে

-স্যার, আপনি চিন্তা করেন নাকয়েকদিন পর এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবেএছাড়া আমরা তো আর বসে নেইআমরাও সরকারী সিদ্ধান্তের পক্ষে মিছিল করার লোক লাগিয়ে দিয়েছি

-তা অবশ্য ঠিক বলেছেন

-স্যার, এবার একটা অনুরোধ ছিল

-বলে ফেলেন

-স্যার, আমার মেয়েটাকে কিন্তু ঢাকা মেডিকেলেই রাখতে হবেএবার প্লাস পেয়েছে কিন্তু এসএসসিতে নরমাল

-তাহলে তো একটু কেমন হয়ে গেলোনা?

-স্যার, কি যে বলেন? আপনার কাছে এগুলো কোন ব্যাপার নাকি?  আপনি শুধু বলেন বাকিটা আমি কালই ব্যবস্থা করে ফেলবো

-হেহেহেআপনি সাথে সাথেই বুঝে ফেলেন ভাইযাই হোক সময়মত আমাকে একটু মনে করিয়ে দিয়েনআর কাল একজন ঠিকাদার পাঠাবোআপনার কাছেকাজটা দিয়ে দিয়েনসে আবার আমার শালার শালা হয়হাহাহা

-হাহাহাশালার শালাখুব কাছের সম্পর্ক স্যারআপনি চিন্তা করেন নাওটা আমি দেখছি

 [পরিশিষ্টঃ কথোপকথন লেখার একটা সমস্যা হলো আবেগ দেয়া যায়নাশুধু সংলাপ বলে যেতে হয়তবে মাঝে মাঝে সংলাপে লুকিয়ে থাকা আবেগটাকেধারণ করার মত যোগ্যতা লেখকের থাকেনাআমিও সে যোগ্যতা রাখিনাশুধু হতাশা আর কষ্টের হাহাকারের উষ্ণতাটা টের পাইলেখার সময় নিজের জীবনের সেইদিনগুলো মনেপড়ে গেলোকত চোখের পানি ঝড়ালে আজকাল উচ্চশিক্ষার সিড়িটা পাওয়া যায়???]

আঁধলা

আজিম হোসেন আকাশ

চোখ থাকতে এই ধরাতে 

আঁধলা-রে তুই আঁধলা,

কেমন করে দেখবি যে তাই

আষাঢ় মাসের বাদলা

টাকার নেশায় বুদ হয়ে তুই

সদাই ঢালিসদ-শরাব,

রং-তামাশায় বিভোর যে তোর

নারীনেশায় দিল খারাপ

কেমন করে সাজাবি তুই

পূন্যের মাঝে জীবনটাকে,

একটিবারও পরের হিতে

গড়লি না তোর মনটাকে

মনটাযে তোর নাচের পুতুল

যেদিক নাচাস সেদিক নাচে,

ভুলের মাঝে পথ চলে তাই

পা কাটে তোর ভাঙ্গা কাচে

সুশীল সমাজ গড়ার তরে

হরেক রকম মুখোশ পড়িস,

ত্রাসের রাজ্য কায়েম করতে

মিথ্যে টাকার পাহাড় গড়িস

চোখ থাকতে এই ধরাতে

আঁধলা-রে সব আঁধলা,

উলোট-পালোট ঋতুর মাঝে-

শীতেও দেখিস বাদলা

সমাধি পরে

লুৎফুন নাহার

(গত সংখ্যার পর )

        সুরমা তুই এত কষ্ট করে আমার পছন্দের খাবার তৈরী করে এনে খাওয়াইছিস্

        তাই তোর জন্য একটা গান হয়ে যাকযদিও তুই western music শুনতে পছন্দ করিস্না তবুও আজকের মুর্হূতটাকে স্মরণীয় করেরাখার জন্য তোর জন্য এই গান-       

                                                 When she was just a girl
                                                 She inspected the world
                                          But it flew away from her reach
                                             So she ran away in her sleep
                                       Dreamed of para- para- paradise
                                             Para- para- paradise
                                              Para- para- paradise
                                         Every time she closed her eyes
                                        Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh

 When she was just a girl
She inspected the world
But it flew away from her reach
And the bullets catch in her teeth

Life goes on
It gets so heavy
The wheel breaks the butterfly
Every tear, a waterfall
In the night, the stormy night
She closed her eyes
In the night, the stormy night
Away she flied

She dreamed of para- para- paradise
Para- para- paradise
Para- para- paradise
Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh

She dreamed of para- para- paradise
Para- para- paradise
Para- para- paradise
Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh.

 

La la la La
La la la

So lying underneath those stormy skies.
She said oh-oh-oh-oh-oh-oh.
I know the sun
s set to rise.

This could be para- para- paradise
Para- para- paradise
This could be para- para- paradise
Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh.

This could be para- para- paradise
Para- para- paradise
Could be para- para- paradise
Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh.

This could be para- para- paradise
Para- para- paradise
Could be para- para- paradise
Whoa-oh-oh oh-oooh oh-oh-oh.

 

   মামুন চৌধরী বেলকুনিতে বসে পেপার পড়ছেন সাবিহা চৌধুরী দুকাপ চা নিয়ে এলেন স্বামীকে এক কাপ চা দিয়ে নিজে অন্য কাপে চুমুক দিলেন মামুন চৌধুরী পেপারটি এক পাশে রেখে চায়ের কাপটি হাতে নিলেন এক চুমুক পান করার পর কী যেন ভাবছেন সাবিহা চৌধুরী বললেন-

         হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে! তুমি কি কোন বিষয়ে চিন্তিত?

         না চিন্তিত না তবে, একটা বিষয়ে তোমার সাথে আলাপ করতে চাচ্ছি

         তোমার মতামত নেওয়ার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হব

           কোন বিষয়ে?

         সুরমার মার্স্টাস-এর রেজাল্ট হয়ে গেছে এবার ওকে বিয়ে দেওয়ার কথা

         ভাবছি এ সময়টাই বিয়ের জন্য উপযুক্ত বয়স আজ ওর বাবা-মা বেঁচে

        থাকলে ওরাও বিয়ের কথা ভাবততাই খুব শিগগীরই সুরমার মতামত নিয়ে

        শুভ কাজে হাত দিতে চাই তুমি কি বলো?

          হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি ভাল কোন ছেলে পেলে দেরী করা ঠিক হবেনা

         বিয়ের পর অন্য একটা জীবনে মেয়েটা কিছুটা হলেও বাবা-মার হারানোর

         ব্যথা ভুলে থাকতে পারবে

          আমি ভাবছি অন্য কথা

          অন্য কথা!

          হ্যাঁ সুরমা আমাদের মাঝেই সারা জীবন থাক এটা আমি চাই তাইসায়েমের সঙ্গে সুরমার বিয়ে দিতে চাই

           না, না এ হয় না সুরমার মত এমন একটা লক্ষ্ণী মেয়ের জীবন সায়েমের

          মত মদ্যপ, উড়োনচন্ডি স্বামীর হাতে পড়ে নষ্ট হউক তা আমি চাই না একটা

          এতিম মেয়ের জীবন জেনে শুনে এভাবে নষ্ট করতে পারবনা মেযেটা জীবনে

          কী পেয়েছে? তের বছর বয়সে মা হারিয়েছে কত আশা হয়ত: ওর মনে নীরবে

          কেঁদেছে যা ওর মা থাকলে প্রকাশ পেত কত স্বাদ-স্বপ্ন বুকে চেপে রেখেছে যার

          কিছুই আমরা জানি নাবাবাকে হারিযে মেয়েটা ঠিক মতো হাসতে ভুলে গেছে

          ওর বাকী জীবনটা ইচ্ছে করে আধাঁরে ডুবিয়ে দিতে পারি না (চলবে)

সুজন সখী একসাথে

জিয়া হক

 চাইনা শান্তি চাইনা সুখ

 চাইনা প্রিয়ার গোমড়া মুখ

                                                      

 টাকার বস্তা চাইনা ধুর

 ক্ষুধার জ্বালায় রাত-দুপুর!

 

 চাইনা ফ্লাট বস্তিঘর

সবাই আপন আত্ম-পর

 

 বাঁচবো কেবল ডাল-ভাতে

 সুজন-সখী একসাথে   

                                 ২১ কিংবা ৭১                    

আমি কালপুরুষ

 : আমাকে একটি মুহূর্ত দাও-

মৃত্যুর চেয়ে সহজ, আকাশের চেয়ে অনন্ত,

প্রার্থনার চেয়ে শান্তিময়

তোমাকে আমি ভালবাসা দেব

 

-এখন বসন্ত নেই এখানে,

চোখহীন দেখা ভুল চোখে কেবল সূর্য;

শীতের কল্যাণে পবিত্র প্রাণের ক্লান্ত উল্লাস;

বরং আমাকে তুমি মাঠ দাও অবারিত

 

: আমাকে তুমি একটি রাত্রি দাও-

নির্জন, শৌখিন মাঝির নৌকোর মত

অলৌকিক স্থির

তোমাকে আমি দেব স্বপ্ন

 

-এখানে রাজপথে শুয়ে আছে রাত্রির চেয়ে

অন্ধ, সমাজের কিছু অশ্লীল জীবন;

সেখানে ঘুম নেই;

তুমি আমাকে একটি বিবেক দাও

 

: আমাকে তুমি স্পর্শ দাও-

মৃত্যুর চেয়ে হিম, ভোরের চেয়ে নরম,

জীবনের চেয়ে গভীর,

আমি তোমাকে উষ্ণতা দেব

 

-আমার হৃদয়ের কোন শরীর নেই

নষ্ট মুহূর্ত জন্ম দেবেনা মহৎ কোন দৃশ্য;

পৃথিবীর শরীর শুয়ে আছে অসুস্থ,

আমায় একজন ফ্লোরেন্স নাইট এঙ্গেল দাও

 

: তুমি আমাকে কিছু শব্দ দাও-

সত্যের চেয়ে সুন্দর, পাহাড়ের চেয়ে উদার,

বৃষ্টির চেয়ে নির্মল,

আমি তোমায় একটি কবিতা দেব

 

-শব্দশ্রমিকরা এখন মজুরীহীন,

সময়ের অদৃশ্য কারাগারে রক্তাক্ত,

কবিতা আজ নির্বাসনে যাক

আমায় আর একটি ২১ কিংবা ৭১ দাও

 

 কিপটে বুড়ো কাক

তাহমিদ উল ইসলাম

হাড়কিপটে লোক ছিল সে,

বলতো কথা কেঁশে কেঁশে,

রাখতো জুতো মাথায়

একদিন এক কাক এসে,

তার সে মাথার ওপর বসে,

খামচে ধরলো সেথায়

রেগে মেগে বুড়ো আঁটে ফন্দি,

কাকটাকে করবে সে বন্দী

কিন্তু কাক মন ভুলালো কথায়

আগলিয়ে সে  রাখবে বুড়োর ধন,

এইনা বলে  ভুলালো তার মন,

যদিও  কাক বিষ্ঠা দিলো বুড়োর প্রিয় কাঁথায়

বুড়ো তাই সারাদিন কেঁদে মরে,

কাঁদতে কাঁদতে পড়লো জ্বরে,

কাক এসে ফের ঢালল পানি  মাথায়

আনন্দে বুড়ো  হল বেশ খুশি,

দান করতে করলো না গড়িমসি,

কাকের স্মৃতি রাখল বুড়ো লোকগাঁথায়

পড়বেনা আর পদাঙ্ক

আলমগীর সরকার লিটন

আট চরণের খাট-পালঙ্ক

কেমনে সাজাবে

বিধির কৃপায় ঠিক যে সাদা

বস্ত্রে জড়াবে ।।

আগে পিছে ডানে বামে

কে সাথে যাবে

আত্মহারা মনে ব্যথা

সবাই যে পাবে।

ফেরেশতারা দেখতে পাবে

পাপ-পুণ্যের গান শুনাবে

তখন হবেটা কি

ভাবতে থাকি

পড়বেনা আর পদাঙ্ক 

কঠিন বিচার হবে ।।

/span

ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। সপ্তম (ঈদুল ফিতর) সংখ্যা।। আগস্ট/২০১২ ঈসাব্দ


সম্পাদকঃ শাহ আলম বাদশা

সহ-সম্পাদকঃ দেলওয়ার বিন রশিদ

ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত। লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ

krondosee@yahoo.com

সম্পাদকীয় ছবি 

ভিনদেশী/ভিনভাষী লেখা 

স্বপ্ন

মূলঃ DREAM By Langston Hughes
অনুবাদঃ ডা.সুরাইয়া হেলেন

স্বপ্নকে নিবিড়ভাবে ধরে থাকুন
কারণ যদি স্বপ্নের মৃত্যু হয়
জীবন হয়ে উঠবে এক ডানাভাঙা পাখি
হারিয়ে ফেলবে উড়বার শক্তি!

স্বপ্নকে জড়িয়ে থাকুন
কারণ স্বপ্ন ভেঙে গেলে
জীবন হয়ে উঠবে শস্যহীন মাঠ
জমাটবাঁধা হীমশীতল বরফ!


প্রিয় বালিশের প্রতি 

 মূল ইংরেজি কবিতা : মাইকেল মধুসূদন দত্ত

অনুবাদ : সায়ীদ আবুবকর

ওহে মম নিঃসঙ্গ শয্যার একমাত্র সাথী, সুবালিশ মোর! 

সেই সব যুবা, যারা বিষাদে কাটায় রাতি বধূহীন নিদ্রাহীন অশান্তির ঘরে,

তোমারে সৃজিলা প্রভূ তাহাদের তরে সহজেই যাতে তারা সব কষ্ট যেতে পারে ভুলি

এবং করিতে পারে তব সাথে হর্ষে কোলাকুলি!

কিসের বা কষ্ট তাহে, কিসের বিষাদ

যদিও এ ওষ্ঠ মম না পারিল নিতে কোনো সুন্দরীর অধরের স্বাদ?

নাহি তাতে খেদ মোর, তাহা লাগি এতটুকু দুঃখ না করি

আমার তো আছো তুমি সুকোমল স্বাস্থ্যবতী বালিশ-সুন্দরী!

যবে নিশি আসে নামি পৃথিবীর ’পরে;

প্রকৃতির তুলি দিয়া আঁকাআঁকি করে

মেদিনী গগন আর জলধির মুখ;

সেই ক্ষণে, মম এই তাপিত অন্তরে

তুমি শুধু ঢালি’ দাও কী মধুর সুখ!

এমন দয়াদ্র বন্ধু, বালিশ আমার,

এই ধরাধামে দুটি আছে বলো কার!

যদিও এ শয্যা ’পরে পড়েনি লুটিয়ে কোনো উর্বশীর রূপ,

শোয়নি সুন্দরী কোনো, স্বর্গধাম মোর প্রতি বিরাগ বিরূপ;

কিন্তু তাতে কষ্ট কী বা—সব কষ্ট সব দুঃখবিষ

তব স্পর্শ দিয়া ঘুচায়ে দিয়াছ তুমি, হে আমার রূপসী বালিশ!

কাহারও প্রেমিক আমি নই, কাহারে না আমি ভালোবাসি;

একদা যদিও ঢের বাসিতাম ভালো, বন্ধুগণে—সেই প্রেম হইয়াছে বাসি;

কত মানবিরে, আহা! দিয়াছি হৃদয়, কী দিয়াছে তারা বিনিময়ে?

দিয়াছে মৃত্যুর জ্বালা, দুঃখশোক ভাঙা সে-হৃদয়ে!

জীবন পেয়ালা আজি হয়ে গেছে পরিপূর্ণ শুধু তিক্ততায়—

কারণ তাহারা কেউ বাসে নাই ভালো; তবু এ ধরায়

একজন তো আছে মোর বেদনার সাথী

সুন্দরী, বিশ্বস্ত, যার সনে মহানন্দে কেটে যায় রাতি!

সুপ্রিয় বালিশ মোর, বুকে এস, বক্ষমাঝে ঢালো সুখমধু;

 ধিক সব মানবিকে! আজ থেকে তুমি হও সম্রাজ্ঞী আমার, জীবনের একমাত্র বধূ ।

বরফ-ধর্ম

গোলাম কিবরিয়া পিনু

পৃষ্ঠপোষক-তোষক বিছিয়ে

কাকে ঘরে ডাকে?

উৎসবসজ্জায়-লজ্জায় লজ্জায়

অন্তঃপুরে

ভেঁপু বাজিয়ে

কে আসতে চায় ঘুরে?

এতটা সাজিয়ে

যাকে-তাকে,

ভূরিভোজনের পর-

খাট-পালঙ্কে মানায়?

কানায় কানায়

উদয়গিরির আলো? নাকি-

ফারেনহাইট-লাইট?

গৃহস্বামী কি ভূমিতলে?

বরফ-ধর্মে যায় গলে?

ভিনদেশী ভালোবাসা

লিয়াকত হোসেন

রাত একটু গভীর হলে এগিয়ে যাই খালি পায়ে। ঠান্ডা বাতাস বইছে বেশ। ভূত নেই জানি-তবুও কিসের যেন সাড়া পাচ্ছি মনে মনে। ভরসা একটাই চোর ডাকাত নেই এখানে। বেশি বিপদ হলে ১১২ নম্বর তো আছেই। সাথে সাথে পাওয়া যাবে অতিভদ্র পুলিশ বাহিনীকে। ওদেরকে কার্টুন মনে হয় আমার মাঝে মাঝে। কারন ওরা সন্দেহভাজন অপরাধীদের সাথেও এমনভাবে কথা বলে যেন নিজেরাই কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। যাই হোক, এত রাতে বাইরে বের হয়না কেউ সাধারনত, উইকেন্ড ছাড়া। ওদের রুটিনে ৭টায় ডিনার, ৮টায় ঘুম। ভোরে ছুটবে কাজে। কেবল শুক্র আর শনিবার রাত এলেই ব্যতিক্রম। আজ শুক্র বা শনি কোনোটাই না। আমার বেরুনোর উদ্দেশ্য হলো আজ একুশে ফেব্রুয়ারী। রাত ১২ টা বাজার আগেই যে আমাকে পৌঁছাতে হবে শহীদ মিনারে। এই অজপাড়া গাঁয়ে তো আর শহীদ মিনার নেই। তাই কমিউনকে আগেই বলে রেখেছিলাম ফুল দিব শহীদ মিনারে। কাঠ আর কাগজ দিয়ে নিজেই একটা শহীদ মিনার বানিয়ে রেখেছিলাম বিকেলে। শহীদ মিনার তো হয়নি; তবে শহীদ মিনারের মত কিছু একটা হয়েছে। এক ঘন্টা ওটা মূল চত্ত্বরে রাখার অনুমতিও দিয়েছে ওরা। ভ্রাম্যমান শহীদ মিনার আর কি। স্টকহোম থেকে ৩১৫ কিমি দূরে ছোট্ট এই গ্রামে হাজার দেড়েক লোকের বাস। সুইডিসদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশীও বাস করে এখানে। বিশেষ করে ডেনমার্ক, জার্মানী, নেদারল্যান্ড থেকে আগত অনেক পর্যটকই এখানে এসে আর ফিরে যায়নি। কথিত আছে, মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষনে আর ঘরবাড়ি সস্তা হওয়ার কারণে সামারে বেড়াতে আসা এইসব বুড়োবুড়িরা ভিলা কিনে জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল খুঁজে নিয়েছে ২.১৯ বর্গকিলোমিটারের এই গ্রামে। মাসকয়েক আগে আমার আগমন তাই ওদের পরিসংখ্যান খাতায় নতুন একটা দেশের নাম যোগ করেছে। হ্যাঁ, আমিই একমাত্র বাংলাদেশী এখানে। একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানের অনুমতির আবেদনপত্রে তাই অংশগ্রহনকারী সংখ্যা মাত্র একজন দেখে মিসেস বিরগিটা জোহান্সন বেশ ঘাবড়ে গেলেন। ষাটোর্ধ এই মহিলাটি কমিউনে আমার কন্টাক্ট পারসন। হেসে বললেন, তুমি তো একা, চাইলে আমি কিছু পাকিস্তানীকে বলে দেখতে পারি তোমার অনুষ্ঠানে সাহায্য করার জন্য।(উল্লেখ্য, মারিয়ানালুন্ডে একটা এসাইলাম ক্যাম্প আছে, যেখানে বেশ কিছু পাকিস্তানী বাস করে।) আমি হাসব না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না। শুধু বললাম, ওরা সাহায্য করলে তো আজ আমাদের এই দিন পালনেরই প্রয়োজন পড়ত না। সে কিছু বুঝল বলে মনে হল না। তবে তার অজ্ঞতায় বিষ্মিত হলাম না। শুধু সুইডেনে কেন; আমি ইউরোপের অনেক দেশেই দেখেছি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস বলে যে একটা দিবস আছে তা তারা জানে না। তাই সুযোগ পেলেই গর্বভরে ওদের জানিয়ে দিই, আমরাই একমাত্র জাতি যারা নিজের মায়ের ভাষার জন্য প্রান দিয়েছে। শুনে হতবাক হয় তারা। বিরগিটাকে জোরগলায় বললাম, আমি একাই করবো। তুমি শুধু অনুমতিটা নিয়ে দাও। আমার একগুঁয়েমি বেশ ভালই জানা আছে ওর। তাই আর কথা বাড়াল না। আমার বাসভবন থেকে ২০ মিনিটের হাঁটাপথ মূল চত্ত্বরটা, যেখানে ফুল দিব। জানি কেউ নেই সেখানে এখন। রাত বারোটায় কে আর ঘুরবে জঙ্গলে? আমি বেশ উত্তেজনা অনুভব করছি। ভয় নেই মনে এখন। বুকের ভেতর আর্শ্চয্য এক শুণ্যতা কেবল। এটাও নতুন অনুভূতি আমার জন্যে। বিদেশ বিভূঁইয়ে এসেও প্রতি বছরই তো পালন করেছি দিনটা। আজকের আর্শ্চয্য এই অনুভূতিটা শুধু আমি একা বলে? হবে হয়তবা। গল্পের শেষটা নাটকীয় হবে ভাবিনি। মূল চত্ত্বরের কাছাকাছি পৌছে যা দেখলাম অভাবনীয়। বিরগিটা দাড়িয়ে আছে ফুল হাতে। ঠান্ডায় কাঁপছে কনকন করে। চারটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়ানো। অভিবাদন জানালো বিরগিটা। বুড়ো পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে বলল, তুমিই তাহলে লিকুয়াট? (ওদের মুখে নিজের নাম শুনলে দুঃখ হয়) আমি বললাম, হ্যাঁ, আমিই লিকুয়াট। শুরু হলো মূলপর্ব। জনা আটেক পুলিশ, বিরগিটা আর আমি। বিরগিটা কি করবে বুঝতে পারছে না। বারবার তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমি আইফোনে বাজিয়ে দিলাম সেই গান; যে গান শুনলে রক্ত গরম হয়ে যায় আজো, যে গান শুনলে ‘৫২ তে জন্ম না হওয়ায় দুঃখ হয়- সেই গান; আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভূলিতে পারি? ফুল নিয়ে এগিয়ে গেলাম শহীদ মিনারে। আমার পেছনে বিরগিটা। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, আমি কি ফুল দিত পারি এই বেদীতে? মাথা নেড়ে মৌন সম্মতি দিলাম আমি। ঠিক তখনই বাতাসে হেলে গেল আমার ৫ ফুট উঁচু শহীদ মিনার। আর তখনই দু’জন ছোকরা বয়সী পুলিশ দৌড়ে এসে দু’দিক থেকে সামলে ধরে রাখল ওটাকে। আমি ফুল দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম নিরবে। দশ হাজার মাইল দূরের আমার দেশের গন্ধ পাচ্ছি যেন। বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করছে। কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে মারিয়ানা লুন্ডের আকাশে। আমি অপলক তাকিয়ে আছি কাগজের লাল বৃত্তটার দিকে। কতক্ষণ হলো জানি না। সন্বিত ফিরল ঘাড়ে কারো হাতের ষ্পর্শে। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম বিরগিটার হাত ওটা। চোখে পানি ওর।কাঁদছে কোথাকার কোন ভিনদেশী এই বুড়িটা। চোখ মুছতে মুছতে বলল, দেশের জন্যে এমন করে কাউকে কাঁদতে দেখিনি আমি আগে কাউকে। তাই সামলাতে পারলাম না। সত্যিই তোমরা অনেক ভালোবাস তোমাদের দেশকে। হাসার চেষ্টা করলাম আমি। শুধু বললাম, নিজের দেশকে কে না ভালোবাসে বলো? ফিরে চললাম শেষে। হেলে পড়া শহীদ মিনার আর দুই তোড়া ফুলকে পিছনে রেখে। তবে সাথে নিয়ে এলাম অনেক ভালোবাসা। আমার দেশের প্রতি, আমার মায়ের ভাষার প্রতি অনেক অনেক ভিনদেশী ভালোবাসা।

শাহ আলম বাদশা’র কবিতা 

Δপাপ যদি হয়

উদোম শরীরে কিংবা ফিনফিনে পোষাকে যখন

দুলিয়ে তুমি কোমল দেহবল্লরী 

উগ্র প্রসাধনে চলে যাও মুক্ত-স্বাধীন–

হৃদয়ে তখন আমার মাতাল হাওয়া বয়ঃ

আর দাপাদাপি করে শুধু নরকের কীট;

মনের পশুটাও ক্ষেপে ওঠে বেগতিক 

ঠেকাই তাকে বলো, কী সাধ্য আমার

 

সর্পিল গতি হেঁটে যাও তুমি—- 

ভেসে চলে বাতাসে গন্ধ তোমার

পাগল আমি চেয়ে থাকি অপলক 

পাপ যদি হয়, বলো দোষ কি আমার! 

 

পতঙ্গের মতো হয়ে বেভুল-মাতাল 

নিজেকে দিতে যদি না পারি সামাল;

কিংবা মোহের আগুনেই কভূ দিয়ে দিই ঝাঁপ 

দায়ী কি হবেনা তবু তোমার শরীর

একাকীই নেবো আমি নিন্দার ভাগ!!

Δছুটে যাই নষ্টলোক 

ছন্দিত পদভারে হেঁটে যাও তুমি 

দুলিয়ে দুলিয়ে কোমল নিতম্বদ্বয় 

খেলা করে কীযে দেহের ভূভাগ–

উথাল-পাথাল যেনো ঢেউয়ের নাচন!

 

তুমি কি বুঝতে পারো বা দেখতে পাও 

কী নাছোড় তোমার অদৃশ্য চূম্বক?

কেমনে বিদ্ধ করে আমার হৃদয়-শরীর 

বড়শীবিদ্ধ হয় যেমন দুরন্ত মাছ;

হায়, কী করেই বা দেখবে আবেশীয় চোখ!

 

কিংবা টিভি-সিনেমার পর্দায় নাচো গাও 

তখনো কি ভাবো, তোমার দেহের নাচন–

জাগায় মনের ভেতর অবাধ্য জোয়ার

মধুর আকর্ষণে কাজ ভুলে মাতাল আমি

মন্ত্রমুগ্ধের মতোন ছুটে যাই নষ্টলোক!

 

ষোড়ষী কিংবা শিশুও কি তখন আর 

অভয়ারণ্যেও থাকে নির্ভয়-নিরাপদ?

আমি না হয় মদমত্ত বেভুল, হোক সাজা হোক

কিন্ত সাকী হে, সাজা কি হয় কখনো তোমার!!    

পান্তাভাতের ঘোলা ঝোলে এঁকে 

প্রফুল্ল রায় সদাশীত

যদি থাকো রাজি দৃষ্টির উষ্ণতায় ভিজেভেজাবো হার-পাঁজর 

 মেঘের ভেলায় চড়ে পাড়ি দেবো দুচোখের সীমাহীন সাগর 

 পান্তাভাতের ঘোলা ঝোলে আঁকবো, নেমে প্রেমের হাঁটুজলে

 ঝরাপাতার পিঠে ক্লোরোফিল-প্রেমে খুঁজে নেবো শুধুই সবুজ

জলস্মৃতির অনুভূতিতে বর-কনে খেলা, শাপলাফোঁটা দিনে

 সিদল কিংবা পেলকা শাকে খোঁদাই করবো তোমার নেমপ্লেট

 মনের গহীন খাঁচায় যদি ডাকও, ব্যাকুল করা মনহরা  সুর তুলে

জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে তুলতুলে নরম দেহে অন্তর খুলে 

শুনাবো মা-মাটির শেকড়সন্ধানী গান, স্বদেশী ফুলের ঘ্রাণ

 আরও দেবো  বিচ্ছেদভোলা  কুলকুল সুরতোলা নদীর যৌবন

 স্মৃতির আকাশে একফালি চাঁদহাসি নিশ্চুপ সূরের উজ্জ্বল কথা

কিংবা মেঘে ঢাকা আকাশতলে অতৃপ্ত ঘনঘোরে গুপ্ত অভিজ্ঞান

স্বপ্ন রঙিন বাস্তবতা কঠিন

আবুল বাশার শেখ

 খরস্রোতা পদ্মা হারিয়েছে তার গতি, ভাঙ্গনের তীব্রতা বলতে গেলে সঙ্কীর্ণতায় রূপ নিয়েছে। নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েও ধরে রাখা যায় না। সময়ের আবর্তনে পদ্মা শুকিয়ে যায় আবার বর্ষা এলে ফিরে পায় তার যৌবন। এই পদ্মার পাড় ঘেষেই নিজ অবস্থানে ঠাঁই দাঁড়ানো শিবচর উপজেলার বাহেরচর গ্রামটি। এই গ্রামের একুশ বছরের সহজ সরল তরুন শাহিন। চেহারা হাবা টাইপের হলেও বুদ্ধিতে নিজেরটা যোল আনা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত জন। তিন বোন, দুই ভাই আর মা-বাবা। বড় বোন দু’টোর বিয়ে হয়ে গেছে আর বড় ভাইও বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকায় চাকুরী করে। পরিবারে এখন ছোট বোন সাথি আর মা-বাবাকে নিয়ে ভালই দিন যাচ্ছে তার। নিজেদের যেটুকু জায়গা জমি আছে সে টুকু চাষ বাস করে যে ফসল হয় তাতে বছর চলে যায়। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী জমিতে নিজেদের পাওয়ার পাম্প দিয়ে পানি দিয়ে ভালই আয় হয়। শাহিনের বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রতিদিন বাজার করে যে লাভ হয় তাতে সংসারের টুকি টাকি প্রয়োজন মিটে যায়। শাহিন লেখা-পড়া তেমন করেনি, প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত ব্যাস, তারপরই ক্ষেতে খামারে কাজ। শাহিন তার ইচ্ছে মত এ দিক সে দিক চলা ফেরা করে। কোন সময় কারও কথা সহজে আমলে নেয় না এমন কি প্রতি বেলার খাবারওটাও সে সবার আড়ালে খেতে পছন্দ করে। এজন্য সবাই তাকে আলাদা চোখে দেখে। বড় ভাইতো সারাক্ষন তাকে নিয়ে একথা সে কথা বলে বেড়ায়। সারা দিন কাজ করে আর সন্ধ্যা হলেই ছুটে যায় পার্শ্ববর্তী চান্দের বাজারে। সেখানে চায়ের দোকানে চা পান করে লেগে যায় কেরাম খেলায়, রাত দশটা কিংবা এগারটা পর্যন্ত চলে এই খেলা।
 শাহিনের মা-বাবা সংসারের কথা চিন্তা করে ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে কারণ শাহিনের মায়ের এখন বয়েস হয়েছে ছেলেকে বিয়ে করালে একটু শামিত্ম পেতে পারে। চারদিকে মেয়ে দেখা শুরু হলো। অনেক মেয়েই দেখলো কিন্তু পছন্দের কোন মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। শাহিনের দূর সম্পর্কের এক ফুফু তাদের এলাকায় একটি মেয়ের সন্ধান দিলে চুপি চুপি সে তাকে দেখতে যায়। প্রথম দেখাতেই মেয়েকে তার বেশ ভাল লাগে। মেয়ের পরিবারের সবার সাথে সে কথা বলে এমন কি মেয়ের সাথেও। মেয়ে তার সাথে মোবাইল ফোনে অনেক কথাই বলে। এবার মেয়েটির কথা তার মা-বাবাকে বলায় তারাও মেয়ে দেখতে গেল। 
 মেয়েটির নাম তাহমিনা, বয়স বড় জোর পনের কি ষোল, দেখতে শ্যামলা বর্ণের। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে লেখা-পড়া করে। তাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছয় জন, তিন বোন এক ভাই আর মা-বাবা। বাবা কৃষি কাজ ও অবসর সময়ে অন্যের কাজ কর্ম করে সংসার চালায় আর বড় বোন শারমিন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকুরী করে। এখানে আরেকটি কাহিনী না বললেই নয় তাহমিনার মা-বাবার প্রথম প্রথম কোন সমত্মান হচ্ছিল না তাই পাশের গ্রামের এক আত্নীয়ের কাছ থেকে শারমিন নামের একটি মেয়েকে দত্তক আনে। এর কিছুদিন পর তাহমিনা তার মায়ের পেটে আসে, এরপর এক ভাই ও এক বোন। গ্রামের সহজ সরল মেয়ে তাহমিনা। বিয়ে কি জিনিস তাই সে বুঝেনা। বয়সের চঞ্চলতায় সে মোবাইল ফোনে ভালই কথা বলতে পারে। প্রায় সময়ই শাহিন মোবাইলে তাহমিনার সাথে কথা বলে। একথা সে কথা এক সময় ভাল লাগা ভালবাসা হয়ে যায়। তাহমিনার মা-বাবা শাহিনদের বাড়িতে দেখতে যায়। তাদের বাড়ি ঘর, পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে মেয়েকে এই বাড়িতে বিয়ে দিতে সম্মতি জানায়। কারণ মোড়ল বাড়ির সুনাম তারা এলাকার লোকজনদের কাছ থেকে বেশ শুনতে পেয়েছে। দু’পক্ষের কথা বার্তা ঠিক হলে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়।
 কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় মেয়ের বয়স ব্যাস এখানেও চিরাচরিত ছোট্ট জালিয়াতি। উপজেলা পরিষদ থেকে মেয়ের জন্ম নিবন্ধন কার্ডে বয়স বাড়িয়ে আঠার বছর করে দেওয়া হলো। আর কাজী সাহেবও এই বিষয়টি আমলে না নিয়ে এলাকার মাতববর টাইপের লোকদেও নিয়ে কাবিন নামায় স্বাক্ষর নিলেন। যথা সময়ে বিয়ে হলো। শ্বশুর বাড়ির লোকজন সবাই পছন্দ করল তাহমিনাকে। বিয়ের এক রাত পার হতেই দেখা দিল নতুন বিপত্তি। তাহমিনা শাহিনের সাথে তেমন কোন কথা বলে না। কথা বলে শাহিনের মামাতো ভাই হানিফের সাথে। হানিফ উঠতি বয়সের তরম্নন। মেয়েদের কিভাবে পটাতে হয় তা ভাল ভাবেই জানে। ভাবি লাগে তাই তার সাথে কথা বার্তা বলতেই পারে তাই এই বিষয়টি কেউ আমলে নেয়নি। এলাকার রীতি অনুযায়ী পরদিন মেয়ের বাবা এসে জামাই সহ মেয়েকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল।
 বাদেরদিন যখন আসতে হবে তখন তাহমিনা শাহিনদের বাড়িতে আসবে না বলে জানায়। কারণ হিসেবে বলে ঐ বাড়িতে তার মন বসে না, ভাল লাগেনা। যা হোক অনেক বলে কয়ে আবার তাকে তার শ্বশুর বাড়িতে আনা হলো কিন্তু ঐ বাড়িতে এসেই শুরম্ন হলো নানা টাল বাহানা। ঠিক ভাবে খাবে না, রাতে স্বামীর কাছে যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। পরদিন তার বাবা এসে তাকে নিয়ে গেল মেয়ে ছোট তো তাই তাকে বুঝিয়ে তারপর পাঠাবে। এবার তাহমিনা আর ঐ বাড়িতে আসবে না আর তখন বের হতে থাকে নানা অজানা কথা। তাহমিনা বিয়েতে রাজি ছিল না, তার মা-বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ছোট বলে সে কিছু করতে পারেনি। পাগলের ভান করে বার বার অজ্ঞান হয়ে যায় আর বলে কি ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছ! সে কোন কিছু ঠিক ভাবে বুঝেনা, ভাল ভাবে কথা বলতে পারেনা। তখন তার মা-বাবা বলে- তাহলে তুই শাহিনের সাথে কথা বলছিলে কেন? তাহমিনা বলে মজা করে ছিলাম। এ ধরনের আরও কত কথা। অপরদিকে শাহিনের পরিবারে বউয়ের জন্য সবাই অস্থির। তার মা-বাবার কথা বিয়ে করিয়েছি কাজের জন্য এখন বউ যদি না আসে তবে এ বউ রেখে কি হবে! তাই তারা শাহিনকে তার বউকে তালাক দিতে বলে। কিন্তু শাহিন তার বউকে তালাক দিবে না। সে বলে বিয়ে করেছি কি ছেড়ে দেওয়ার জন্য? বউ যদি আমাকে পছন্দ না করে তবে সে চলে যাক, আমার কোন দুঃখ নেই কিন্তু আমি তাকে কোন দিনও ছাড়বোনা। এখন শাহিন ঠিক ভাবে খায় না, কারো সাথে কথা বলে না। দিন দিন সে পরিবর্তন হতে থাকে। 
 এদিকে তাহমিনাকে তার জামাই বাড়িতে পাঠানোর জন্য তার মা-বাবা নানা ধরনের কবিরাজের দ্বারস্থ হতে লাগল কিন্তু কোন কবিরাজীই কাজে আসছে না। তাহমিনাকে তার মা-বাবা যে-ই স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যায় তার সাথেই সে আবার চলে আসে। সে তার স্বামীর বাড়িতে থাকবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সে সাথে এও বলে যে যদি তাকে ঐ বাড়িতে জোরপূর্বক রাখা হয় তবে সে আত্মহত্যা করবে। তাই বাধ্য হয়ে তাকে তার মা-বাবা সাথে নিয়ে আসে। শাহিন অভিমান করে চলে আসে ঢাকায়। মোবাইল ফোনে যদিও যোগাযোগ রাখে কিন্তু সামনে গেলে তাহমিনা তাকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
 বাল্যবিবাহের কবলে পড়ে অশান্তির আগুনে পুড়তে থাকলো দু’টি জীবন। কি তাদের সমস্যা সেটাও স্পষ্ট নয়। সিদ্ধামত্মহীনতায় ভুগতে থাকে তাদের পরিবার। শুধুমাত্র বয়সের হিসেবটা ঠিকমত করতে না পারায় দু’টি জীবনে নেমে আসছে অশোভ মেঘের কালো ছায়া।   

তীরন্দাজ

রাজকুমার

ঘুরছে আখি উড়ছে মানুষ আগুন ঘুমে অন্ধচাঁদ

মুক্ত আকাশ মেলছি ডানা ছুড়ছে যে তীর, তীরন্দাজ

চলছে গাড়ী বাড়ছে বাড়ী উঠছে দেয়াল না ভাঙার

নাচছে নদী বসনখোলা ভাঙছে পাঁজর নয়তো পাড়

ভগ্ন পাখা কন্ঠ বাঁকা চাইছি তবু পাখির গান

জাদুর মাঠে ঘাসের চুমে ডাকলো ওঁ! কোন লোচ্ছ্বাস

নতুন ধানে রোদের বানে সাজলো রঙিন পুতুলনাচ

উড়লো সকাল ঘুরছে দুপুর জমবে বিকেল অকস্মাৎ

 প্রতীক্ষা

ফিদাতো মিশকা 

 জজ কোয়াটার, শহীদ গেদু সড়ক। আমি দাঁড়িয়ে আছি। প্রচণ্ড রোদ   ।আমার গা দিয়ে দর দর  করে ঘাম ঝরছে ।একটার পর একটা রিকশা যাচ্ছে।আমি রিকশা গুনছি। তিনশো বিশ,তিনশ একুশ ……। ক্লান্তি লাগছে ,পিপাসা পাচ্ছে ,কিন্তু এ জায়গা থেকে অন্য কোথায় যাওয়া যাবে না ।পাশের ডাস্টবিন থেকে গন্ধ আসছে ।কিন্তু এ গন্ধে আমার সমস্যা হচ্ছে না ,আমার অভ্যাস হয়ে গেছে ।আমি রেবার কথা ভাবতে থাকি ।রেবার সাথে আমার দেখা হয়েছিল একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে ।গায়ে হলুদের রাতে হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখে আমার মাথা ঘুরে যায়।কেন জানি বারবার মনে হতে থাকে এই মেয়েটাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি, জনম জনমের পরিচিত।

আমি ঘুরপাক খেতে খেতে নীলা ভাবিকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা ভাবি, ঐ কোণায় বসা ফর্সা করে মেয়েটি কে ?

ভাবী বলে, ও হচ্ছে আমার কাজিন সুপ্তির বান্ধবী রেবা,কি ব্যাপার মনে ধরল নাকি। তবে ওকে লাইন দিয়ে লাভ নাই।ও ডাক্তার ছেলেদের একদম পছন্দ করে না। বলে এরা তো পড়তে পড়তে যন্ত্র হয়ে  যায় আমায় সময়ই দিবে না।

আমি বলি ,তাই নাকি!!!

রেবা সে সময় ভারসিটি ভর্তির কোচিং করত। এ রাস্তা দিয়ে রেবা নিয়মিত যাতায়াত করত ।আমার হোস্টেলে মন ঠিকত না। তিনটা বাজলেই আমি বেড়িয়ে পড়তাম । ঠিক এইখানে দাড়িয়ে থাকতাম । ওর রিকশার জন্য অপেক্ষা করতাম। চারটা বাজার ৫-১০ মিনিট আগে একটা রিকশা আসতো, আমার পাশ দিয়ে চলে যেত ।বড়োজোর ৩০ সেকেন্ড ।কি একটা শান্তিই না আমাকে ছুঁয়ে দিতো।এভাবে ৩ মাস চলে যায় ।

আমি প্রায়ই এখানে দাড়িয়ে থাকতাম। জজ কোয়াটারের আমগাছে কাকের চিৎকার, লোকজনের কোলাহল দেখতাম ,আর রিকশা গুনতাম ।কোন রিকশাতে যখন কোন যুগল দেখতাম ,তখন কি এক শূন্যতা আমাকে ছুঁয়ে দিত।তবু ৩০ সেকেন্ড এর এক বিশাল শান্তি নিয়ে  আমি ফিরতাম ।আমি বরাবরই ভীতু ছিলাম ।তাই জানতাম কখনো রেবার সামনে দাঁড়াতে পারব না। আর রেবা তো ডাক্তার ছেলেদের পছন্দ করেই না।

একদিন আমি প্রতিদিনকার মতো দাড়িয়ে ছিলাম ।রেবার রিকশাটা হঠাৎ এসে আমার সামনে দাড়িয়ে যায় ।আমি ওবাক দৃষ্টিতে দাড়িয়ে থাকি। রেবা নেমে এসে বলে ,

আপনি এখানে প্রতিদিন দাড়িয়ে কি করেন, আপনি কি ভাবেন যে আমি কিছু বুঝি না মেয়েদের এক মাইলের মধ্যে তাঁদের আশেপাশে কেঊ তাঁদের দিকে তাকালে তাঁরা সেটা বুঝতে পারে ,আর আপনি এতদিন ধরে এরকম করবেন আর আমি বুঝব না, দীপ্ত ভাইয়া।

আমার অবাক লাগে রেবা আমার নাম জানে কীভাবে,আমি কথা বলতে পারিনা ।চুপ করে থাকি ।

রেবা বলে ,আমি আপনাকে প্রথম থেকেই জানি, নীলা আপু আমাকে সব বলেছে ,কিন্তু জানতাম না আপনি এতোটা ত্যাঁদড়।মনের কথাটা বলতে হয় জনাব,আর আমি কিন্তু আপনি করে বলতে পারব না ,বূঝলা তুমি ।

আমি যেন সাত আসমান আমার হাতে পেয়ে যাই।

রেবা বলে যায়, শুধু রিকশা গুনলে হবে ?কাল তুমি আমার জন্য অনেকগুলো গোলাপ আর অপরাজিতা নিয়ে এসো আচ্ছা, আমরা রিকশা করে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াব।

রিকশাটা চলে যায়। এক অপার্থিব সুখে আমি ভাসতে থাকি ।

পরদিন আমি রাস্তায় দাড়িয়ে থাকি ।কিন্তু কোন রিকশা আসে না। সন্ধ্যার পর আমি চলে যাই ।কষ্ট কি কষ্ট আমায় ঘিরে ধরে…………………।

সেদিন কোচিং এ আসার পথে ট্রাক এর সাথে ধাক্কায় রিকশা ঊল্টে রেবার মৃত্যু হয় । রেবাকে আমি ভুলতে পারি না। তাই আজো মাঝে মাঝে এসে দাঁড়াই ,জজ কোয়াটার ,শহীদ গেদু সড়ক ,রিকশা গুনতে থাকি ।রেবা আসবে। আমার প্রতীক্ষা ফুরায় না……………………………।

স্বাধীনতার গেটে থমকে আছে লালপরির স্বপ্ন
———————————————
সকাল রায়

পানা ঢাকা পুকুরের পানি এখনো শুকোয়নি।
দেবদারু গাছের আড়ালে নাম না জানা বুনো পাখির কলরবে মুখরিত দ্বিপ্রহর।
বাঁশঝাড়ের কোন এক পাশে ঝোপের ধারে সাদারঙ বক দাড়িয়ে একটু জিরিয়ে
নিচ্ছে। এ বেলা ঘর থেকে বের হওয়া যায়না; রোদ ঝাপটে ধরে যখন শরীরটাকে;
তিক্ততা তখন স্তিমিত করে দেয় সব কাজকে।
পানা ঢাকা পুকুরের পাশেই রয়েছে ছোট ছোট খুপরি ঘরওয়ালা একটা বস্তি।
এবেলা যদি খেতে পায় ওরা ও বেলা থাকে উপোষ। উপোষ থাকা মানুষ গুলোর বুকে
আছে সাহস আর ধৈর্যের মহাপাশ। বস্তির পাশেই রয়েছে বড় পুকুর কলোনি;
বস্তির লাগোয়া উঁচু দেয়াল ঘেরা বাড়িটাই কলোনির শেষ বাড়ি আর বস্তির
শেষ খুপরিটা হলো ঘরওয়ালীর। উপোস থাকা মানুষগুলো উচু দেয়াল ঘেরা এ
বাড়ির ভেতরে আসেনা। চোখ ওদের ঠেকে যায় দেয়ালে অবদিই।
মরচে ধরা লোহার গেট পেড়িয়ে ওদের পা খুব বেশি একটা পড়েনি। ভেতরের
পরিষ্কার ঝকঝকে পথে পড়ে থাকে চুপসানো ফুল; গেটের ফাক থেকে শুধু মাঠ ফুল
আর ঘাট দেখা যায়। ঘরওয়ালীদের ক্ষিদের যন্ত্রনা ভুলে থাকার এক মুক্ত
বিনোদন হলো এই বাড়ির মধ্যেকার নিত্যদিনের রোজনামচা।

এ বাড়ির লোকজন গোটা দশেক।
তিন বছরের সুপ্তি সহ আরও এক জোড়া আট-দশ বয়সী ছেলে মেয়ে আছে ওদের। উপোস
থাকা ছোট্ট ঘরওয়ালীদের আছে আট পায়ের নর-নারী আর ছোট্ট একটা লালপরি আছে
ওদের। ক্ষিদের পেটেও ওরা স্বপ্ন দেখে আগামী দিনগুলোতে ভালো করে খেয়ে
পড়ে বেচে থাকার। ওরা অক্টোপাশের মতো হাত পা মেলে একপাশে থাকে।
উচু দেয়ালের বাড়ির নুপুর ম্যাডাম রোজ কলেজে যায়। জযন্ত তার লাভার।
অর্ধ যুগের প্রেম কিন্তু এখনো হয়নি বাঁধানো ফ্রেম। ফ্রেম বাধাঁই হবে
কাল।
আজ গেছে গায়ে হলুদ।
ফুলপরিদের পেটে তাই খিচুরি পড়েছে সন্ধ্যে বেলা। আহা রোজ যদি এমনি করে
বিয়ে কিংবা গায়ে হলুদ হতো কারো; নিজেদের ভাষায় ওরা সংলাপ বলেই চলে;
দেশের কথা ভাবতে গেলে ক্ষিদেটা মাথাচাড়া দেয়; পরনে ভালো কাপড় জোটেনা;
ওরা ভাবে সরকার বোধহয় অন্ধ নয়তো গরিব; দেশের লোক যে খেতে পায়না সেটা
ভাববার সময় বুঝি খুব কম।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ সমাধি পরে 

লুতফুন নাহার

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

আজ বিকেলের আকাশটা অন্য রকম একটা সৌন্দয্যে ছেয়ে আছে ।পড়ন্ত বিকেলের সোনাছড়া রোদে পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ।সেই রোদ সাদা মেঘের উপর পড়ে কাঁচা সোনার মত পশ্চিমা আকাশটা চক্ চক্ করছে ।পূবের আকাশে রাশি রাশি মেঘ সাদা ও কালো পাল তুলে বেড়াচ্ছে ।শাওনের পশ্চিমা হাওয়া হু হু শব্দ করে বইছে । প্রকৃতিতে সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার মনোরম পরিবেশ ।তাই সায়েম গীটার নিয়ে খোলা আকাশের নীচে চলে এলো প্রাণ খুলে, গলা ছেড়ে ‍সুর তোলার জন্য ।

সায়েম অনেকক্ষণ ধরে গীটারে একটা নতুন সুর তোলার চেষ্টা করছে । কিছুতেই তা মনের মতো হচ্ছে না ।ছাদ থেকে সুরমার ঘরে গীটারের শব্দ ভেসে আসছে ।সুরমা তখন পড়ছিল । সামনে তিার মা্‌র্ষ্টাস পরীক্ষা ।গীটারের শব্দে সুরোর পড়ায় মন বসে না । সুরমাকে টেনে ঘর থেকে বাহির করে নিয়ে যায়।সুরমার মন ছট পট করতে থাকে ছাদে যাওয়ার জন্য ।কিন্তু কোন অজুহাতে যাবে সুরমা ভেবে পাচ্ছে না ।হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এলো গাছের শুকনো পাতা গুলো ছেটে দেওয়া যায় আর গাছে পানি দেওয়া যায় ।তাই কার্টার আর জর দেওয়ার পাত্রটা নিয়ে বের হলো ।ছাদের এক কোনায় বসে তার প্রিয়জন গীটার বাজাচ্ছে ।সায়েম সুরমাকে দেখেও না দেখার ভান করল ।গভীর মনোযোগ দিয়ে সুর তোলছে ।সুরমা গাছের অপ্রয়োজনীয় একটা, দুইটা পাতা ছেটে দিচ্ছে আর ফাঁকে ফাঁকে আড় চোখে সায়েমকে দেখছে ।তার অপ্রকাশিত ভালবাসা প্রকাশ করার আকুল বাসনায় উদ্বেলিত হয়ে উঠে ।এমন র্নিজন নিরারায় মনের মানুষকে পেয়ে তা প্রকাশ করার সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাচ্ছে না।যাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে, যাকে কল্পনায় তার মন হারিয়ে যায় যখন তখন, যাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজাতে গিয়ে তার মনের লাগাম নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়-সে-ই তার ভালবাসার কথা জানবে না তা কী হয়? একদিন নিজেই প্রতিজ্ঞা করেছিল কখনই তার ভালবাসা প্রকাশ করবে না যাতে তার ভালবাসা র্নিমল থাকে ।আজ কিছতেই তার সে প্রতিজ্ঞার কাছে তার হৃদয়ে যে ঝড় বইছে তা আছড়ে পড়ে র্দুবল হয়ে যাক সে তা চায় না ।আজ তার সে প্রতিশ্রুতি নিজেই বলছে, ‘চুপ কর, আমার প্রাণের মানুষকে ভালবাসার কথা বলিতে দাও মোরে অবসর ।’ তাই আর কোন দেরী না করে একটা ফুটন্ত গোলাপ ছিঁড়ে এগিয়ে গেল সায়েমের দিকে ।সাযেম চোখ বন্ধ করে সুর বন্ধনা করছে ।সুরমা ফুল হাতে হাঁটু গেড়ে বসল, মনে হচ্ছে তার দেবকে ফুলের নৈবেদ্যে হৃদয় উজাড় করে তুষ্ট করতে চাচ্ছে ।সায়েম তখনও দেখতে পায় নি। অনেকক্ষণ পর সুরের আবেশে চোখ খুলল ।সুরমাকে ফুল হাতে এমন ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে তার খুব রাগ হলো। জিজ্ঞাসা করল-

       তুই এখানে? আর ফুল হাতে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে আছিস কেন?

             আজ সকালে এ ফুলটা ফুটেছিল তোমার জন্যে ।তাই সতেজ ফুলটা তোমায়

      দিলাম তোমার পরশে একে ধন্য করার জন্য ।

        মানে? ফুলটা ছিঁড়ে আমাকে দিতে হবে কেন? ফুলের সৌন্দয্য তো চোখ দিয়েই

       দেখতে পেতাম যখন ওটা গাছের শাখায় দোল খেত ।

        তা অবশ্য ঠিক ।কিন্তু কোন তরণীর হাত থেকে পাওয়া ফুলের সৌন্দয্যটার আলাদা

       কোন বিশেষত্ব হতে পারে, তাই নয় কী?

       

       আমি প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ এ সুরটা তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ।যখনই

     সুরটা আমার নিয়ন্ত্রণে এল ঠিক তখনই ডির্স্টাব করার সময় হলো ,তাই না ? আচ্ছা,

      মাথায় কী এতটুকু গিলু নেই? গিলু থাকবে কি করে । বুড়ো রবীন্দ্রনাথ কবে গান লিখে

      গেছেন, সেই গান নিয়ে সব সময় ঘ্যানর ঘ্যানর করিস তো তাই । যদি নীজে দু,

      একটা গীত রচনা করে তাতে সুর দিতিস তাহলে তাহলে বুঝতিস সুর সাধনা কাকে

     বলে ।দে ফুলটা দে ।

       না, দেব না ।

         কেন দিবি না? তুই না এতক্ষণ আমাকে ফুল দেওয়ার জন্য উম্মুখ হয়ে বসেছিলি?

        ফুল সুন্দরের প্রতীক ।সে-ই এর সৌন্দয্য এবং পবিত্রতা ধারণ করতে পারে

       যার মনটাও সুন্দর ।

তারপর সায়েম হাত থেকে জোর করে ফুলটা কেঁড়ে নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিল ।হন্ হন্ করে গীটার হাতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-‘আর কেন দিন ছাদে উঠব না ।’ সুরমা ওখানেই বসে রইল । অপমান আর নিরাশার গ্লাণিতে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল ।

 সুরমার বি.এ(অর্নাস)পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে ।ওর ফলাফলের আনন্দে বাড়ীতে আনন্দের বন্যা বইছে । মিষ্টি বিতরণ থেকে শুরু করে মহোৎসবের ঢেউ ।সুরমার এ আনন্দের দিনে বাবা মাকে মনে পড়লেও সে ঠিক করেছে আজ সে কাঁদবে না ।তাই বাবা-মায়ের কবরের কাছে গিয়ে কবরে ফুল দিয়ে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছে ।সুরমার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সায়েমকে সমব্যথী মনে হলেও এই প্রথম সায়েম তাদের সমাধি পাশে গেল ।সুরমা তার বাবা-মায়ের কবরের কাছ থেকে চলে আসবে এমন সময় দেখতে পেল সায়েম ওর পা্শে দাঁড়িয়ে । সায়েম গভীর ধ্যান মগ্ন হয়ে তাঁদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় র্প্রাথানা রত ।সুরমা তার চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছে না ।এই সায়েম কী সেই সায়েম যে সব সময় অত্যাধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে চলে ।আজ মুসলিম ধর্মীয় পোষাকে পেয়ে সেই অনেক দিন আগের সায়েমকে মনে পড়ে গেল-যকন সায়েম পাঁচ ওয়াক্ত নামায় পড়তো ।প্রতি যুম্মা বারে যুম্মার নামায় শেষে তার দাদা-দাদীর কবর, তার চাচী(সুরমার মা)-এর কবর জিয়ারত করত। সুরমার আনন্দের দিনে আরও একটা আনন্দ যোগ হলো । সুরমা কি করবে বঝতে পারছে না্ ।সে কী সায়েমের সাথে এক সাথে বাসায় ফেরার জন্য সায়েমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে, না দৌড়ে গিয়ে জেঠা আর জেঠীকে এ সুন্দর, পবিত্র দৃশ্যের ভাগীদার করবে । কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকে প্রশান্তির ছোঁয়ায় ভরিয়ে তোলছে ।সায়েম ঘুরে ঘুরে সবার কবর জিয়ারত শেষে পকেট থেকে দু’টো গোলাপের গুচ্ছ তার চাচা এবং চাচীর সমাধিতে রেখে সুরমার দিকে হেঁটে আসল ।এই দৃশ্যে সুরমার চোখ আনন্দশ্রুতে ছল্ ছল্ করে উঠল । সায়েম সুরমার মনের অবস্হা বুঝতে পেরে অনেক মমতা মাখা 

এক খানা হাত বাড়িয়ে সুরমার হাতে ধরল । তারপর সুরমাকে বাড়ী নিয়ে এল ।পথে দু’জনের কোন কথা হয়নি । তবুও এ নীরবতা যেন অনেক কথার কাব্যমালা । 

সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে ।মাঝে মাঝে রোদ-বৃষ্টি শেয়াল মামার বিয়ের আনন্দে লুকোচুরি খেলে । সায়েম আজ বাসায় ।আজ তার সাপ্তাহিক ছুটি ।অবসরে সায়েম গীত রচনা, সুরারোপ করা, সুর সাধনা করা-ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে ।কখনওবা ফেইসবুকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় ।বিকেলের দিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ভারী বৃষ্টিপাতে রূপ নেয় ।বৃষ্টির মুর্হুমুহু শব্দ সুরমাকে রোমাঞ্বিত করে ।মন বলে-‘এমন দিনে তারে বলা যায় এমন ঘন ঘোর বরিষায় ।’ সুরমা ছাদে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা ভুলে পূণরায় প্রেমাবেগে উজ্জিবিত হয় ।সায়েমের ঘরে যাওয়ার ব্যাকুলতায় তার অন্তর উদ্বেলিত হয় ।সুরমা মনের বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়ে সায়েমের ঘরে ছুটে যায় ।সায়েম তখন ফেইসবুকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে ।সুরমা সায়েমের পাশে ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়াল ।সায়েম আজ কিছুই মনে করছে না ।অনেকক্ষণ পর বলল-

        কিরে কিছু বলবি?

       এই বৃষ্টিতে বিকেলের নাস্তাটা একটু ব্যতিক্রম হলে কেমন হয় বলো তো সায়েম

       ভাইয়া ?

       হুম! অবশ্যই ভাল হয় ।বৃষ্টির শব্দে তোর মনটা মনে হয় আজ খুব ভাল

        লাগছে ।কি খাওয়াবি বল?

        তুমি যা খেতে চাইবে ।তোমার পছন্দে হবে সব আয়োজন ।

        Well enlist-ফ্রন টোস্ট, সাথে চিলি সচেজ, পপ কর্ণ, বাদাম ভাজা ।আর যদি

        পারিস্ একটা সুপ ।

        OK. Then wait for your delicious food.

কিছুক্ষণ পর সুরমা নাস্তা নিয়ে আসল সায়েমের ঘরে ।সায়েম একা খেলো না সঙ্গে সুরমাকেও খেতে বলল। দু’জন খেতে খেতে সেই শৈশব আর কৈশরের স্মৃতিতে হারিয়ে গেল কথায় কথায় ।দু’জন নস্টালজিক হয়ে পড়ে । তাদের সেই হরিণ-হরিণীর মত বন্ধনহীন অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো, খুনসুটি, মান-অভিমান, দাবা প্রতিযোগিতা,কানা মাছি ইত্যাদি স্মৃতির পাতা থেকে উঠে আসে তাদের গল্পে ।খাবার শেষে সায়েম সুরমাকে একটা গান উপহার দিল-

শিশুতোষ ক্রন্দসী 

সুরাইয়া ও ফুলপরী

ফরিদ আহমদ ফরাজী

জানিস সুমাইয়া, আমাদের বাগানে প্রতি রাতে ফুলপরী এসে ফুল ফুটিয়ে দিয়ে যায়। সুরাইয়ার কথা শেষ হওয়া মাত্রই সুমাইয়া হো হো করে হেসে উঠলো। ওর হাসি দেখে সুরাইয়া তো অবাক! হাসতে হাসতে সুমাইয়া সুরাইয়াকে বললো, তাহলে তো তুই প্রতিরাতে ফুলপরী দেখতে পাস?
- না আসলে ফুলপরী তো আসে গভীর রাতে, তখন তো আমি ঘুমিয়ে থাকি। তাই ফুলপরী দেখা হয় না। তাহলে কিভাবে বুঝলি ফুলপরী এসে তোদের বাগানে ফুল ফুটিয়ে দিয়ে যায়? কথাটা বলে মুখ টিপে হাসতে লাগলো সুমাইয়া। সুরাইয়া বললো আরে ভাইয়াই তো বলছে, প্রতিদিন ফুলপরী এসে বাগানের সব ফুল ফুটিয়ে দিয়ে যায় এবং আমার চকলেটের বাক্সে অনেক চকলেট রেখে যায়। এবার সুমাইয়া বেশ সিরিয়াস হয়ে বললো, দেখ সুরাইয়া আমার ভাইয়া অনেক বই পড়েন। ভাইয়া বলছেন- পৃথিবীতে পরী, ভূত-প্রেত বলতে কিছুই নেই। এসব হল রূপকথা। আর চকলেট? ওটা দেখ গিয়ে অন্য কেউ রেখে যায় তোর জন্য, বুঝলি বোকারাম?

এবার সুরাইয়ার ভারী রাগ হয়ে বললো, আমার ভাইয়া কি আমাকে মিথ্যা কথা বলছে? তোর ভাইয়া বুঝি সব জানে আর আমার ভাইয়া বুঝি কিছুই জানে না? সুমাইয়া মুখ ভেংচে সুরাইয়াকে বললো, তোর ভাইয়া বললো- আর তুই না দেখে না বুঝে বিশ্বাস করলি? এটা কি ঠিক হলো? তার চেয়ে নিজে দেখে শুনে ভালভাবে বুঝে তারপর না হয় আমাকে বলিস। কথাটা শুনে সুরাইয়া মনে খুব কষ্ট পেল। হ্যা আমি আজরাতে নিশ্চয় ফুলপরী দেখবো। ওর কথা শুনে সুমাইয়া হাসতে লাগলো। তা দেখে সুরাইয়া সুমাইয়ার সাথে আড়ি দিয়ে নিজের বেঞ্চে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকলো আর কোন কথা বললো না সুরাইয়া।

 আম্মু প্রতিদিন সুরাইয়াকে দশটার মধ্যে যাবতীয় পড়া শিখিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যান। আজও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু সুরাইয়া আসলে তখনোও ঘুমায়নি। লাইট অফ করার সাথে সাথে সুরাইয়া চোখ খুললো। আজ সুরাইয়া ঘুমোবে না। আম্মু যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। আজ সুরাইয়া ফুলপরী দেখবেই। যত রাত’ই হোক না কেন, বাগানের ফুল ফুটিয়ে ওর জন্য চকলেট রাখতে আসলেই ও ফুলপরীকে ধরে ফেলবে। ফুলপরী যেন প্রতি রাতের মতো সুরাইয়াকে দেখা না দিয়ে চলে না যায় তার জন্য চকলেটের বাক্স আজও নিজের বিছানায় রেখেছে, আর বুদ্ধি করে বেড সুইচটাও রেখেছে হাতের কাছে।

আজ ফুলপরী এলে ওর সাথে দেখা না করে যেতে পারবে না। সুরাইয়া ঠিক করলো ফুলপরী আসলে ওর সাথে কী কী কথা বলবে এবং ইশকুলে গিয়ে সুমাইয়াকে বুঝিয়ে দেবে ও মিথ্যা বলেনি। রাত বারোটা বাজলো ও জেগে আছে দেখলে ফুলপরী যদি না আসে তাই ও চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আর মনে মনে বলছে ফুলপরী তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি চলে এসো। এভাবে মনে মনে ফুলপরীকে ডাকতে ডাকতে সুরাইয়া এক সময় ঘুমিয়ে পড়ছিল প্রায় হঠাৎ দরজায় কিসের যেন শব্দ হলো। ভাবলো এই তো চলে এসেছে ফুলপরী। এতো তাড়াতাড়ি ফুলপরী চলে আসবে ভাবতেও পারেনি সুরাইয়া। হয়তো ওর ডাক শুনে ত্বরা করে এসেছে। কিন্তু দরজা দিয়ে এলো কেন, ও তো আসবে জানালা দিয়ে! বেশ অবাক হলো সুরাইয়া, তবুও চোখ মেললো না; চোখ মেললেই যদি ফুলপরী চলে যায়। মনটা ভরে উঠলো খুশিতে। ফুলপরীর সাথে দেখা হয়েছে এ কথা শুনলে সুমাইয়ার যে কি অবস্থাই না হবে। ভাবে আর মনে মনে হাসে। অল্প অল্প ভয়ও করে। শতো হলেও ওর রুমে যে আছে এখন; যে মানুষ নয় অন্য একটা প্রাণী। হঠাৎ ওর চকলেটের বাক্স খোলার শব্দ হলো। সুরাইয়া ভাবলো এবার লাইট অন করলেই ফুলপরীকে দেখতে পাবেও। এই ভেবে ও লাইটের সুইচ টিপেই চোখ মেললো। কিন্তু একি!! ফুলপরী কোথায়? এ যে ভাইয়া!! সুরাইয়া আর্তচিৎকারে সারা বাড়ি জেগে উঠলো। আব্বু-আম্মু ছুটে এসেছে। কাজের বুয়াও ঘুমভাব চোখে ওঠে এসেছে। সুরাইয়া শুধু চেঁচিয়েই যাচ্ছে। প্রথম ওর আম্মু কিছুই বুঝতে পারেনি। সুরাইয়ার কান্না দেখে ভাইয়াও বেশ ভড়কে গেছে। আম্মু আব্বুসহ প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করলো সুরাইয়া কি হয়েছে? ভয় পেয়েছে? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন। কিন্তু কারো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না সুরাইয়া। শুধু কাঁদছে তো কাঁদছেই। সুরাইয়ার কান্না থেমে যাওয়ার পর আসল ব্যাপারটা শুনে সকলেই হাসতে শুরু করলো। আর সকলে প্রায় একই সুরে বললো- সুরাইয়া কি যে একটা! বোকা মেয়ে কোথাকার। সুমাইয়া তো ঠিকই বলেছে। ভূত-প্রেত, পরী বলে কিছু নাছে নাকি? পৃথিবীতে মানুষ আর জ্বীন ছাড়া কিছু আছে নাকি? প্রতি রাতে মজা করার জন্য তোমার বাক্সে চকলেট রেখে যায়। ফুলপরী বলে কিছু নেই বুঝলে হাদারাম? ভাইয়া বললো- তুই শুধু পরীর গল্প শুনতে চাস তাই তোকে ফুলপরীর কথা বলেছি। থাক ওসব প্যাচাল মামনি এখন ঘুমাও। আব্বুও বলছে আমার লক্ষ্মি মেয়ে যাও ঘুমাও। সকলেই সুরাইয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে লাইট নিভিয়ে দিয়ে চলে গেল।

ঢাকা ।। দ্বিতীয় বর্ষ ।। ষষ্ঠ সংখ্যা।। জুলাই/২০১২ ঈসাব্দ


সম্পাদনাঃ শাহ আলম বাদশা

ক্রন্দসী’র কোনো সংখ্যায় লেখা পাঠানোর সর্বশেষ তারিখ সংশ্লিষ্ট মাসের ০৫ তারিখ পর্যন্ত। লেখকদের বিজয় ফন্টে নয়, ইউনিকোডে অর্থাৎ অভ্র/নিকস ফন্টে লেখা পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ

krondosee@yahoo.com

krondosee@facebook.com

মাহিনা

মূল: হামিদ আলিপুর, অনুবাদ: ফজল হাসান

[লেখক পরিচিতি : হামিদ আলিপুর একজন আফগান লেখক। ‘মাহিনা’ গল্পটি হামিদ আলিপুরের ‘দ্য ওয়েজেস’ গল্পের অনুবাদ। ‘দারি’ ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফরহাদ আজাদ। গল্পটি ২০০০ সালের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যা ‘আফগানম্যাগাজিন.কম’-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে গল্পটি জোহরা সাঈদ, ওয়ালী আহমাদি এবং ফরহাদ আজাদ সম্পাদিত ‘ড্রপ বাই ড্রপ উই মেইক এ রিভার’ অডিও সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গল্পটিতে আমেরিকা প্রবাসী একজন আফগান শরনার্থীর জীবনের কঠিন সংগ্রাম এবং করুণ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।]


আল্লাহ্ জানেন, সম্ভবত প্রতিদিন আমি হাজার বারেরও বেশি এই রেস্টুরেন্টের ভেতর হাঁটাহাঁটি করি। প্রতিবার খালি ট্রে হাতে ডাইনিং রুমের শেষ মাথায় যাই এবং টেবিল থেকে নোংরা থালাবাসন, চায়ের কাপ, পানি, মদ ও সফট্ ড্রিংকসের খালি গ্লাস তুলে আনি। আমার কাজ হলো এঁটো থালাবাসন ধোয়া এবং খাবার শেষে টেবিল থেকে ময়লা জিনিসপত্র তুলে এনে টেবিল পরিস্কার করা।এটা খুবই মজার ব্যাপার যে আমি এমন এক পরিবেশ থেকে এসেছি, সেখানে মানুষেরা রান্না করে এবং থালাবাসন ধুয়ে এতো টাকা উপার্জন করতে পারে না। কিন্তু এখানে এসব কাজ করে অনায়াসে জীবন ধারন করা যায়। রেস্টুরেন্টে কাজ না করলে হয়তো আমার কোন রোজগার থাকতো না।

রেস্টুরেন্টের মালিক দোকান খোলা থেকে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত কাজ করে। সে ছাড়া আমরা সাত জন কর্মচারী। আমরা বিভিন্ন দেশের এবং সম্প্রদায়ের, যেমন কালো, সাদা, চায়নিজ, হিস্পানিক, ইরানি এবং আফগান। আমার বেশির ভাগ সময় কাটে রান্নাঘরে। ওখানে একজন পাচক, তার সহকারী এবং আমি কাজ করি। হাড়িপাতিলের টুং টাং, স্যুপের টগবগানি এবং কলের পানি পড়ার শব্দ মিলে রান্নাঘরের গুমোট বাতাসে এক অন্যরকম আওয়াজ সৃষ্টি হয়। যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য কেউ কারোর সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার ফুরসত পাই না।

রেস্টুরেন্টের মালিক একজন ইরানিয়ান। সে অঢেল ধন-সম্পত্তির মালিক, কিন্তু বেশি কথা বলে। সময় ও সুযোগ পেলে সে মদ্যপান করে মাতাল হয়। তখন সে দীর্ঘ সময় ধরে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে রীতিমত জ্ঞান দান করে। একদিন সে বলেছে, আকাশ থেকে লাফিয়ে এই বিশাল সম্পত্তি তার কোলে এসে পড়েনি, কিংবা বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেও পায়নি।
আমাকে সে প্রায়ই বলে, ‘এ অবস্থায় এসে পৌঁছানো পর্যন্ত আমি তোমার মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেছি।’

আমি জানি না, কেন সে আমাকে এ ধরনের কথা বলে। তবুও মাঝে মাঝে ভাবি, মালিক কি চায় আমি তার জন্য আরো বেশি কাজ করি, নাকি সে আমার অসহায় জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে কটাক্ষ করে স্মরণ করিয়ে দেয়?

আমার মামা মালিকের বন্ধু। আমেরিকায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই মামা আমাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এ কাজটি যোগার করে দিয়েছিলেন। তবে প্রথম দিন থেকেই আমি কাজটি মোটেও পছন্দ করতে পারিনি। যে মানুষ জীবনে কখনো একটা থালা-বাটি, কাপ কিংবা গ্লাস ধোয়নি, এধরনের কাজ তার জন্য অনেক কঠিন।
যেদিন আমি প্রথম রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর দেখি, সেদিন কিছুতেই আমার মাথায় আসেনি এই এতটুকু রান্নাঘরে কেমন করে এতো মানুষের জন্য খাবার তৈরি করা হয়। একজন বেরসিক ম্যানেজারের অধীনে সবাই কাজ করে। কাজের সময় আমরা যন্ত্রের মতো কাজ করি। তবে কদাচিৎ কাজের ফাঁকে সময় পেলে আমি চুপচাপ আপন মনে ভাবি।

আমেরিকায় না এলে আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না যে এখানে এ রকম ঢাউস সাইজের পাতিল আছে। এগুলো দেখলে আফগানিস্তানে আমার ভাইয়ের বিয়ের কথা মনে পড়ে, এমনকি চোখের সামনে আগা লালার মুখটা ভেসে উঠে। ভাইয়ের বিয়ের সময় আগা লালা রান্না করেছিল। যদিও সে ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ এবং রসকষহীন, কিন্তু একবার তার সঙ্গে আলাপ করলে বুঝা যায় আসলে সে একজন অত্যন্ত দয়ালু এবং জ্ঞানী লোক।

এই রেস্টুরেন্টে পোলাও রান্না করা হয় না। এসব বিশাল পাতিলে ওরা আফগানি ‘শোরবা’র মতো এক ধরনের খাবার রান্না করে, যা ওদের ভাষায় স্যুপ। এ স্যুপ কয়েক শ’ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত এবং রেস্টুরেন্টের মালিক হাজার হাজার ডলার আয় করে। মাঝরাতে এই হতভাগা আমি এসব বিশাল পাতিল, থালা-বাসন, চামচ এবং গামলা ধুয়ে মুছে সাফ করি। আমি কখনই কারোর সঙ্গে আমার মন খারাপের গল্প কিংবা বিরক্তি নিয়ে আলাপ করি না, বরং এ হেন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি।

অনেকের মুখে আমি শুনেছি যে তারা আমেরিকায় এসে হয় পেট্রোল পাম্পে কাজ করে, নতুবা আমার মতো কোন রেস্টুরেন্টে সপ্তাহে ৬০ বা ৭০ ঘণ্টা থালা-বাসন ধোয়ার কাজ করে। সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের কথা আলোচনা করার আগে আমি ওদের একই মর্মান্তিক জীবন কাহিনী বারবার শুনতে রীতিমত বাধ্য হই। আমার কানের ভেতর সারাক্ষণ ওদের কথা অনুরণিত হয়। অথচ আমার পকেট গড়ের মাঠের মতো ফাঁকা। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে আমাকে এ কাজ করতে হয়। ঘরে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ের ভরণপোষনের দায়িত্ব চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। আমি তো অবুঝ বালক নই যে, আমার কাজের চাপ বুঝবো না। আমি ভালো করেই বুঝি, কিন্তু তারপরেও আমার কাজকে অপছন্দ করি।

আমেরিকা আমাকে ভালো কিছু দিতে পারেনি। কেননা অনেক বছর ধরে পাঠক মহলে আমার একটা পরিচিতি ছিল। আমি ছিলাম একজন লেখক এবং কবি। স্কুল জীবন শেষ করার পরপরই আমি লেখালেখি শুরু করি। কিন্তু আমি জানি, এখানে নিজের ঢোল নিজে বাজালেও কারোর কিছু যায় আসে না। অনেকের সঙ্গে কবিতা কিংবা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করলে তাদের কাছে হয় এটা হাস্যকর, নতুবা পাগলামির বহিঃপ্রকাশ। একবার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা বই ধার করে এনেছিলাম। বইটার নাম ছিল ‘পশ্চিমাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না’। তিন রাতেই আমি বইটা পড়ে শেষ করেছিলাম। এখন আমি পশ্চিমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানি।

যাহোক, কোন কাজ না থাকার চেয়ে রেস্টুরেন্টে ধোয়া-মোছার কাজটা ঢের ভালো। অর্থাৎ কোন কাজ না থাকলে আমার কোন উপার্জনও থাকতো না। আমি প্রথম মাহিনা পাবার প্রতীক্ষায় ছিলাম। এ টাকা দিয়ে আমি পাঁচ বছর বয়সী ছেলের জন্য কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার আগে স্কুলের পোশাক, খাতা ও পেন্সিল কিনতে চেয়েছিলাম। কিছু টাকা যাতায়াতের খরচ বাবদ স্ত্রীকে দেওয়ার জন্য ভেবেছিলাম, যাতে সে শহরের কলেজে গিয়ে ইংরেজি শিখতে পারে। এসব খরচের পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা দিয়ে সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে চেয়েছিলাম।

বেলা দু’টো থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত আমি সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করি। রেস্টুরেন্টের মালিক জানে যে আমার সীমিত ইংরেজি দিয়ে আমি ভালো কোন কাজ পাবো না। তাই আগ্রহ নিয়ে যত ভালো কাজ করি না কেন, সে কখনই আমার মাহিনা বাড়াবে না।

সব সময় অনুযোগের ভঙ্গিতে আমার স্ত্রী বলে, ‘কাজের জন্য রেস্টুরেন্টের মালিক মিস্টার জাবেদ তোমার মতো একজন অসহায় মানুষকে পেয়েছে।’

যদিও আমি স্ত্রীর সঙ্গে সহমত পোষন করি, কিন্তু তার কথার পিঠে কোন কিছু বলি না।
এখনো আমার কোন গাড়ি হয়নি। মনে মনে ভেবে রেখেছি প্রথম যে গাড়ি কিনবো, সেটা হবে স্ত্রীর জন্য। যদিও গাড়ি চালানোর কোন নিয়ম-কানুন জানি না, তবুও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার স্ত্রী এবং আমি গাড়ি চালানোর গাইড বই পড়ি।
আমি যে রেস্টুরেন্টে কাজ করি, সেটা বাসা থেকে অনেক দূরে। পুরো পথ বাসে যাওয়া যায় না। প্রথমে বাস স্টপেজে যেতে আমাকে প্রায় দু’ মাইল পথ হাঁটতে হয়। সেখানে বাসের জন্য পনের-বিশ মিনিট অপেক্ষা করে রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি বাস স্টপেজে যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে। তারপর ওখান থেকে রেস্টুরেন্টে পৌঁছতে আরো কুড়ি মিনিট হাঁটতে হয়।

বাসা থেকে আমি আনুমানিক দুপুর সাড়ে বারোটায় বের হই এবং ফিরি রাত একটার পরে। স্ত্রীকে সব সময় বলি, সে যেন আমার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা না করে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কিছুতেই সে আমার কথা শোনে না। আমি না ফেরা পর্যন্ত সে তন্দ্রালু চোখে আমার জন্য অপেক্ষা করে। এ কারণেই রেস্টুরেন্টের এ চাকুরিটা আমার জীবনের সব আনন্দ ও সুখ কেড়ে নিয়েছে।

মাঝরাতে ফেরার সময় বাস অনেকটা খালি থাকে। আগের রাতে আমি যে সমস্ত যাত্রীদের বাসের সিটে বসা দেখেছি, তারা আজও সেই একই সিটে বসা। গতরাত থেকে আজ তাদের আচরণ একটুও বদলায়নি। মনে হয় আমরা সবাই এই বাসের অংশ।

বাসের ভেতর একজন মোটা কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। আমার মতো সেও হয়তো কোন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজ শেষে বাসায় ফিরছে। ক্লান্তিতে সে বাসের সিটে হেলান দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। যতবার ড্রাইভার বাস থামায়, ততবারই বাসের ভেতর ঝাঁকুনি লাগে। তখন সে চোখের পাতা খানিকটা খুলে একটু নড়েচড়ে বসে এবং কয়েক মুহূর্ত বাদেই আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়।

বাসে একটা যুবক ছেলেও আছে। দেখে মনে হয় সে ছাত্র। কেননা তার সঙ্গে স্কুলের ব্যাগ এবং হাতে বই। ছেলেটি বাসের প্রথম সিটে বসে আপন মনে বই পড়ে। বইয়ের পৃষ্ঠায় তার গভীর মনোযোগ। সে কখনো জানালা গলিয়ে বাইরে তাকায় না, এমনকি অন্য যাত্রীদের দিকে ফিরেও তাকায় না। কিছুতেই আমার বোধগম্য হয় না, সে কেমন করে বুঝতে পারে কখন তার গন্তব্যে বাস থামবে।

সাধারণত আমি বাসের মাঝামাঝি সিটে বসি এবং জানালার কাঁচের ভেতর থেকে বাইরের দোকানপাট আর রাস্তাঘাট দেখি। তখন আমার মস্তিস্কের ভেতর হাজার চিন্তার ঠোকাঠুকি টের পাই, কিন্তু এসব চিন্তা কোন সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

কয়েকজন মাতাল ছাড়া বাসের যাত্রীদের ভেতর তেমন কোন তারতম্য দেখা যায় না। গুটি কয়েক লোক বাসের শেষ দিকে লম্বা সিটে শুয়ে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে বেশ জোরে কথা বলে। অনেক সময় তরুণীরা কোলের শিশুদের নিয়ে বাসে ওঠে। আবার অনেক সময় অন্য বয়স্কা মহিলারাও বাসে ওঠে। আল্লাহ্ মালুম, তারা এত রাত পর্যন্ত কী করে।

বাসের চালক বয়স্ক, কিন্তু খুবই বন্ধুবৎসল। কখনো কখনো সে সামনের আয়নায় তাকিয়ে দেখে পেছনে কারা জোরে কথা বলে। তখন সে তাদের উদ্দেশে বলে, ‘আস্তে কথা বলুন।’
তখন যাত্রীরা চুপ করে, কিন্তু কয়েক মিনিট বাদেই আবার জোরে কথা বলা শুরু করে।
এখনো সেই রাতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেদিন ছিল ১১ই জুন এবং কাজে যোগদানের ঠিক পনের দিন। সেদিনই আমি মাহিনা পেয়েছি, যা এক এবং পাঁচ ডলারের নোট। যদিও আমার সামনেই মালিক বেশ ধীরে সুস্থে ডলারগুলো গুণে আমার হাতে দিয়েছে, তবুও আমি নিজে আবার গুণেছি। সর্বমোট দু’শ পঁচিশ ডলার। আমি ডলারগুলো ওয়ালেটের ভেতর রাখি। আমার মামা আমাকে ওয়ালেটটি উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম মাহিনা পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভেবেছিলাম ডলারগুলো দিয়ে জীবনের কি কি সুখ কেনা যেতে পারে।

যাহোক, সবকিছুর আগে আমি ভেবেছি আমার ছেলের কথা। ও সবেমাত্র কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া শুরু করেছে। ওর জন্য স্কুলের পোশাক, একটা ব্যাগ এবং কয়েকটা খেলনা কিনতে হবে।
অনেকেই আমাকে অনেক বার বলেছে যে আমেরিকায় সাথে করে বেশি ডলার নিয়ে চলাফেরা করা উচিত নয়। কেননা পথে ছিনতাইকারীর হাতে ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু আমি চাইলেই হবে না। মালিক আমাকে পনের দিন পরপর প্রতি মাসে দু’বার নগদ মাহিনা দেবে। কাজ শেষে আমার চেহারা বড়ই শোচনীয়। চোখেমুখে ক্লান্তি, এলোমেলো চুল এবং পড়নে জীর্ণ পোশাক। আমাকে দেখে কারোর মনে হবে না যে আমার সঙ্গে এতগুলো ডলার আছে।
রাত সাড়ে বারোটায় বাড়ি ফেরার জন্য যখন আমি বাস থেকে নামলাম, তখন আমার দারুণ তেষ্টা পেয়েছে। এই মধ্যরাতে তেষ্টা পাওয়া আমার জীবনে প্রথম। সফট্ ড্রিংকস কেনার জন্য আমি একটা দোকানে ঢুকলাম।
দোকানের ভেতর কয়েকটা যুবক অনাগ্রহে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টিয়ে দেখছিল। যখন কোন খদ্দের দরোজা দিয়ে ঢোকে, তখন বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে যুবকগুলো ট্যারা চোখে তাকিয়ে আপাদমস্তক তাকে দেখে এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় সশব্দে হাসাহাসি করে। আমি জানি এ সময় ওদের দিকে ফিরে না তাকানোই শ্রেয়। যেখানেই আমি যখন বিপদের কোন সম্ভাবনা আঁচ করতে পারি, তখনই আমি ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা করি।

যাহোক, আমি একটা ড্রিংকস নিয়ে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে দোকানীকে দাম পরিশোধ করি।
সারাদিন রেস্টুরেন্টে প্রচণ্ড পরিশ্রম করায় আমি ভীষণ ক্লান্ত। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। আমি ঢকঢক করে প্রায় এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলি। মনে হলো, আমার দেহের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমিষে উবে গেল।
তাড়াতড়ি বাড়ি পৌঁছানোর জন্য আমি পা বাড়ালাম। কয়েক কদম যাওয়ার পরই প্রচণ্ড জোরে গাড়ি থামানোর আওয়াজ পেলাম। গাড়ির ভেতর থেকে কয়েকজন যুবক প্রায় চিৎকার করে বলছে, ‘সে একা। সঙ্গে কেউ নেই।’

আমি ভালো করে তাকালাম, কিন্তু ভয় পাবার মতো কোন আলামত দেখতে পেলাম না। কিন্তু এ রাস্তাটা ছিনতাই এবং রাহাজানির জন্য প্রসিদ্ধ। যাহোক, মাঝরাতে এ ধরনের নির্জন রাস্তায় একদল যুবকের মুখোমুখি হলে যে কেউ ভয় পাবে।

চটজলদি ওরা গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। ওদের মধ্যে একজনকে আমি কিছুক্ষণ আগে দোকানে দেখেছি। চেহারা দেখে ওকে খুব নিষ্ঠুর বলে মনে হলো। ওর হাতে এক বোতল মদ এবং দু’ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। আরেকজন আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছিল, যা আমি মোটেও বুঝতে পারিনি।
একসময় সে আমাকে রীতিমত হুকুমের স্বরে বললো, ‘যদি বাঁচতে চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি তোমার ওয়ালেট বের করে দাও।’

এ ব্যাপারে লোকজনেরা আগেই আমাকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছিল। কিন্তু এটা যে সহসাই আমার জীবনে ঘটবে, তা আমি মোটেও ভাবতে পারিনি। যাহোক, আমি এক মুহূর্তের জন্য ভাবলাম। আমি যদি এখন এই মাতালদের বাঁধা দিই, তবে হয়তো সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু এই ঘটনা যদি আমার দেশে হতো, তাহলে এতক্ষণে তুমুল মারপিট শুরু হয়ে যেত।
কোন ধরনের বাঁধা না দিয়ে আমি ধীরে সুস্থে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করি। যে যুবকটি আমাকে গালাগালি করছিল, ওয়ালেটটা আমি ওর হাতে তুলে দিই। তারপরও ও আমাকে চিৎকার করে গালি দিচ্ছিল। যাহোক, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যদি স্বেচ্ছায় ওয়ালেট না দিই, তবে নির্ঘাত ওরা আমাকে মারতো। ওয়ালেট পেয়ে ওরা গাড়িতে চেপে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেল। আমার পেছনে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দু’জন লোক পুরো ঘটনা দেখেছিল। যুবকগুলো চলে গেলে তারাও ভিন্ন রাস্তা ধরে চলে যায়।

হতভম্বের মতো আমি কয়েক মিনিট নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি। অবশেষে একসময় বাড়ির দিকে পা বাড়লাম। আমার দু’চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। সত্যিকার দুঃখ পেলে কিংবা কঠিন কোন দুঃসংবাদ পেলে পুরুষ মানুষের চোখে এ ধরনের বোবা কান্নার উষ্ণ ফোঁটা জমা হয়। কিন্তু টাকার জন্য আমার চোখে অশ্রু জমেনি, বরং আমার অসহায়ত্বের জন্যই হয়েছে। আমার কেন জানি মনে হলো, এই নির্জন রাস্তায় ওরা আমাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেছে। আমি ওদের বাঁধা দিতে পারিনি, এমনকি হালকা প্রতিবাদও করতে পারিনি। ওরা শুধু আমার মাহিনার সব ডলার ছিনতাই করেনি, বরং সঙ্গে করে আমার অহংকারটুকুও নিয়ে গেছে। ওরা আমার সব আশা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সে সময় আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাঁচ বছর বয়সী ছেলের নিষ্পাপ মুখ। ও হয়তো গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। আর স্ত্রী হয়তো তন্দ্রালু চোখে আমার আগমনের জন্য দীর্ঘ প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে।

ইতিমধ্যে আমার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে এবং আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করি।

এই পথ

      ডা.সুরাইয়া হেলেন

 জানি আমি,তুমিও এসেছিলে

একদিন এই পথে,

এই পথে যেতে যেতে

ঝরা পাতাদের গান শুনেছিলে

কান পেতে!

দুপুরের নিঃসঙ্গ ঘুঘুর ডাকে

মনটা উদাস হয়েছিলো বুঝি

বাঁশবাগানের মর্মরধ্বনি

হৃদয়ে ব্যথা হয়ে বেজেছিলো জানি…

বিকেলের মরে আসা রোদে

ছায়া ছায়া মন নিয়ে, উন্মন হয়ে

হিমেল হাওয়ার গোধূলি বেলায়

আমারে খুঁজেছিলে তুমি একদিন…

তারপর কত দিন মাস বছর

হয়েছে গত-অনাগত দিনও হয়েছে অতীত!

আমিও এসেছি তারপর একদিন

তোমার ফেলে যাওয়া পদচিহ্ণ ধরে…

ঝরা পাতা, ঘুঘুর ডাক, বাঁশবাগান,

বিকেল আর গোধূলির কনে দেখা আলোয়

খুঁজেছি তোমারে, তোমার শরীরের গন্ধ,

নিঃশ্বাসের শব্দ আর

চোখের নিভে যাওয়া আলো,

আমারে নিয়েছে টেনে,

এই পথের সমাপ্তির টানে…

তবু এই পথ শেষ হবেনা জানি

তোমার প্রতীক্ষায় রবে আমারি সাথে…

আসমা

তৌহিদ উল্লাহ শাকিল

( ১)
এই আসমা । দাঁড়া বলছি
না দাঁড়াব না । আমাকে ছুঁয়ে দেখ ।
আরে হাঁপিয়ে গেছি আর পারছি না।
কেন বাজি লেগেছিলে তখন?
দুষ্টামি করেছিলাম।
না তা হবে না বাপু । কথায় কথায় বলবে মেয়েরা কি এটা পারে, সেটা পারে। তাহলে স্বীকার কর আমরা সব পারি । তবেই না থামব ।
আচ্ছা বাবা ঠিক আছে । মানলাম আমাদের আসমা সব পারে।
শুধু আসমা সব পারে বললেই হবে না, বলতে হবে মেয়েরা সব পারে।
হ্যাঁ বাবা তাও মানছি ।
এতক্ষণে আসমা দৌড় বন্ধ করে থামল । শরীফ এসে হাঁপাতে হাঁপাতে পাশে দাড়াল । ওরে বাপরে তুই পারিস ও বটে। আসমা আর শরীফ একই গ্রামে থাকে । দুজনের বয়স একেবারে কাছাকাছি । যাকে বলে দুজনই সমবয়সী । আসমার বাবা গ্রামের স্কুলের একজন মাস্টার। সারাদিন তিনি স্কুলের কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন।মেয়েকে তিনি রক্ষণশীল না করে তার মনের মত চলতে দিয়েছেন । মাস্টার সাহেবের স্ত্রী মারা গেছে বছর তিন হল । মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মাস্টার সাহেব আর বিয়ে থা করেননি । নিজের মা ছাড়া কেউ মেয়েকে ঠিক দেখে রাখে না । দূরসম্পর্কের এক বোন আছে মাস্টার সাহেবের তিনি তাকে এনে রেখেছেন মেয়ে আসমা কে দেখাশুনা করার জন্য। আসমাদের বাড়ির পাশেই শরীফদের বাড়ী । শরীফের বাবা মৌলভী মানুষ । সাদা সিদে ভাবে চলেন । মাস্টার সাহেবের সাথে তার দারুন মিল । প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় দুজনে বসে অনেক আলচনা করেন । ইদানিং তাদের আলচনায় প্রাধান্য পায় দেশের কথা দেশের ভবিষ্যতের কথা । ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান আর ভারত আলাদা হয় তখন মাস্টার সাহেব টগবগে তরুন । সেদিন তিনি ভেবেছিলেন যাক এবার বুঝি বাঁচা গেল । পাকিস্তানিরা আমাদের ভাই আমাদের জাতি তারা নিশ্চয় আমাদের সবকিছু ভালভাবে দেখবে । হায় কিন্তু দেশ ভাগের পর দেখা গেল এর উল্টো চিত্র । পাকিস্তানিরা আমাদেরকে তাদের গোলাম ভাবতে শুরু করল । যে আশার বাণী নিয়ে সেদিন জিন্নাহ সাহেব গান্ধী থেকে বাংলাদেশ কে আলাদা করেছিলেন সে আশা পুরন হয়নি মোটেও । পাকিস্তানিরা প্রথম আঘাত হানে আমাদের ভাষার উপর । এভাবে চলতে চলতে ৫২এর ভাষা আন্দোলন হল , এখনো নানা ঝামেলা চলছে যার শেষ পরিনতি কি হবে তা তাদের জানা নেই। মাঝখানে কত বছর কত নির্যাতন বয়ে গেল নিরীহ বাঙ্গালিদের উপর দিয়ে । এসব ভাবলে মাস্টার এবং মৌলভী দুজনেরি মন খারাফ হয়ে যায়। ভাবেন এই হায়ানাদের হাত থেকে আমাদের সন্তানদের কে রক্ষা করবে ।
প্রতিদিনের মত দুই বন্ধু মিলে দাওয়ায় বসে গল্প করছিলেন । এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে আসমা এবং শরীফ বাড়ীতে প্রবেশ করল । আসমাকে দেখে মৌলভী সাহেব বলে উঠলেন-
মা কোথায় গিয়েছিলে ?
এমনি একটু বাইরে ঘুরতে গিয়েছি চাচা ।
ঠিক আছে মা ভেতরে যাও
আচ্ছা চাচা ।
আর শোন মা তুমি এখন বড় হচ্ছ , যখন তখন বাইরে যেও না । লোকে খারাফ ভাববে ।
আসমার ইচ্ছে হচ্ছিল একগাদা কথা শুনিয়ে দেয় চাচাকে , কিন্তু বাবা বসে থাকায় কিছু বলতে পারল না । তাই চুপচাপ ঘরে চলে গেল ।
(২)
আসমা শরীফ কে ছাড়া কিছুই চিন্তা করতে পারে না । সারাদিন মুখে মুখে খালি শরীফের কথা । আসমা নিজেও ভাবে এ তার কি হল । দূর তার কথা আমি ভাবব কেন ? আবার ফিক করে হেসে ফেলল আপন মনে । আজ শরীফকে দারুন শিক্ষা দিয়েছে । বলে কিনা মেয়েরা সবকিছু করতে পারে না । আসমা খাটে বসে বসে এসব কথা ভাবছে আর মনে মনে হাসছে । বিকালের পর থেকে আসমার সব কিছু লক্ষ্য করছেন তার ফুফু । এবার তিনি আসমার কাছে এসে বসলেন ।
-কি ভাবছ আসমা
-না । কিছু না ফুফু।
-আরে মা আমি জানি তুই কি ভাবছিস?একসময় তোর মত আমার ও বয়স ছিল মা ।
-আচ্ছা ফুফু একটা কথা বলি , তোমার কি কোন বন্ধু ছিল । যাকে তুমি অনেক ভালবাসতে।
-আরে না । আমাদের সময় ঘর থেকে বাহির হওয়া অনেক কঠিন কাজ ছিল।
-আচ্ছা ফুফু ফুফা কেমন লোক ছিল। তাকে তোমার মনে পড়ে না ?
-কেন পড়বে না। মনে পড়ে কিন্তু আমি তা মনে করে কস্ট পেতে চাই না ।
-দুঃখিত ফুফু , তোমার মন খারাপ করে দিলাম ।
-না ঠিক আছে । আচ্ছা এবার বলত তুই কার কথা ভাবছিস।
-এক বন্ধুর কথা ফুফু।
-কে সে বন্ধু ? শরীফ!
-নাম বলব কেন ? এটা আমার মন জানে ।
-ঠিক আছে । তবে সাবধান । দেশের পরিস্থতিতি ভাল না ।
-তাতে কি হয়েছে।দেশের পরিস্থিতিতি তে কি আসে যায় ।
-চুপকর পোড়ামুখী। কয়দিন পর তোর বিয়ে হবে সেই তুই অন্য মানুষ নিয়ে ভাবিস ।
-আমার বয়েই গেছে অন্য কাউকে বিয়ে করতে।
কই গেলি তোরা সবাই মৌলভী সাহেবকে একটু পান দিয়ে যা।বলে হাঁক দিলেন মাস্টার সাহেব। মাস্টার সাহেবের হাঁক শুনে আসমার ফুফু বলে উঠলেন –
তুই তোর বন্ধুর কথা ভাব বসে বসে আমি পান দিয়ে আসি।
(৩)
চারদিকে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে । পাড়ার দোকানে মাঠে গঞ্জে গাঁয়ে কিসের যেন গুনগুন শুনা যায় । কিন্তু কেউ কিছু বলে না। এসব দেখে শরীফের মোটেও ভাল লাগে না। নিজের দেশে যেন পরবাসি মনে হয় নিজেকে। সেদিন স্কুলের স্যারেরা পাকিস্তানিদের নিয়ে অনেক বলাবলি করেছিল। তারা আমাদের ন্যায্য অধিকার দিচ্ছে না । আমাদের উপর অমানুষিক জুলুম এবং অত্যাচার করছে। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের কে রুখে দাড়াতে হবে ,বিশেষ করে ছাত্র সমাজ কে সোচ্চার হতে হবোট ৫২ ভাষা আন্দলনের মত। শরীফ ভেবে পায়না একই দেশ হয়ে কেন এত বৈষম্য ।আমরা ও মানুষ আমাদের উপর কেন ওরা এত অত্যাচার করবে আর আমরা কেন মুখবুজে সহ্য করব। আমাদেরকে জেগে উঠতে হবে। শেখ মুজিব ৭ই মার্চ ভাশন দিবেন । সেদিন অনেক কিছু ফয়সালা হয়ে যাবে । শেখ মজিবের ভাষণ শুনতে যাবার তার অনেক ইচ্ছে কিন্তু তার বাবা তাকে যেতে দিবেন না ।
ইদানিং আসমার জন্য কেমন লাগে । তার সাথে একদিন দেখা না হলে মনে হয় কত যুগ দেখা হয়নি । আসমা বয়সের তুলনায় এখনো ছোটদের মত আচরন করে । শরীফ এটা ও জানে আসমা তার সাথে ছাড়া অন্য কার সাথে তেমন একটা মিশে না । গতপরশুর ঘটনা মনে হলে শরীফের নিজের শরীর শির শির করে উঠে। ছোট ছোট ছেলেপুলেরা পুকুরের পাড় থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছিল। সে পাড়ে বসে বসে মজা করছিল। এমন সময় আসমা সেখানে আসে। এসে ছেলেদের বলে আমিও তোদের সাথে খেলব । ছেলেরা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না । কিন্তু আসমার জেদ সে লাফাবে । শেষে এসে শরীফ কে ধরল । শরীফ যত বুজায় আসমা ততই জেদ ধরে। সবাই মিলে অনেকক্ষণ ধরে লাফালাফি করছিল । হটাত সুমন নামের ছেলেটা চিৎকার দিয়ে উঠল – রক্ত রক্ত বলে।
শরীফ এগিয়ে এসে দেখে যেখানে আসমা লাফিয়ে পড়েছে তারচার পাশে রক্তের লালচে রেখা পানিতে ভেসে উঠছে । আসমা পাড়ে উঠে বলছে শরীফ আমার পেট ব্যাথা করছে । শরীফ লক্ষ্য করল আসমার পাজামার নিচ দিয়ে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে । শরীফ ব্যাপারটা বুজতে পারল । তাই আসমাকে বলল যাও বাড়ী যাও। সেদিন শরীফ বুজল আসমা বড় হয়ে গেছে । তার সাথে আগের মত ঘুরাফেরা এখন মুস্কিল হয়ে যাবে । হয়েছিল তাই । সেদিন আসমা বাড়ী যাবার পর থেকে আজ চারদিন আসমার কোন দেখা নাই। শিল্পী সেদিন বলেছিল আসমার ফুফু আসমাকে বাড়ীর বাইরে বেরুতে দেয়না। সারাদিন চোখে চোখে রাখে যাতে কর বাইরে যেতে না পারে ।এছাড়া আসমা নাকি ইদানিং শাড়ী পড়ছে । কামিজ পড়া তার ফুফু বন্ধ করে দিয়েছে ।
দূর এসব কি ভাবছে ? এখন দেশের কথা ভাবা উচিত। দেশ বাঁচলে সব হবে । ভাবছে কি করে ঢাকা যাবে। মনির ভাইকে বলেছে একটা ব্যাবস্থা করে দিতে তিনি বলেছেন একটা ব্যাবস্থা করে দিবেন ।তবে তাকে সবসময় তাদের সাথে থাকতে হবে । এই কথা তার বাবাকে বলা যাবে না কোনমতেই। শরীফ তাতেই রাজী।
ঢাকা যাওয়ার আগে আসমার সাথে তার দেখা হয়া উচিত ।না দেরী করা ঠিক না । মনির ভাই কখন ডাক দিয়ে বসেন তার কোন ঠিক নাই ।
অনেক ভেবে চিন্তে একটি চিঠি লেখতে বসল শরীফ।
প্রিয় বন্ধু
সালাম ও শুভেচ্ছা নিও । তোমার সাথে দেখা করার অনেক চেষ্টা করে ও পারিনি। আর তোমাকে দেখার ব্যাকুলতা আমাকে পাগল প্রায় করে ফেলেছে।দেশের অবস্থা তেমন ভাল নয়।আর সে কারনে তোমাকে এবং দেশ দুটি নিয়ে ভাবছি। তুমি এতদিন কিশোরী থাকলে ও এখন যুবতী হয়ে গেছ তা বুজতে পেরেছ নিশ্চয়। আমার সাথে তোমার হয়ত কিছু দিন দেখা নাও হতে পারে। আমি এক্তি বিশেষ কাজে ঢাকা যাচ্ছি । ফিরে আসা পর্যন্ত ভাল থেক সে কামনায়।
ইতি
বন্ধু
পাশের বাড়ির শিল্পীর কাছে চিঠি দিয়ে বলল চুপিসারে আসমাকে দিতে।সেদিন রাতে মনিরের ডাক এল । ঢাকা যাবার জন্য রাতে বেরুতে হবে । রাতে খাবার খেতে বসে মাকে অত্যন্ত নিচু স্বরে ঢাকা যাবার কথা বলল। মা প্রথমে রাজী হয়নি । কিন্তু ছেলের জেদের কাছে মা হার মানল ।বাবা কে না বলে সে রাতে মনির ভাইয়ের সাথে ঢাকা চলে গেল শরীফ।
(৪)
রায়ের বাজারের একটি হোটেলে মনির ভাইয়ের সাথে রাত কাটাল শরীফ। রাতে তার মোটে ও ঘুম আসেনি মহান নেতা শেখ মুজিব কে দেখার ব্যাকুলতায়। শরীফ এর আগে কোন দিন শেখ মুজিব কে সরাসরি দেখেনি ।তার বাবা এবং মাস্টার চাচার কাছে তার অনেক নাম শুনেছেন। নির্বাচনে জেতার পর ও পাকিস্তানিরা সংসদে বসতে দিচ্ছে না শেখ মুজিব কে । সেই শেখ মুজিব আজ ভাষণ দেবেন সারা দেশের মানুষ এই ভাষণের দিকে তাকিয়ে আছে । মুজিব সাহেব কি বলেন । শুধু যে তারাই এসেছে তা নয় । এখানে এসে দেখল তাদের মত আর ও অনেকে দেশের প্রত্ত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে জড় হয়েছে ঢাকা শহরের এখানে সেখানে। হাল্কা নাশতা সেরে মনির ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পড়ল শরীফ । রাস্তা দিয়ে রেসকোর্স ময়দানের দিকে যেতে থাকল । শরীফ ভেবেছিল মানুষ জন এখন ঘুমিয়ে আছে । কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখল উল্টো চিত্র । চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ । সবার একটাই উদ্দেশ্য আর একটাই গন্তব্য আর সেটা হল রেসকোর্সের ময়দান । আজ মনে ঢাকা শহরে অন্য কোন কাজ নাই । আজ সবার একটাই কাজ শেখ সাহেব কি বলে তা শুনা । আস্তে আস্তে মনির ভাইয়ের সাথে হাজার জনতার মাঝেদিয়ে পথ চলছিল শরীফ । মনে এক উল্লাস এক আনন্দ যেন পাগলপারা করে দিচ্ছে । যৌবনের রক্ত যেন নেচে উঠছে ।
রেসকোর্সের ময়দানে এসে শরীফ যা দেখল তা সে কল্পনা করেনি।এত মানুষ । মানুষের ঢল নেমেছে যেন রেসকোর্সের ময়দানে । হাজার হাজার নয় লাখ লাখ মানুষ । এত মানুষ একসাথে কখন দেখেনি শরীফ। তার মনে হয় এখানে যারা আজ এসেছে তারা ও বোধ হয় এত মানুষ একসাথে দেখেনি এর আগে। না এবার আর কেউ রুখতে পারবে না বাঙ্গালিদেরকে । মনে মনে শরীফের আনন্দের জোয়ার বইতে লাগল । চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ । সবার মুখে মুখে শ্লোগান –তোমার নেতা আমার নেতা শেখমুজিব, শেখ মুজিব,/ পদ্মা মেঘ্না যমুনা তোমার আমার ঠিকানা । তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব ।
সবাই একত্রিত হয়ে নানা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে ফেলেছে রেসকোর্সের ময়দান । শরিফ ভাবছে এটাত রেকর্ড হয়ে যাবে বিশ্বে । একজনসভায় এর আগে কখন এত মানুষ হয়েছে কিনা তা জানা নাই শরীফের , যদি না হয়ে থাকে তাহলে এটা রেকর্ড হয়েই থাকবে পৃথিবীর বুকে। সবার প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিকালের দিকে শেখ মুজিব সাহেব মঞ্চে এলেন । সাথে সাথে ময়দানের মানুষ গুল যেন প্রান ফিরে ফেল । শেখ মুজিব পরোক্ষ ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলেন । তার উপর অনেক চাপ ছিল তাই সরাসরি ঘোষণা দেননি । শেখ মুজিবের কথাগুলো হৃদয়ে যেন গেঁথে গেল শরীফের .
মনির ভাইয়ের সাথে বাসায় ফিরে এল শরীফ। মনির ভাই বললেন শেখ সাহেবকে কেমন দেখলি । জবাবে শরীফ বলল – বাংলাদেশে এমন মানুশ আর হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে । কেনরে শরীফ – যার ডাকে এতমানুষ হয় সে কি সাধারন । মনির ভাই আমি আমার ফুফুর বাসায় কিছু দিন থাকি তারপর গ্রামে যাব। মনির ভাই প্রথমে রাজী না হলে ও পরে বলল ঠিক আছে তবে বেশীদিন থাকিস না । আমি গ্রামে গিয়ে তোর বাবাকে বলে দিব। সেই থেকে যাওয়া শরীফের জন্য কাল হয়ে গেল। দেখতে দেখতে দিনগুলো কাটছিল। এমনি করে ২৫শে মার্চ এসে গেল । সেই রাতে পাকিস্তানীরা নিরীহ ঢাকা বাসীর উপর অতর্কিতে হামলা চালাল । অনেক লোক মারা গেল । শরিফের মন তখন পাকিস্তানীদের উপর বিষিয়ে উঠল । শরীফ ভাবতে লাগল তারা কেমন মানুষ ,কেমন মুসলিম তা শরীফ বুঝতে পারে না। এবার পাকুয়াদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। বাঁচা মরার প্রশ্ন এখন আর নাই । এখন মুজিবের কথা মত যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে শত্রু সেনার বিরুদ্ধে। সেই রাতে ফুফাতো ভাই রাসেল কে বলল ভাই আমি যুদ্ধে যাব। জবাবে রাসেল ভাই বলল আরে তুই তো ছোট মানুষ , কি যুদ্ধ করবি ?শরীফ বলল তুমি যাই বলনা কেন আমি ঠিকই যুদ্ধে যাব। এই দেশকে পাক-হায়নার হাত থেকে রক্ষা করব।শরীফের মনে মুজিব সাহেবের সকল কথাগুলো বার বার প্রতিধ্বনি হতে লাগল । এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ।১২ই এপ্রিল রাত ১২টায় রাসেল ভাইয়ের সাথে ভারতের বর্ডারে চলে যায় শরীফ। সে থেকে বাকী সময় একের পর এক অপারেশনে সময় পার হয়ে গেল। প্রথম প্রথম মায়ের কথা আর বন্ধু আসমার কথা মনে হত । কিন্তু শেষ দিকে পাকিস্তানিদের ঘায়েল করার নানা প্লেন দিন কেটে যেত। শরীফের মত লাখ লাখ যোদ্ধার অবিচল বিশ্বাসের জয় হল অবশেষে । ১৬ ডিসেম্বর সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় এল। কমান্ডারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্য ছুটল শরীফ।

(৫)
কয়েকটি মাছি ভন ভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে , কখন ও কখন ও গালের পাশের কাটা ক্ষত থেকে জমাট বাঁধা রক্তের উপর মাঝে মাঝে বসছে আবার উড়ে উড়ে যাচ্ছে । কিছুক্ষণ পর আবার এসে বসছে ক্ষত জায়গাটায়। নগ্ন বুকের ক্ষত চিহ্ন গুলো মোটা মোটা কাল হয়ে ফুলে গেছে ।একসময় লজ্জায় ঢেকে রাখা বুক আজ উলঙ্গ , লজ্জা ঢাকার কোন চেস্টা নাই। কিভাবে লজ্জা ঢাকবে তার শরীরে কোন শক্তিই অবশিষ্ট নাই। উঠে একটু বসবে তার শক্তি টুকু পর্যন্ত নাই। নিজের প্রতি খুব ঘেন্না হচ্ছে, কয়েকবার আত্নহত্যা করবে বলে ঠিকরেছিল কিন্তু হায়না গুল তার শরীরের কাপড় খুলে উলঙ্গ ফেলে রেখেছে । স্কুল ঘরের এই কক্ষে তাদের চারজনকে রাখা হয়েছিল দুজন মারা গেছে পশুদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। একজনকে গত সপ্তাহে নিয়ে গেছে এক পশু । এ কিসের শাস্তি আল্লাহপাক তাকে দিয়েছে তা তার জানা নাই । কত সপ্ন তার মনে ছিল , কত আশা ছিল তার মনে । আজ মনে হয় মরন কখন আসবে তবেই না মুক্তি। এই মুখ আর কাউকে দেখাবে না সে । কিভাবে দেখাবে ? পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাকে প্রতি দিন কুড়েকুড়ে খেয়েছে । তার মাংসল শরীর নিয়ে তারা পাগলা কুকুরের মত খেলেছে তাদের ইচ্ছেমত। আজ কোথায় আছে তার প্রানের বন্ধু শরীফ। শেষ দেখা শরিফের সাথে তার হয়েছিল অনেকদিন আগে । শরীফ কে কতভালবাসত তা বোধহয় শরীফ ও জানত না।কতই না সুখের ছিল সে দিন গুলো । আজ কি হয়ে গেল তার জীবনে।
স্কুল ঘরের পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে অর্ধমৃত আসমা ভাবছিল কথগুলো । স্কুলঘরের কোণার দিকের কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে।যুদ্ধ শুরু হওয়ার চার পাঁচ মাস পরে তাদের এলাকায় পাকবাহিনী ক্যাম্প করে। তার স্কুল মাস্টার বাবা বাধা দেওয়ায় তাকে বেনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে মেরেছে পাকহানাদার বাহিনী।সেদিন বাবার মুত্যতে শোকে বিহবল হয়েগিয়েছিল আসমা ।তারপর প্রতিটি দিন কাটত অনেক ভয়ে । তাদের গ্রামের রমিজ মিয়া রাজাকারের দলে যোগ দেন। গ্রামের মেয়ে মানুষদের হায়ানাদের তুলে দিতে দ্বিধা করত না রমিজ মিয়া। শরীফের বাবাকে একদিন খুব শাসাল রমিজ মিয়া । বলেছে তার ছেলে শরীফ কোথায় গেছে । মৌলভী সাহেব বলেছিলেন –আমি জানি না । তাতেই রমিজ মিয়া রেগে মেগে আগুন । শরিফদের বাড়ী গিয়ে সেদিন দেখেছিলে আসমা ।তারকিছুদিন পর তার কপালে কাল নেমে এল । বাবাকে হারিয়ে আসমা সবসময় মনমরা হয়ে থাকত । একদিন এক মুক্তিযোদ্ধা রাতের বেলায় তাদের বাড়ীতে আশ্রয় নিল পাকবাহিনীর তাড়া খেয়ে ।সে রাতে রমিজ মিয়া পাকবাহিনীর কমান্ডার কে নিয়ে আসমাদের বাড়ীতে হানা দিয়ে সে মুক্তিযোদ্ধা কে ধরে নিয়ে যায়। সাথে নিয়ে যায় অসহায় আসমাকে। আসমার ফুফু অনেক কেঁদেছে বার বার রমিজ মিয়ার পায়ে জড়িয়ে ধরেছে কিন্তু রমিজ মিয়া তার ফুফুর কথা শুনেনি। একরকম টেনে হিঁচড়ে তার বাবার স্কুলে তাকে নিয়ে আসে রমিজ মিয়া । আসমা কে দেখে পাকিস্তানী কমান্ডার মহা খুশি । রমিজ মিয়াকে অনেক ধন্যবাদ দিল সে । তারপর ?উহঃ নাঃ আর মনে করতে চায়না আসমা। এরপর থেকে প্রতিদিন তার শরীরের উপর একের পর এক … ……নাহ আর মনে করতে পারছে না আসমা । যে স্কুলে একসময় মুক্তবিহঙ্গের মত ছুটে বেড়াত সে স্কুলের চারদেয়ালে মুত্যর সাথে পাঞ্জা লড়ছে জিবনের সব হারিয়ে।
আজ কয়েকদিন হায়ানাদের কোন দেখা নেই। এর আগে কে জানি একটুকরো রুটি এবং সামান্য তরকারী দিয়ে যেত. কিন্তু আজ কয়েকদিন কোন খাবার নাই । মাটির কলসিটার পানি ও শেষ । দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ । এসময় কিসের যেন চিৎকার শুনা যাচ্ছে । তাহলে কি পাকহানারা হেরে গেছে। কে জিতল কে হারল তাতে আসমার কি আসে যায়। মরন ছাড়া তার আর কোন গতি নাই। বাইরে মানুষের পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে । লোকেদের চীৎকার আর চেঁচামেচি শুনা যাচ্ছে । এসময় আবার জ্ঞান হারাল আসমা ।
(৬)
হাসপাতালে যমের হাত থেকে রক্ষা ফেল আসমা ।প্রতিদিন প্রতিরাত একাগ্রচিত্তে সেবা করেছে শরীফ। যুদ্ধ শেষে বিজয় মিছিলের সাথে নয় মাস পর গ্রামে প্রবেশ করে সবার আগে ছুটে গিয়েছিল আসমাদের বাড়ীতে। আসমাদের বাড়ীটা কেমন জানি ফাঁকা অনেকদিন ধরে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে । ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দেখল আসমার ফুফু বিছানায় পড়ে ভীষণ জ্বরে কাতরাচ্ছে , কঙ্কালসার দেহ নিয়ে। আস্মার ফুফুর কাছে যা শুনল তাতে যেন মাথায় বাজ পড়ল। মাস্টার চাচাকে পাকবাহিনি মেরে ফেলেছে , আসমাকে স্কুলের ক্যাম্পে নিয়ে গেছে রমিজ আলি ।
স্কুলের সব কামরা খালি , মেঝেতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। পাকহায়নার অত্যাচারের চিহ্ন স্কুল ঘরের প্রতিটি দেয়ালে। স্কুল ঘরের দেয়াল গুল এতদিন যেন মুখবুঝে সহ্য করেছে। স্কুলের ঠিক মাঝখানে অনেকগুলো পাক সেনা কে পেছন দিকে হাতমোড়া দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে। পাকিস্তানীদের নির্যাতনের সাক্ষী এই স্কুলের দেয়াল মাঠ যেন অনেক দিন পর স্বস্তি ফেল। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে পাক সেনাদের কি হবে তা জানা নেই ।স্কুলের কোনার দিকের রুমের দরজা বাইরে থেকে লাগানো । স্কুলের প্রতিটি রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে কিন্তু আসমার কোন দেখা নাই । তাহলে কি আসমা বেঁছে নাই। আনমনে বদ্ধ রুমের দরজা খুলল শরীফ। রুমের এক কনায় আসমার অসাড় উলঙ্গ দেহ খানি পড়ে আছে , দেখতে ফেল শরীফ। লজ্জায় চোখ বন্ধ করল শরীফ। এরা কি মানুষ না জানোয়ার । ছিঃ ছিঃ একটা নিরীহ মেয়ের উপর কিরকম অত্যাচার করেছে। তাড়াতাড়ি নিজের গায়ের ময়লা চাদরটা খুলে আসমাকে জড়াল। একেবারে কাঁধে নিয়ে রওনা হল হাসপাতালের দিকে।
ধীরে ধীরে আসমা সুস্থ হতে লাগল । কিন্তু সমস্যা দেখা দিল আসমার মানসিকতায়। সে এ জীবন রাখতে চায়না । সে বার বার বলে আমার বেছে থেকে কি লাভ। যে কলঙ্ক পাকিস্তানী কুত্তারা আমার ললাটে একে দিয়েছে তা তো আর কোন দিন মুছে ফেলা যাবে না। বেচে থকে আপমানের চেয়ে মুত্যো অনেক ভাল । শরীফ আসমাকে অভয় দেয় কেউ তোমাকে কিছু বলবে না ।তুমি আগে ঠিক হয়ে নাও। চার মাসের দীর্ঘ চিকিৎসা সেবার পর আসমা সুস্থ হয়ে উঠলো । কিন্তু আসমা বাড়ী ফিরে যেতে নারাজ । শরীফ এবার আসমাকে বলল । আসমা আমি তোমাকে বিয়ে করে বাড়ী নিয়ে যাব।
-না তা হয় না শরীফ।
- কেন হয় না ?
- তুমি আমার প্রতি করুনা করছ। আমি কারো করুনার পাত্রী হতে চাই না।
-না আসমা এখানে কোন করুনা নাই , তুমি আমার বন্ধু তাই তোমাকে যোগ্য সন্মান দিতে চাই।
-তুমি মেনে নিলে তোমার সমাজ কি আমাকে মেনে নেবে।
-কেন মেনে নেবে না , তুমি যেটাকে কলঙ্ক ভাবছ তাই গর্ভের । শুধু কি তুমি আসমা এমন ঘটনার স্বীকার । আর ও দুই লাখ নারী এই নরপিশাচদের কারনে তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে। আমাদের সকলের উচিত সবাইকে সমাজের উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠিত করা।আমরা যেমন যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীনে ভুমিকা রেখেছি , তোমরা তেমনি দেশ স্বাধীনে অনেক বড় ভুমিকা রেখেছ।এই দেশ আমার বন্ধু এই দেশের জনগন আমার বন্ধু, এই দেশের মাটি আমার বন্ধু ,এই দেশের সব কিছু আমার অতি আপন । আর সবচেয়ে বেশী আপন কে জান?
-কে?
-তু